Home / রাজনীতি / খুঁজে খুঁজে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যা

খুঁজে খুঁজে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী হত্যা

সম্প্রতি হরতাল অবরোধে সাতক্ষীরাবাসী জামায়াত-শিবিরের হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে এবং খুঁজে খুঁজে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে হরতাল-অবরোধের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হচ্ছে এবং গাছ কেটে মাইলের পর মাইল রাস্তা বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। এমনকি, রাস্তা কেটেও ফেলা হয়েছে।

জামায়াত-শিবির পরিকল্পিতভাবে সাতক্ষীরায় কিলিং মিশনে নেমেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জামায়াত-শিবির যে কায়দায় হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তা তালেবান জঙ্গিদেরই অনুরূপ। সাতক্ষীরাকে জামায়াত-শিবির সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখার পাঁয়তারা করছে। সেই লক্ষ্যে তারা একের পর এক হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরাবাসী পুরোপুরি অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এবং সেখানকার প্রশাসনও প্রায় অচল হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, জামায়াত শিবিরের তাণ্ডব একাত্তর সালকেও হার মানিয়েছে। সাম্প্রতিককালে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব ও রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩২ জন নিহত হয়েছেন। ইত্তেফাক প্রতিনিধিরা সাতক্ষীরায় অনুসন্ধান চালিয়ে রোমহর্ষক তথ্য পেয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এসব ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতা পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। তাদের কর্মীদের অনেকে জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করে জীবন রক্ষা করেছেন। অনেকে জামায়াত-শিবিরকে চাঁদা দিয়ে রক্ষা পাচ্ছেন। প্রতিটি উপজেলা এবং ইউনিয়নে জামায়াত-শিবির ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

সন্ধ্যার পর অগ্নেয়াস্ত্র ও বোমাসহ নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে জামায়াত-শিবির টহলে নামে। কারো ঘরে দরজা খোলা থাকলে তারা ঢুকে পড়ে। বাসিন্দাদের ঘরের দরজা বন্ধ করে বন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি ৭১ সালেও হয়নি বলে মন্তব্য করেন সাতক্ষীরার ৭টি উপজেলার অনেক বাসিন্দা। এসব বাসিন্দা স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব সম্পর্কে এমনই ভীতিকর তথ্য দেন।

গতকাল শনিবার মধ্য রাতে র্যাব-পুলিশের সাতক্ষীরায় অভিযান শুরু করার কথা। সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চক্রবর্তী ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল শনিবারটা ভালই গেছে। তেমন কিছু ঘটেনি। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির সাতক্ষীরাকে তাদের হাতের মুঠোয় রাখার চেষ্টা করছে। তবে তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হবে না। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় ফিরে যাবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

স্থানীয় প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবিরের হাতে এপর্যন্ত ২২ জন স্থানীয় সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকে এলাকা ছাড়া। তাদের মধ্যে মানবজমিনের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ইয়ারব হোসেন ও কলারোয়ার সাংবাদিক আব্দুর রহমানকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে শিবির ক্যাডাররা। আগরদাড়ী, ভোমরা, বৈকারী, বাশদহা, ঘোনা, কুশখালি ইউনিয়ন এবং জেলার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া, সখিপুর ও কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপ নগর, শ্যামনগর উপজেলার কাশিমমাড়ি ইউনিয়নের রাস্তাগুলোতে গাছের গুঁড়ি ফেলে গোটা এলাকা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। জেলার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২ শতাধিক বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর কলারোয়ার সরসকাটি থেকে ত্রিশমাইল সড়কের জয়নগর মিশনের সামনে পাকা রাস্তা কেটে দেয় জামায়াত-শিবির। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখে। জেলার সঙ্গে সাতটি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

৮ ডিসেম্বর জেলা সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের নিরীহ এজাহার আলী মোড়লকে (৪৫) প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে। তিনি একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক। ৫ ডিসেম্বর রাত ৯টায় সদর উপজেলার কুচপুকুর গ্রামে আওয়ামী লীগ কর্মী সিরাজুল ইসলামকে তার বাসায় স্ত্রীর সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৪ ডিসেম্বর রাত ১২টায় জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়া শিমলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন খোকনের (৬৩) বাসায় ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা-ভোমরা সড়কের মাহমুদপুর এলাকায় যুবলীগ কর্মী গিয়াসউদ্দিন সরদারকে (৩০) দিনের বেলায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২১ নভেম্বর রাতে দেবহাটা উপজেলা পারুলিয়া বাজারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু রায়হানকে (৪২) কুপিয়ে হত্যা করে উপস্থিত লোকজনের সামনে দিয়ে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বীরদর্পে চলে যায়। ২৬ নভেম্বর কলারোয়া উপজেলার মীর্জাপুরে দেয়াড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বাবুকে (৩২) জামায়াত-শিবির কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে। ২৬ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামকে (৫৫) হরিশপুর এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৩ আগস্ট দুপুরে গড়ানবাড়িয়া এলাকায় শ্রমিক লীগ নেতা আলমগীর হোসেনকে (৪২) হাত পায়ের রগ কেটে ও পিটিয়ে হত্যা করে। ১৫ জুলাই সকাল ৯টায় দেবহাটার সখিপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। হরতাল ও অবরোধে জ্বালাও পোড়াও সহিংস ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাব-পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষে ১৬ জন জামায়াত-শিবির কর্মী নিহত হয়। এ সব ঘটনার পর জামায়াত শিবিরের তাণ্ডব চলে বেপরোয়াভাবে। স্থানীয় প্রশাসন এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থ হওয়ায় এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাতক্ষীরা জেলা হয়ে ওঠে আতংকের জনপদ। এখন এক এলাকার লোকের মাতম শেষ হতে না হতেই অন্য এলাকায় শুরু হয় নতুন করে আহাজারি। রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতক্ষীরায় প্রতিদিন হামলা, মামলা ও খুনের শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। এ প্রতিহিংসার তাণ্ডবলীলা কখনো থামবে কিনা জানা নেই এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে সাতক্ষীরা জামায়াত-শিবিরের এই কিলিং মিশন। স্থানীয় প্রশাসন এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। খুনের ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ জড়িতদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গভীররাতে কলারোয়া উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের বাড়িতে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা ঢুকে আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমানকে (৫৪) কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে সরসকাটি গ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদী হাসান জজ মিয়াকে (২৪) হত্যা করা হয়।

র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, সাতক্ষীরার এসব হিংসাত্মক এবং খুনের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ