Home / রাজনীতি / ‘সরকারি ছেলেধরার’ খপ্পরে বুড়ো এরশাদ

‘সরকারি ছেলেধরার’ খপ্পরে বুড়ো এরশাদ

প্রহসন নির্বাচন নাটকের ‘কৌতুক’ অ্যাপিসোডটা একদম আনাড়ির মতো অভিনীত হলো গত ১২ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে তার বারিধারার বাসা থেকে র‌্যাব-১ তুলে নিয়ে যায়। পরে বলা হয়, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য র‌্যাবের ‘সেবাকর্মীরা’ তাকে সিএমএইচে নিয়ে গেছে এবং সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। সেই রাতেই বিভিন্ন টকশো’তে এ নিয়ে বেশ মজার মজার মন্তব্য করেছেন কোনো কোনো আলোচক। সবচেয়ে রসালো মন্তব্যটি ছিল এমন, ‘অসুস্থ বোধ করলে ডাক্তারকে নয়, এখন থেকে র‌্যাবকে খবর দিন।’ প্রহসন- নির্বাচন নাটকের এই কৌতুকাংশ এতই কাঁচা হাতে প্রণীত যে, দর্শক-শ্রোতারা হাসতে পারেনি। তবে হেসেছে শাসক লীগের এক মস্ত বড় নেতা এবং আগামী নির্বাচনে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত(!) এমপি মোহাম্মদ নাসিমের কথা শুনে। তিনি আবার এখন চৌদ্দ দলের মুখপাত্রও বটে। আসন্ন একতরফা নির্বাচনী (যদি অনুষ্ঠিত হয়) নাটকে এমন একটি কৌতুকাংশ অভিনীত হবে, জনগণ তা আগে থেকেই জানত। তাই তাতে হাসেনি কেউ। তবে মোহাম্মদ নাসিমের উচ্চারিত ডায়ালগটা যদি মূল নির্বাচনী নাটকের কৌতুক পর্বের অংশ হয়, তাহলে বলা যাবে, তার ডায়ালগটা বেশ জমেছে। এরশাদ সাহেবকে যারা ধরে বা তুলে নিয়ে গেছেন, তারা কিছু বলার আগে বা তাদের কোনো ভাষ্য টিভি পর্দায় আসার আগেই বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপি মো. নাসিম বলেছেন, অসুস্থ বোধ করায় তার অনুরোধেই র‌্যাব তাকে সিএমএইচে নিয়ে গেছে। তিনি অবশ্য ব্যাখ্যা করে বলেননি, অসুস্থ বোধ করার পর তাকে চিকিৎসার্থে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কোনো লোক কি তার বাসায় ছিল না? পরে তো জানা গেল তার বাসায় বেশ কিছু লোক ছিল। ধরে নেওয়া গেল, বাসায় থাকা লোকজনের ওপর ভরসা করতে পারেননি সাবেক এই সেনা প্রধান। তাহলে তার ভাই বা অন্য কোনো আত্দীয়স্বজন বা নির্ভরযোগ্য অন্য কাউকে খবর না দিয়ে তিনি র‌্যাবকে কেন খবর দিলেন? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এরশাদকে নিয়ে গভীর রাতে অভিনীত এই নাটক সরকারের দেউলিয়াত্বের একটা অকাট্য দলিল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪১টি দলের মধ্যে অধিকাংশের বর্জনের মুখে একতরফা একটি অগ্রহণযোগ্য ও দেশ-বিদেশে কঠোরভাবে সমালোচিত প্রহসন- নির্বাচনের একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার স্পষ্টতই ফাটা বাঁশে আটকে গেছে। অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে লীগ সরকারের একটা সমঝোতা যে ছিল তা নানাভাবে স্পষ্ট হয়েছে। দুই পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রেখে বেগম খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে এরশাদ সাহেব মহাজোটে থেকেই নির্বাচন করবেন, বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করলে জাতীয় পার্টি এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করবে এবং সমঝোতা অনুযায়ী বিরোধী দলে বসবে। কিন্তু বিভিন্ন জরিপ রিপোর্ট বলছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ বড় জোড় ৫০টি আসনে জিততে পারে। বাকি আসনে তাদের খবর থাকবে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের একমাত্র কারণই এটা। বিরোধী দলের ওপর সরকার জেল-জুলুম, মামলা-হামলা চালিয়ে তাদের সাজানো ছকে পাতানো নির্বাচনটি নির্বিঘ্নেই করে ফেলতে পারবে ভেবেছিল। বিএনপিকে একটি আন্দোলন সক্ষম দল হিসেবে বিবেচনায়ই নেয়নি তারা। শাসক লীগের মন্ত্রী-মিনিস্টার, নেতা, পাতি নেতা, নৌকা মার্কা নিয়ে এমপি হওয়া এক টুকরা জাসদের হাসানুল হক ইনু ও এক টুকরা ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন প্রমুখের মুখ থেকে প্রায়শই শোনা যাচ্ছে, বিএনপির আন্দোলন করার কোনো ক্ষমতাই নেই। এরশাদ সাহেবও বোধ হয় তা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু গত এক মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনের চাপে লীগ সরকার অনেকটাই ‘চিঁড়া-চ্যাপ্টা’ হয়ে গেছে। বলা হতো, জামায়াতই ১৮ দলের আন্দোলনের শক্তি। কিন্তু গত তিনটি অবরোধ কর্মসূচিতে দেখা গেছে, উত্তাল সারা দেশের সফল অবরোধের নব্বই শতাংশ স্থানেই বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকরাই সরকারকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। সরকার, প্রশাসনকে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা অক্ষম কি সক্ষম। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিচক্ষণতার সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিশ্চয়ই তিনি এটা উপলব্ধি করেছেন যে, ঘোষিত দশম সংসদ নির্বাচনে যাওয়া হবে তার জন্য আত্দঘাতী। যেভাবে তার পতন হয়েছিল, তারপর তার আর রাজনীতিতে উঠে দাঁড়াতে পারার কথা ছিল না। কিন্তু শুধু দাঁড়ানো নয় এখন রীতিমতো তিনি রাজনীতির তারকা পুরুষ। তাকে এ অবস্থানে এনেছেন প্রধান দুই দলের দুই নেত্রী। রাজনীতি আর আদর্শের ব্যাপারে তারা অটল থাকলে স্বৈরাচারের পিছে ছুটতেন না কেউ। কিন্তু এখন এটা বলা চলে, স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার দিক থেকে তিনজনই এক। একজন ক্ষমতা জবরদখলকারী স্বৈরাচার, বাকি দুজন নির্বাচিত স্বৈরাচার। তিনজনই নীতিহীন, আদর্শহীন, লুটেরা রাজনীতির অনুসারী হিসেবে সমালোচিত ও নিন্দিত। অভিন্ন স্বার্থেই এরশাদকে নিয়ে দুজনের টানাটানি। এরশাদ হয়তো ভাবছেন, শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে লীগ সরকারের অধীনে যদি এবার পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তাহলে স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে করুণ পতনের চেয়েও এবার তার পরিণাম হবে আরও ভয়াবহ।

এরশাদ সাহেব নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর শাসক লীগের নেতা-মন্ত্রীরা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলে আসছিলেন, তিনি নির্বাচন করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় ভীষণ বিপাকে পড়েছে লীগ সরকার ও শাসক লীগ। মহাজোটের পার্টনার থাকার পরও পাঁচ বছরে ৬০ মন্ত্রী-উপদেষ্টার চালানে এরশাদের দলের ভাগে ছিল মাত্র একটি মন্ত্রিত্ব। অথচ তার দল মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং এমপি ছিল ৩০ জন। আর বর্তমান ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন-এর মতো ‘লেংড়া-খোঁড়া’ সর্বদলীয় (!) সরকারে জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়েছে ৭ মন্ত্রী-উপদেষ্টা! চাইলে বোধহয় আরও পাওয়া যেত। বোঝাই যায়, কি বিপদেই না আছেন শেখ হাসিনা।

মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনার ঘুমই হারাম করে দিয়েছেন এরশাদ। মনোনীতদের অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কোথাও প্রার্থিতা প্রত্যাহারে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ‘চুদুরবুদুর’ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। মন্ত্রীরা তার সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেননি। তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা রেখেছেন। মন্ত্রিসভার গত বৈঠকে তারা যোগদানও করেননি। ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের এক রায় অনুযায়ী এভাবে পদত্যাগের কথা প্রকাশ্যে উচ্চারণের পর পদে আর বহাল থাকা যায় না। এরপর তারা যদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেন এবং এরশাদ সাহেব যদি তার কাছে রক্ষিত মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পদত্যাগপত্র পাবলিক করে দেন তাহলে মন্ত্রিসভার কর্মকাণ্ডের আইনগত জটিলতা প্রধানমন্ত্রীর জন্য আরেকটি বড় সাংবিধানিক ও আইনি সংকট সৃষ্টি করতে পারে। রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সরকারি টোপ গিলে বসে আছে বলে মনে হয়। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন বাবলু পার্টি ভাঙার এই প্রয়াসের অনুঘটক বলে প্রচার আছে। এটাও বলা হয়, এরা দুজন অনেক আগে থেকেই সরকার ঘেঁষা। কিন্তু ১১ ডিসেম্বরই এরশাদ বলে দিয়েছেন, তিনি কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেননি, আমৃত্যু তিনিই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান থাকবেন। শেষ কুলুপটি তিনি এঁটে দিয়েছেন ১২ ডিসেম্বর সকালে। তার দলের নির্বাচনী প্রতীক অন্য কাউকে বরাদ্দ না দেওয়ার জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এসব ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার একমাত্র তার, পার্টি চেয়ারম্যানের। কাজেই এরশাদ মনোনীত কিছু নেতা-নেত্রীকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, লোভে ফেলে জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর পথও আইনত ওই পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অবৈধ। রওশনপন্থিরা বলছেন, প্রেসিডিয়াম সভা ডেকে তারা রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করবেন। কিন্তু জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র চেয়ারম্যান ব্যতিরেকে অন্য কাউকে এমন ক্ষমতা প্রদান করেনি।

এদিকে সময় প্রায়ই শেষ। তাই একদিন হাতে রেখেই নির্বাচনে রাজি হতে বাধ্য করার জন্য অথবা রওশন এরশাদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য করার জন্যই সরকার তার ওপর বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এরশাদ কার্যত বন্দী। অবশ্য এই লেখা প্রকাশের দিন তার কাছ থেকে কোনো কাগজ-পত্রে সই আদায় করে নেওয়া হয় কিনা, কিংবা চিকিৎসার কথা বলে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কিনা বলা মুশকিল। প্রশ্নবিদ্ধ, দেশ-বিদেশে কঠোরভাবে সমালোচিত দশম সংসদ নির্বাচনে ধরে-বেঁধে হলেও জাতীয় পার্টিকে রেখে লীগ সরকার বোঝাতে চাইছে, এটা একদলীয় নির্বাচন হচ্ছে না। কিন্তু যাদের এটা বোঝানোর জন্য সরকার এতো অনৈতিক, অরুচিকর পদক্ষেপ নিয়েছে ও নিচ্ছে তারা কি এতই ‘বলদ’ যে, তারা বুঝছে না। এরশাদের পার্টি ছাড়া আর যে তিনটি নিবন্ধিত দলকে শাসক লীগ ১০টি আসন ছেড়ে দিয়েছে, নৌকা প্রতীক ছাড়া নির্বাচন করলে তাদের কারও জামানতও থাকার কথা নয় বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। তাই এরশাদকে নিয়ে এত টানাহেঁচড়া। এরশাদ সাহেব তার তিন আসন থেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছেন। গত ১২ ডিসেম্বর জানানো হয়েছিল এবং মিডিয়ায়ও এসেছিল, রংপুরের দুটি আসন থেকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার হয়েছে, কিন্তু ঢাকার আসনে তারিখ বিভ্রান্তির জন্য তার প্রত্যাহারের দরখাস্ত ফেরত দেওয়া হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর জানা গেল, ঢাকার আসনের প্রার্থিতা প্রত্যাহার হয়েছে, কিন্তু রংপুরে একটি আসনে তার প্রার্থিতা নাকি বহাল আছে। তার ভাই জিএম কাদেরের প্রার্থিতাও প্রত্যাহার করেননি সেখানকার কমিশন কর্তারা। তার প্রার্থিতাও বহাল রেখে দিয়েছেন। সরকারি নির্দেশে এরশাদকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপে ফেলে নির্বাচনে রাখার জন্য এটা নির্বাচন কমিশনের কোনো ফন্দি কিনা কে জানে! এরশাদ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকার ভয়-ভীতি ও প্রলোভনের কাছে নত না হন এবং রওশন এরশাদ সরকারের ‘পোষ মানা বাকুম বাকুম পায়রা’ থেকে যান, তাহলে তিনি কোন প্রতীকে নির্বাচন করেন, তা দেখার বিষয়। এরশাদ সাহেবের চিঠি অগ্রাহ্য করে যদি রওশন এরশাদের জাপা-টুকরাকে লাঙল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে বুঝতে হবে, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট বলে বিরোধী দল যে অভিযোগ করছে, তা সত্য। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়ে যেতে পারে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে শেখ হাসিনার খুবই প্রয়োজন। আপসে আত্দসমর্পণ করেননি তিনি। তাই অন্য ব্যবস্থা। সরকারি তরফ থেকে যত কথাই বলা হোক, তার ভাই জিএম কাদেরের বক্তব্যে সব ফাঁস হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, ‘তাকে অস্বাভাবিকভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ ১৩ ডিসেম্বর রাতে সিএমএইচ থেকে পাঠানো এক বার্তায় এরশাদও জাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি অসুস্থ নন। বন্দী করার জন্যই তাকে আটকে রাখা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, ‘সরকারি ছেলেধরার’ খপ্পরে পড়েছেন তিনি। পরিস্থিতিটা এখন এমন যে, কোনো কিছুই সরকারের অনুকূলে যাচ্ছে না। নানা ছলচাতুরী, কলাকৌশলে এরশাদকে যদি এই পাতানো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আটকেও রাখা হয়, মানুষ বুঝে নেবে এটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এমতাবস্থায় এরশাদকে সঙ্গে রেখে নির্বাচন করেও তা দেশ-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করানো যাবে না। রওশন গ্রুপ এবং আগে থেকে জাপায় সরকারি দালালদের নিয়ে তো প্রশ্নই নেই। এরশাদকে নিয়ে সরকার ১২ ডিসেম্বর গভীর রাতে যে নাটক দেখাল, পাঠক, আপনাদের মনে আছে, শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে মিরপুরের বিএনপি নেতা এসএ খালেককে নিয়েও ঠিক এমনই একটা নাট্যাভিনয় হয়েছিল। একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে কাজটি করানো হয়েছিল। তাতে দেখানো হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী (তখনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন) শেখ হাসিনার অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে এসএ খালেক বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন সদলবলে। কিন্তু পরদিনই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানান, তাকে জোর করে ধরে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজটি করানো হয়। পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে তা প্রচার হয়েছিল। তখনো বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। আন্দোলনের প্রচণ্ড চাপে শেখ হাসিনার নাভিশ্বাস উঠেছিল। বিএনপিকে ভেঙে দুর্বল করার নোংরা খেলার অংশ হিসেবে তা করা হয়েছিল। কোনো সুফল বয়ে না এনে বরং তা হয়েছিল ব্যুমেরাং। তাতে শিক্ষা হয়নি আওয়ামী লীগের। বোঝা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটা নির্বাচন করতে চাচ্ছে না। তারা বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সব কলাকৌশল প্রয়োগ করছে নিজেদের আবারও ক্ষমতারোহণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। একটি সূত্রে প্রকাশ, রওশন এরশাদ নির্বাচনী তফসিল পেছানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, তা করলে এরশাদকে নির্বাচনে আনা যাবে। প্রধানমন্ত্রী নাকি সাফ জানিয়েছেন, তা করা যাবে না। তিনি এমন ভাব নাকি দেখিয়েছেন, করলেই বিএনপি ঢুকে যাবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি অস্কার ফারনান্দেজ তারানকোর সফর সম্পর্কে দু’একটা কথা না বললেই নয়। সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় জাতিসংঘ। তারা চায় সংলাপের মাধ্যমে এ ব্যাপারে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতা। তারানকো এসেছিলেন সে রকম একটা ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তিনি পারেননি, তার সফর ব্যর্থ। সরকারি দল ক্ষমতায় থেকে, নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে রেখে, সংসদ বহাল রেখে এবং বিরোধী দল নির্দলীয় সরকার ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির স্ব স্ব দাবিতে অনড় থাকায় তারানকো মিশন জাতিকে আলো দেখাতে পারল না। ১৩ ডিসেম্বর খবর পাওয়া গেছে, দুই মহাসচিবের নেতৃত্বে তৃতীয় সংলাপে নাকি প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে, দুই নেত্রী তাতে সম্মত হলে একটা সমঝোতা হয়ে যাবে। পাঠক, আমরা এতে আশায় বুঁক বাঁধতে চাই, কিন্তু ভরসা কি করতে পারি? তবে এটা চাই, মানুষের সীমাহীন কষ্ট, রক্ত আর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাজনীতি বন্ধ হোক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ