Home / রাজনীতি / যে কারণে সহিংসতা রুখতে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ

যে কারণে সহিংসতা রুখতে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ

সাতক্ষীরায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে জেলাটি জামায়াতের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। জামায়াত-শিবিরের সহিংসতা প্রতিরোধে সাতক্ষীরায় জেলা আওয়ামী লীগ বারবারই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অধ্যুষিত সাতক্ষীরার চারটি আসনেই প্রথমবারের মতো মহাজোটের প্রার্থীরা চারদলীয় জোটের প্রার্থীকে পরাজিত করে। জামায়াতের রাজধানী হিসেবে খ্যাত সাতক্ষীরায় রাজনৈতিক ভোটযুদ্ধের এ পরাজয়ের ফলে জেলা জামায়াতের নেতারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা পাড়া-মহল্লা, মসজিদ-মাদ্রাসায় শুরু করেন সাংগঠনিক তৎপরতা। অন্যদিকে সরকার গঠনের পর সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা অর্থ উপার্জনে মরিয়া হয়ে ওঠেন। গত পাঁচ বছরে তারা টিআর, জিআর, কাবিখা, সীমান্তের গুরচর খাটাল থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়োগ বাণিজ্য ও টেন্ডারবাজি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। গত ৯ বছরে জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল তো দূরের কথা উপজেলা ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলও করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। জেলা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান এমপি ও সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. আ ফ ম রুহুল হক এমপি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন। এ সুযোগে জেলায় জামায়াত-শিবির সাংগঠনিকভাবে আবারও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর এ জেলায় জামায়াত-শিবির নারকীয় তাণ্ডব শুরু করে। সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক হত্যা করতে থাকে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে। এরই মধ্যে জামায়াত-শিবিরের হাতে আওয়ামী লীগের ১৭ জন নেতা-কর্মী নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। অব্যাহত হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জামায়াত-শিবিরের এ সহিংসতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কোনো প্রতিকার ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল। সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর সাতক্ষীরা সার্কিট হাউস, সিটি কলেজ মোড় ও কদমতলা মোড়ে জামায়াত-শিবির মিছিল-সমাবেশ করে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের আপন ভাই জেলা জামায়াতের রোকন ফিংড়ী ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান। সে কারণে জামায়াত-শিবিরের হাতে খুন হওয়া ছাত্রলীগ নেতা প্রভাষক এ বি এম মামুন ও যুবলীগ কর্মী শাহীন আলমের জানাজা অনুষ্ঠানে লাশের সামনে দলীয় নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন নজরুল ইসলাম। গত পাঁচ বছরে সুবিধাবঞ্চিত দলের তৃণমূল নেতাদের খোঁজখবর না নেওয়ার কারণে রাজনৈতিক এ সংকটময় মুহূর্তে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সাধারণ কর্মীদের পাশে পাচ্ছেন না। জামায়াত-শিবিরের হামলার ঘটনায় দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে পুলিশ প্রশাসন দিয়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার চেষ্টা করেন ওই দুই নেতা। এ সুযোগে পুলিশ প্রশাসনের জেলা পর্যায়ের বেশকিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন নাশকতা ও হত্যা মামলায় জামায়াতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করেন সহিংসতার শিকার বিভিন্ন পরিবার। ফলে জামায়াতের নাশকতা, গাছ কাটা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী খুনের মামলায় উল্লেখযোগ্য কোনো আসামিকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। আওয়ামী লীগ সভাপতি ইঞ্জিনিয়র শেখ মুজিবুর রহমান এমপি মনে করেন, ছাত্রলীগ নেতা প্রভাষক এ বি এম মামুন, যুবলীগ নেতা শাহীন আলম, আওয়ামী লীগ নেতা রবিউল ইসলাম হত্যা মামলার আসামি জেলা জামায়াতের আমির খালেক মণ্ডল, সেক্রেটারি নূরুল হুদা, জামায়াতের রোকন ফিংড়ী ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানসহ জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার না করার কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জামায়াতের ওই শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার না করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সাতক্ষীরায় তাদের প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন সদ্য বিদায়ী পুলিশ সুপার মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র মতে, যুদ্ধাপরাধ মামলায় ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ীসহ সাংবাদিকদের হিটলিস্ট তৈরি করে। জামায়াত কর্মী হবি ডাকাতের নেতৃত্বে একটি কিলার টিম গঠন করে জেলা জামায়াত। এর অংশ হিসেবে জেলাব্যাপী একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে আসছে বলে তারা মনে করেন। এরই মধ্যে ১৯ ডিসেম্বর সাতক্ষীরার কদমতলা থেকে হবি ডাকাতের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব ধরে নিয়ে হাবিবুর রহমান হবিকে গুলি করে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় বলে ওই সময় সাংবাদিকদের কাছে জেলা জামায়াত অভিযোগ করে।

এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান এমপি ও সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক এমপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দলের সভাপতি সমর্থিত নেতা-কর্মীরা মনে করেন, সাতক্ষীরার মোট চারটি আসনে যারা আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন তারা সবাই রুহুল হক গ্রুপের লোক।

এদিকে সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামকে মনোনয়ন না দিয়ে রুহুল হক গ্রুপের মীর মুস্তাক আহমেদ রবিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ায় জেলা আওয়ামী লীগের বৃহত্তম একটি অংশ নজরুল ইসলামের বাসভবনে বৈঠক করে মীর মুস্তাক আহমেদ রবিকে এক প্রকার প্রত্যাখ্যান করেন। ঢাকাপ্রবাসী মুস্তাক আহমেদ রবির মনোনয়ন বাতিল করে নজরুল ইসলামের মনোনয়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। পরে ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি সাইফুল করিম সাবুকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন করে আবারও প্রকট আকার ধারণ করছে দলীয় কোন্দল। আর এই রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবির আরও হিংস হয়ে ওঠে। সর্বশেষ এই কোন্দলের ভেতরে ২৮ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন আওয়ামী লীগের ১১ জন নেতা-কর্মী। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ২৯ নভেম্বর ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে সাতক্ষীরায় আসেন বিদায়ী স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক ও সদর আসনের প্রার্থী মীর মুস্তাক আহমেদ রবি। রুহুল হক সাতক্ষীরা সার্কিট হাউসে এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। এ সময় তার নির্বাচনী এলাকাসহ জেলায় একজন মুক্তিযোদ্ধাসহ তিনজন দলীয় নেতা খুন হন। এমনকি তার নির্বাচনী এলাকা দেবহাটার সখিপুরে পাকিস্তানপাড়া নামে খ্যাত এলাকায় প্রধান সড়ক অবরোধ করে রাস্তার ওপর মাটি তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতীকী কবর তৈরি করে জামায়াত-শিবির। এ সময় রুহুল হক তার এলাকায় না গিয়ে, খুন হওয়া নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর না নিয়ে, মনোনয়নপত্র জেলা নির্বাচন অফিসে জমা দিয়ে, দলীয় কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে আবারও হেলিকপ্টারে ঢাকা চলে যান।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ