Home / রাজনীতি / তৃতীয় একটি শক্তি তৈরি হয়েছে

তৃতীয় একটি শক্তি তৈরি হয়েছে

মাহমুদুর রহমান মান্না

অব্যাখ্যাত একটি কারণে আমার রাতের মুক্তবাক বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে ভালোই হয়েছে। ‘দুই নেত্রীর হাতে দেশ নিরাপদ নয়- তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার এখনই সময়’- এই বক্তব্যের সপক্ষে কাজ করার চেষ্টা করছি আজ প্রায় ১৫ মাস ধরে। কী কাজ করছি, তা সবাই সব সময় দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই টক শোতে দেখতে পেত আমাকে। তাদের কেউ কেউ আমাকে একবার প্রশ্ন করত, খালি টক শো করলে তো হবে না, মাঠেও নামতে হবে। এখন টক শো বন্ধ হওয়ায় ভালো হলো যে এ ধরনের প্রশ্ন আর কেউ করবে না।
আমি মাঠেও কাজ করছি। নাগরিক ঐক্যের সংগঠন ঢাকার বাইরে বেশ কিছু জায়গায় গড়ে উঠেছে এবং উঠছে। কিন্তু সে কথা থাক। আমি একটি টিভি চ্যানেলের এক বড় কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, টক শো করা মানে কি মাঠের বাইরে থাকা! বাংলাদেশের জনগণ এখন এত টক শো দেখে যে ৪০ মিনিটের একটি টক শোতে বড় দলের আড়াই ঘণ্টার জনসভার কাজ হয়ে যায়। সে হিসেবে টক শোগুলো একেকটি বড় রাজনীতির মাঠ।
রাজনীতি প্রথমত একটি নীতির চর্চা, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালনার নীতি। একেক দলের একেক রকম নীতি থাকে। দলগুলো সেই নীতির পেছনে জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। যে দলের প্রতি জনগণের বেশি সমর্থন থাকে, সেই দল দেশ চালায়।
বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে প্রায় তিন দশক শাসন করেছে দেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ সময় দুটি দলেরই কমবেশি কিছু ইতিবাচক অবদান হয়তো আছে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে দুই দলের সম্পর্ক এত বৈরী হয়ে দাঁড়িয়েছে যে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রায় ভেঙে পড়েছে। জনজীবন বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীন। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার।
আমার এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন কেউ? হয়তো করছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এখন অনেক কম। দুই বছর আগেও মানুষ এ রকম ভাবত না। অনেক প্রশ্ন সত্ত্বেও মানুষ এ দুই দলের মধ্যে বিভক্ত ছিল। কিন্তু এখন ট্রেন, বাস, লঞ্চ-স্টিমার, শহরে, গ্রামে সর্বত্রই মানুষ বলছে- নতুন কিছু চাই। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে ক্ষমতার লোভ, হিংসা ও সংঘর্ষের এমন বিস্তার ঘটেছে যে মানুষ এই দ্বিদলীয় সাংঘর্ষিক রাজনীতির বাইরে নতুন কিছু চাচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে লোভ, হিংসা, ভণ্ডামি, প্রতারণা ও মিথ্যাচার মানুষ দেখেছে এবং এখনো দেখছে, তাতে তারা যেকোনো মূল্যে এর থেকে পরিত্রাণ চাইছে। আওয়ামী লীগের সমর্থক বন্ধুরা কিংবা বিএনপিপন্থী বন্ধুরা যদি কেউ এর বিরোধিতা করতে চান, তবে মাঠে নেমে দেখুন। নির্বাচনের নামে এই প্রহসনের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছে মানুষের, আর গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে এই অমানবিক সহিংসতায় মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে গেছে।
আমি বলছি, তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্য এখন জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। কেউ কি এটা অস্বীকার করতে পারবেন? তার মানে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্য জনগণ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। আমি বহুবার লিখেছি, আজও আবার বলছি- এই দুটি বড় দল যদি নিজেদের মধ্যে ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসে, নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ করে তবে তৃতীয় ধারার কথা কেউ বলবে না বা বললেও অন্যরা শুনবে না। কিন্তু যদি রক্ষক শেষ পর্যন্ত ভক্ষক হয়ে যায়, আমি কাউকে গাল দেওয়ার জন্য বলছি না- তারা যা করছে, তাতে আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কৃষি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে- আমরা দেখেছি মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। মৃত্যুকূপ তৈরি করতে পারি আমরা- অতএব, আমাদের ভিন্ন একটা পথ খুঁজতেই হবে।
এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনো ভুল আছে? কোনো অন্যায় আছে? বড় আকারের একটি টক শোতে গিয়েছিলাম। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেখানে আমি বলছিলাম, ক্ষমতার জন্য এই কুৎসিত লড়াইয়ের শেষ হবে না। কোনো সমঝোতা হবে না। টক শোতে আলোচনার বিষয় ছিল সমাধান দশমে না একাদশ সংসদে। কী মজা দশম সংসদের জন্য? তথাকথিত এ নির্বাচনে জনগণের ভোটের অধিকার লাটে উঠেছে। এটা কি একটা নির্বাচন হচ্ছে? সম্ভবত সরকারি দলও জানে- না, হচ্ছে না। তার মানে দশমে যে বৈরিতা বাড়ছে, তা কমছে না। লড়াই আরো জোরদার করার কথা শোনা যাচ্ছে। ২৪ তারিখ আবারও শাপলা চত্বরে সমাবেশ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে হেফাজত। পত্রিকায় দেখলাম, সামনের সপ্তাহে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া নাকি নিজে রাস্তায় নামবেন। দশম সংসদেরই নিষ্পত্তি হচ্ছে না যখন, তখন বলা হচ্ছে একাদশ সংসদের কথা। কী ঘুমপাড়ানি গান! টক শোতে আমন্ত্রিত অতিথিদের প্রায় সবাই বললেন, দ্রুতই সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে পাঠকসমাজ, নতুন কিছু সমাধান খোঁজা ছাড়া বিকল্প কী খোলা আছে আমাদের কাছে? আর কী উপায় আমাদের? মানুষ তো তা-ই বলছে, নতুন কিছু চাই। এই নতুন কিছুকেই আমি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি বলছি। আপনারা বলতে পারেন, তৃতীয় বলছেন কেন? প্রথম বা দ্বিতীয় হতে পারে না? সত্যি বলি, নতুন কিছু এটা প্রথম বা দ্বিতীয় ধারায় পড়েই না। মূল দুটি ধারা যখন পারছে না, তাদের নেতৃত্বের বাইরে যেতে হবেই। সেটা নাগরিক ঐক্যই হতে হবে সে রকম নয়, সেটা গণফোরামের ধারা হবে সে রকমও কোনো কথা না। কিন্তু এর বাইরে একটি স্বস্তির রাজনীতি, ইতিবাচক রাজনীতি। এই দুর্বৃত্তায়নমুক্ত রাজনীতির ধারা আমাদের তৈরি করতেই হবে। এই নষ্ট রাজনীতির অবসান করতে হবে। আমাদের সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা ভাবতে হবে।
এখন যদি কেউ প্রশ্ন করেন- তা এটা খুঁজে কদ্দুর গেলেন? তাহলে বলব- এটা কোনো ব্যক্তির একা খুঁজলে চলবে না, মানুষের নিজেদের খুঁজে নিতে হবে। এ কথাগুলো যদি ঠিক হয়, বিশ্লেষণ যদি ঠিক হয়, তবে সবাইকেই ভাবতে হবে। যারা ভাববার মতো, ভেবে কিছু উপাদান হলেও যোগ করতে পারবেন, তাঁদের সবাইকেই যুক্ত করতে হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সমাজে তৃতীয় একটি শক্তি তৈরি হয়েছে। এই শক্তি যে সংগঠন বা রাজনৈতিক কোনো দল হতে হবে, তা না। একটা মিডিয়াম- বিশাল শক্তি বাড়িয়েছে যা অবশ্যম্ভাবীভাবে নির্দিষ্ট কোনো ধারাকে ব্যাখ্যা করে না। একটা বিরাট সিভিল সোসাইটি গড়ে উঠেছে, যারা হয়তো সবাই একত্রিত নয়, কিংবা একই ধারার নয়, তবে সরকার বা বিরোধী দল কোন ভুল করছে, তার বিরুদ্ধে তারা কথা বলছে। মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সাহসী। আমাদের ছাপানো পত্রিকাগুলো যাকে আমরা বলি প্রিন্ট মিডিয়া, তারা তাদের কথা বলছে। ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা মত তৈরি হয়েছে। আজকে যদি এমন একটি গণভোটের ব্যবস্থা থাকত, যেখানে তিনজন প্রার্থী, একজন শেখ হাসিনা, একজন খালেদা জিয়া আর অন্যজন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি- তাহলেই বোঝা যেত আসল দৃশ্য কী। যাঁরা প্রায়ই বলেন- কিছুই গড়ে ওঠেনি তাঁদের বলছি, মানুষের মনন গড়ে উঠেছে। মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ইতিবাচক কিছু একটা চাইছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে এটা কম অর্জন নয়। এটাকে ধীরে ধীরে সাংগঠনিক কাঠামোতে নিয়ে যেতে হবে। তবে কেউ যদি মনে করেন আগামী নির্বাচনে সেটা না হলেই সেটা বিরাট ব্যর্থতা, না, তা-ও নয়। ৪২ বছরের বাংলাদেশে পুরো সময়টা ধরেই তো নেতিবাচক পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এই নেতিবাচক পরিবেশ বর্জন করে যে ইতিবাচক দিক গড়ে উঠেছে, তা-ই অনেক বড় লক্ষণ। তবে এ রকম নয় যে আগামী নির্বাচনের আগেই তা গড়ে উঠবে। যদি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকত, তবে আমি মনে করি সত্যি এই দুটি ধারার বাইরে একটি স্বাভাবিক আত্মমুখী শক্তির আবির্ভাব হতো। হয়তো দিল্লির আম আদমি পার্টির মতোই; কিন্তু সে রকম নির্বাচনও তো হচ্ছে না।
আম আদমি পার্টি এখন দিল্লি তথা ভারতবর্ষ, এমনকি বাংলাদেশেও একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এ নিয়ে পরে কখনো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। কিন্তু এখন আম আদমি পার্টি একটি বাস্তবতা। এটি দিল্লিতে হতে পারলে ঢাকায় হতে পারবে না কেন? সামনের মে-তে ভারতের জাতীয় নির্বাচন। ওখানে বাংলাদেশের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? প্রতিদিন মানুষ মরছে? সম্পদ নষ্ট হচ্ছে? ভারতেও জাতীয় কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মতো উদগ্র ক্ষমতার লড়াই আছে? নাই। অতএব এখানকার মানুষের আরো বেশি করে আম আদমি পার্টি চাওয়ার কথা।
যখন কেউ বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার তৃতীয় শক্তি গড়ার কত দূর, তখন আমার হাসি পায়। কারণ আমি জানি ওই সব মানুষ কায়েমি স্বার্থের লাভবান বা কায়েমি স্বার্থের উচ্ছিষ্টভোগী। কিন্তু যখন কেউ বোঝান বা বোঝানোর জন্য প্রশ্ন করেন, তখন আমার ভালো লাগে। বেশির ভাগ আমার ফেসবুকে আসেন বা এসএমএস করেন আকাঙ্ক্ষা থেকে, তখন আমি সাহসী হই। মানুষ যখন চাইছে, তখন একটা কিছু হবে। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দল দুটি যদি দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা করে, নিজেদের সময় ও জন-আকাঙ্ক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলে, তবে আর তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি লাগবে কেন? কিন্তু এ দুটি দলের ওপর মানুষ যে আস্থা রাখতে পারছে না।
ড. সা’দত হুসাইনের একটি বক্তব্য দিয়েই লেখাটি শেষ করতে চাই।
টক শোতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. সা’দত হুসাইন বলেছিলেন, ‘তৃতীয় শক্তি এখনই গড়ে উঠবে, তা মনে করি না। এটা গড়ে উঠতে হয়তো ১৫-২০ বছর লাগবে। কিন্তু ওরা ঠিক না হলে এটা গড়ে উঠবেই।’
লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ