Home / রাজনীতি / দুই “যুদ্ধ বেগম” ছাড়া বাংলাদেশ চলে না- ইকোনমিস্ট

দুই “যুদ্ধ বেগম” ছাড়া বাংলাদেশ চলে না- ইকোনমিস্ট

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছে। এ সুযোগে জিততে চলেছে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ। গেল বার বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার নির্বাচনের ফল ছিনতাইয়ের ফন্দি কাজে আসেনি। তখন একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর দেশ শাসন করেছিল। ওই সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর যে ধরনের সমর্থন ছিল, তা এবার নেই। ফলে দেশটি চলমান রাজনৈতিক সংঘর্ষ সহসাই থামছে না। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট এভাবেই তুলে ধরে বলছে, অধিকাংশ জনগণ ‘যুদ্ধমান বেগমদ্বয়ের’ (খালেদা-হাসিনা) বিকল্প হিসেবে কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না।

তাঁরা যত ব্যর্থই হোক, মনে হচ্ছে তাঁদের ছাড়া বাংলাদেশের চলবে না। ব্রিটিশ সাময়িকীটির অনলাইনে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও বাংলাদেশ হারবে বলে মন্তব্য করেছে ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রধান বিরোধী দল ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। এ সুযোগে নিশ্চিত জয়ের পথে চলছে শেখ হাসিনার দল। বৈধতার প্রশ্ন এখানে বাহুল্যমাত্র। নিজের শাসনকাল বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেগুলোকে এক ইউরোপীয় কূটনীতিক ধাপে ধাপে চলা অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছেন।” ‘দ্য রুলিং পার্টি উইল উইন বাংলাদেশেস ইলেকশন, দ্য কান্ট্রি উইল লুজ’ (বাংলাদেশের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল জিতবে। হেরে যাবে দেশটি) শিরোনামে প্রকাশিত এক সংবাদ বিশ্লেষণে সেনা-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ এখনো আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিকল্প হিসেবে কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। ইকোনমিস্ট বলছে, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর। একটি জনপ্রিয় অথচ বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার দায়ে তাঁকে সাজা দেন। (সে বছর) যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল। মনে করা হচ্ছিল, জন্মের পর বাংলাদেশে আর রক্তপাত হবে না। কিন্তু সে আশা মরিচিকা। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা হারানো সরকার দেশের একটা বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে নেমেছে। একের পর এক হরতাল-অবরোধের ঘোষণা দিচ্ছে দলটি। দেশের পরিবহন-ব্যবস্থা ও অর্থনীতি পঙ্গু হতে বসেছে। বিএনপির প্রধান মিত্র জামায়াত টিকে থাকার সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দলটির উগ্রপন্থী সমর্থকেরা, যারা এত দিন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তার উপায় হিসেবে (হাত-পায়ের) রগ কেটে দেওয়ার জন্য সমালোচিত, তারা এখন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে নেমেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সরাসরি গুলি চালিয়ে এর জবাব দিচ্ছে। জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা সাতক্ষীরা জেলায় ১৬ ডিসেম্বরে জামায়াতের পাঁচজন কর্মীকে হত্যা করা হয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মালিকানাধীন দোকান ও বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয় জামায়াতের তরুণ কর্মী সংগঠন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন পালিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোকজন জানিয়েছেন, জামায়াতের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সব নেতার মৃত্যুদণ্ড দেখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তিনি। বিচার বিভাগ কতটুকু স্বাধীন, সন্দেহ আছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির মতো বিদেশি ব্যক্তিত্বরা তাঁকে (শেখ হাসিনাকে কাদের মোল্লার) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করতে বলেছিলেন। কিন্তু সমঝোতা তাঁর ধাতে নেই। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। বিএনপি এবং তার জোটের অপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১৭টি দল নির্বাচন বয়কট করেছে। নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ায় সাবেক স্বৈরশাসক ও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান এইচ এম এরশাদকে হাসপাতালে আটকে রেখেছে সরকার। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আরেক বড় দল জামায়াতকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যা-ই হোক, আওয়ামী লীগ জিততে চলেছে। ৫ জানুয়ারি যা-ই ঘটুক না কেন, সরকার গঠন ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছেন শেখ হাসিনা। দেশ ও দেশের বাইরে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। নির্বাচনের দিক পরিবর্তনে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে পারে কেবলমাত্র বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত। কিন্তু হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। ভারত যদি ‘ফল নির্ধারণ করে আয়োজন করা নির্বাচনের’ (প্রেসিডেন্ট এরশাদ ১৯৮০-র দশকে এ ধরনের নির্বাচনের চল করেন) প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দেয়ও, তবুও তা দেশটির জন্য অদূরদর্শিতা বলে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ভারতবিরোধী চেতনা তুঙ্গে উঠেছে। সংঘাতময় পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছে, ভারতের মিত্র আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখানোর সম্ভাবনাও ততটাই বাড়ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা কুক্ষিগত করাকে সমর্থন করলে তা ভারতের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তা হবে ‘অপেক্ষাকৃত উগ্র ও কম সেক্যুলার বাংলাদেশ’। এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীও হস্তক্ষেপ করতে রাজি নয়। গেল বার খালেদা জিয়া যখন নির্বাচনের ফল ছিনতাইয়ের ফন্দি করছিলেন, তখন ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা দখল করে দুই বছর দেশ শাসন করেছিল। ওই সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর যে ধরনের সমর্থন ছিল, তা এবার নেই। এমনকি যেসব বিদেশি শক্তি তখনকার অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিল, তারাও এবার সমর্থন দিতে অনিচ্ছুক। এসবের অর্থ হলো, সংঘর্ষ আরও কয়েক মাস চলবে। আওয়ামী লীগের কিছু রাজনীতিকও স্বীকার করছেন, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। জনমত জরিপ বলছে, মাত্র ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি চায় সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসুক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেনাবাহিনী যদি দায়িত্ব নিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনও করে, তবু মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ‘যুদ্ধমান বেগমদ্বয়কে’ (খালেদা-হাসিনা) রাজনীতি থেকে নির্বাসনের পক্ষপাতী। দেশ চালাতে তাঁরা যত ব্যর্থই হোক, মনে হচ্ছে তাঁদের ছাড়া (বাংলাদেশের) চলবে না।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ