Home / রাজনীতি / চলমান সঙ্কটের মূল রহস্য কোথায়?

চলমান সঙ্কটের মূল রহস্য কোথায়?

এরশাদ মজুমদারঃ
আমরা তো একটা জাতি। একটা ভাষা। একটা ভূমি। সবাই ধর্মে বিশ্বাসী। তাহলে কী নিয়ে চলমান বিরোধ, যার জন্যে শত শত মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। শত শত মানুষ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গরিব শ্রমিকরা বেকার হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে। কী এমন জটিল সমস্যা, যার জন্যে দেশকেই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে হবে! দেশের সবাই বলছেন সমঝোতা হওয়া অপরিহার্য। হতেই হবে সমঝোতা, এছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থার আমরা সদস্য। আমাদের দেশে আগুন জ্বললে, মানুষ মরলে বিশ্ববাসী চুপ করে থাকতে পারে না। তাই বিশ্বনেতারা এ ব্যাপারে কথা বলছেন, সমাধানের পথ খোঁজার জন্যে দৌড়ঝাঁপ করছেন। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিরোধটা কি এতই কঠিন যে, এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও তখন রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো পথ খুঁজে পায়নি। ফলে পাকিস্তান আর টিকে থাকতে পারেনি। এজন্যে দায়ী কে? আমি বলবো এজন্যে পাকিস্তানি গোষ্ঠীই এককভাবে দায়ী। নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এমন কঠিন কঠোর সামরিক ব্যবস্থা কোনো দেশ কোথাও করেনি। এখানে একপক্ষ ছিলেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, অপরপক্ষে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জনগণের নেতা হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ, যাদের ৯০ ভাগই বাঙালি মুসলমান, তাদের হয়ে দাবি-দাওয়া নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছিলেন। যদিও ৪২ বছর পরেও আমরা জানতে পারিনি কী নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন ২০ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত। আমার ধারণা, তিনি চেয়েছিলেন একটি কনফেডারেশন। ছয়দফা ওরকমই একটি সনদ ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে তারা শেখ সাহেবের সঙ্গে সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারেনি। বারোশ’ মাইলের ব্যবধানের একটি রাজ্য বা প্রদেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার একমাত্র পথ ছিল সমঝোতা এবং একমাত্র সমঝোতা। এছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। বঙ্গবন্ধুও চাননি কোনো ধরনের রক্তারক্তি, হানাহানি বা সশস্ত্র যুদ্ধ। ২৫ মার্চের মাঝরাতের সামরিক আক্রমণই পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
অপরদিকে, ভারতীয় গবেষকদের মতে, ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের অস্তিত্ব মেনে নেয়নি। ভারত অবিরাম কাজ করে যাচ্ছিল পাকিস্তানকে টুকরো করার জন্যে। ’৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের সামরিক আক্রমণ ছিল ভারতের জন্যে একটা বিরাট সুযোগ। সে সুযোগকে ভারত কাজে লাগিয়েছে। যদি পাকিস্তান ২৫ মার্চ সামরিক অভিযান না চালাতো তাহলে ভারত কি ওই সুযোগটা পেতো? মাওলানা আবুল কালাম আজাদ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। জন্মেছেন মদিনায়। তার বাবা বাঙালি আর মা আরব। পড়ালেখা করেছেন কলকাতায়। তিনিই ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন বাঙালি মুসলমানরা বেশিদিন পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারবে না। তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারে বাঙালি মুসলমানের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ, ব্রিটিশের হাতে তারাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও লুণ্ঠিত হয়েছে। মুসলমানরাই স্বাধীন অখণ্ড বাংলাদেশের দাবি তুলেছিল। জিন্নাহ সাহেবের আপত্তি না থাকলেও নেহরু ও গান্ধীজির আপত্তি ছিল। বাঙালি মুসলমানের উদার মনোভাবের কারণেই তারা লাহোর প্রস্তাব মেনে নিয়ে পাকিস্তান কনফেডারেশনের সদস্য হতে রাজি হয়েছিল। জিন্নাহর সঙ্গে শেরেবাংলার বিরোধও বাঙালি মুসলমানের জন্যে একটা দুর্ভাগ্য। তাই তাদের বারোশ’ মাইল দূরের এক অজানা অচেনা মুসলমান ভাইদের সঙ্গে একই রাষ্ট্রের অংশীদার হতে হয়েছে। এই মুসলমানরাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান সাহেবকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত করেছিল। লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার মেনে নিয়েই পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সাজানো উচিত ছিল। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেবও তার সরকারি চিঠিপত্রে বিভিন্ন সময়ে পূর্ববাংলার জন্যে অধিকতর প্রশাসনিক স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিলেন। কীভাবে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল এবং কীভাবে ’৭১-এ দুই ভাইয়ের বিরোধ থেকে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল তা আমাদের নতুন প্রজন্মের তরুণদের অবশ্যই জানা দরকার। আমাদের জাতীয় ইতিহাস তৈরির জন্যে সঠিক তথ্যগুলো প্রকাশিত হওয়া দরকার। চলমান বিরোধের গভীরে আমাদের অবশ্যই যাওয়া দরকার। এটা কোনো দুই দলের বিরোধ নয়। খোলা চোখে তা-ই মনে হয়। নির্বাচন এলেই এরকম হয়, আমি তা মনে করি না বা কখনোই ভাবি না। আমার চিন্তার সঙ্গে অনেকেরই মিল আছে আবার অনেকের মিল নেই। কিন্তু আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এরকম একটি মৌলিক বিষয়ে কোনো গবেষণা এখনও শুরু হয়নি। কিছু হলেও তা একেবারেই বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। অনেকেই বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতর তেমন কোনো ফারাক নেই বা মৌলিক কোনো আদর্শগত ফরাক নেই। দুটি দলই পুঁজিবাদের সমর্থক ও ধনবাদী দেশগুলোর বন্ধুত্ব কামনা করে। আমি তা একেবারেই মনে করি না। বিরোধটা গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ নিয়ে নয়। তাহলে কেন দুই দলের ভেতর এত শক্ত বিরোধ বা দ্বন্দ্ব? দুই দলের কেন এত কোটি কোটি সমর্থক? দুই দলের এই বিভাজন কি জ্ঞানের ভিত্তিতে, না অজ্ঞানতার ভিত্তিতে তা অবশ্য আমি জানি না। একদল কেন নিজেদের বাঙালি বলে, আর অন্যদল কেন নিজেদের বাংলাদেশী বলে। এই দুটি শব্দের ভেতর দ্বন্দ্ব কোথায়? অফিসিয়াল জাতীয়তা বাংলাদেশী হলেও রাজনীতিতে তারা কেন বাংলাদেশী হতে পারে না? এ খটকাটা কি আপনাদের মনে আসে? বঙ্গবন্ধুর আমলে এ বিষয়টি এতো প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। তিনি শুধু এ বিষয়ে একবারই জাতীয় সংসদে বলেছিলেন মানবেন্দ্র লারমাকে লক্ষ্য করে, ‘তোরা সবাই বাঙালি হয়ে যা।’ লারমা এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, আমরা তো চাকমা, আমরা কেন করে বাঙালি হবো। এরপর জিয়া সাহেব বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে আসেন। তিনিই বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা দিলেন, আমাদের জাতীয়তা বাংলাদেশী। এ ব্যাপারে খোন্দকার আবদুল হামিদ সাহেবের প্রবন্ধ ও গোলাম কিবরিয়া সাহেবের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ বইটি উল্লেখযোগ্য। তবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশে নিয়মিত কাজ করছেন এবং টাকা খরচ করছেন। এ ব্যাপারে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, ছায়ানট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঘাদানিকসহ আরও বহু সংগঠন কাজ করছে। এছাড়া বাঙালিয়ানা, সেক্যুলারিজম নিয়ে অবিরাম কাজ করছে নব্বই ভাগ মিডিয়া। সেদিক থেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীরা অনেক পেছনে পড়ে আছেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও এ ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে কনফিউজড। অনেকেই স্বার্থের জন্যে জাতীয়তাবাদী। আবার অনেকেই চাকরি ও সুযোগ-সুবিধার জন্যে জাতীয়তাবাদী। দেশের ৬০ ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট দেয়; কিন্তু ৬০ ভাগ ভোটারের নেতারা ঐক্যবদ্ধ নন। এমনকি ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোও বহুধাবিভক্ত। কেন তারা একটি মৌলিক প্রশ্নে এক হতে পারছেন না? এর মানে ইসলামি দলগুলোতে তেমন ত্যাগী পুরুষ নেই।
প্রসঙ্গত আমি নিম্নে বর্ণিত বিষয়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আল-কোরআন মানবজাতির জন্যে একটি জীবন বিধান। রাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধনীতি, পরিবার নীতিসহ সব ক্ষেত্রেই এই বিধান প্রযোজ্য। তাই বলে কি পৃথিবীর সাতশ’ কোটি মানুষ এই বিধান মানে বা গ্রহণ করেছে? না, গ্রহণ করেনি। যারা গ্রহণ করেছেন দাবি করেন, তারাও ষোলয়ানা মানেন না। যেমন আমি বা আমরা বাংলাদেশের পনেরো কোটি মানুষ আল-কোরআন ষোলয়ানা মানি না। আমাদের রাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণে বলে থাকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। কিন্তু আসলে আইনে বা অন্তরে মানে না। প্রচুর স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানুষ ইসলামকে নামাজ-রোজার ভেতরে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। জীবনের বাকি এলাকায় ইসলামকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এসব শিক্ষিত মানুষ মনে করেন ইসলাম মানে নামাজ-রোজা। সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিলাম। বাংলাদেশে অন্যায়-অবিচার সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত সমাজের ভেতর। বিশেষ করে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাদের দখলে, তারা সবচেয়ে বেশি অপরাধ করেন এবং টাকা দিয়ে বিচার কিনে নেন। বাংলাদেশ ইসলামিক দেশ নয়। এখানে ইসলামিক আইন বা শরীয়া প্রযোজ্য নয়। ১৫ কোটি মুসলমানের দেশে বিচারপতি, সেনাপতি, রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী নাস্তিক হলেও আইনগত কোনো বাধা নেই। এমনকি যিনি ধর্মের কিছুই জানেন না, তিনি ধর্মমন্ত্রীও হতে পারেন। রাজনৈতিক কারণে একজন হিন্দু খ্রিস্টান বা বৌদ্ধকে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী করা হয় না। এ ব্যাপারে ধর্মী আর বিধর্মী এক। এটা জনগণকে ধোঁকা দেয়ার একটা কৌশল।
আমাদের রাষ্ট্রে খোদা সার্বভৌম (আল্লাহ হু আকবর) বলা বা মানা নিষিদ্ধ। এখানে ‘মানুষ সার্বভৌম বা মানুষ হু আকবর’ বলতে হবে। এমনকি সংবিধানে বিসমিল্লাহও বলা যাবে না। কারণ এদেশে বা এ রাষ্ট্রে ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। রাষ্ট্রে ধর্মের কোনো প্রভাব থাকবে না। এর মানে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে নামে মুসলমান থাকবেন বা মুসলমান পরিচয়টা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু কেন? সে এক লম্বা ইতিহাস। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করে রাজনীতিতে ইসলাম বা ধর্ম থাকতে পারবে না। ধর্মটা নাকি একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি ঘরে বা মসজিদে বসে আল্লাহ আল্লাহ করুন। রাজনীতি বা রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মেলাবেন না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মুসলমান, আমি বাঙালি। আমি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের মানুষ।’ বঙ্গবন্ধুর এই বাণীকে এখন আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা মানে না। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশকে ওআইসির সদস্য করেছিলেন। আমরা এখনও ওআইসির সদস্য আছি। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে সুবিধাবাদী বা মোনাফেকও বলা যেতে পারে। মুসলমানদের কাছে বলে আমরা মুসলমান, অন্যদের কাছে গেলে বলে, আমরা সেক্যুলার (ধর্মহীন)। ভারত বাংলাদেশকে একটি ধর্মহীন রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায়। অথবা ভারত মুসলমানদের ধর্মকে ঘরের ভেতর আটক করে রাখতে চায়। তাই ভারত বাংলাদেশের ওআইসির সদস্যপদ লাভের বিরোধিতা করেছিল। লাহোরে ওআইসির সম্মেলনে যাওয়ার ব্যাপারে ভারত আপত্তি জানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সে আপত্তি শোনেননি। তখন থেকেই ভারত বঙ্গবন্ধুকে অপছন্দ করা শুরু করেছিল। অনেকেই মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পেছনে ভারতের হাত আছে। এসব কথা অতীতে বহুবার বলেছি। প্রাণের তাগিদেই একই কথা বার বার বলে যাচ্ছি।
গণতন্ত্রের জন্যে সারা জীবন লড়াই করে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু একদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কে বা কারা তাকে এ কুবুদ্ধি দিয়েছিল, তা আজও রহস্যাবৃত। আমিও মনে করি, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একদলীয় রাজনীতির সরকার ব্যবস্থা চালু করার কথা নয়। হয়তো তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার বাহানা থেকেই এ ব্যবস্থা কোনো অদৃশ্য শক্তি চালু করেছিল। একদলীয় সরকার ব্যবস্থার পথে এগোবার পথেই তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর তার দলের লোকেরাই তাকে ফেরাউন বলে অভিহিত করেছেন। তার অতি প্রিয় বন্ধু খোন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। মোশতাক সাহেবও বঙ্গবন্ধুকে সিভিল ডিটেক্টর বলে অভিহিত করেছেন। মোশতাক সাহেব খুবই অল্প সময় ক্ষমতায় টিকতে পেরেছিলেন। এরপরেই মূল ক্ষমতা চলে যায় জেনারেল জিয়ার হাতে। জিয়া সাহেব একশ’ভাগ জাতীয়তাবাদী শাসক ছিলেন। জিয়া সাহেবের আমলেই দেশের বাইরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছিল। জিয়া সাহেব নিজেও জনপ্রিয়তার শিখরে উঠতে পেরেছিলেন। তিনিই আওয়ামী লীগের বাইরে নতুন এক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারা চালু করেছিলেন; যদিও আওয়ামী লীগ ও তার ঘরানার লোকেরা তাকে সামরিক ডিক্টেটর হিসাবে গালমন্দ করে থাকে। জিয়া সাহেবের ইতিবাচক ইমেজকে ধ্বংস করার জন্যে ভারতের পরামর্শ ও সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে কিছুই হয়নি। তার প্রমাণ হচ্ছে জিয়া সাহেবের জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন একজন সমরনেতা কীভাবে রাজনীতিতে সীমাহীন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেন। জিয়া সাহেবই বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ ও ইসলামের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজেকে মুসলমান দাবি করলেও ইসলামি রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। ফলে পূর্ববাংলায় কী হয়েছে তা তিনি সঠিকভাবে জানতে পারেননি। ফলে তখন থেকেই বাংলাদেশকে ঘিরে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। তাজউদ্দিন সাহেব আর শেখ মণি রাজনীতির প্রশ্নে বিপরীতমুখী ছিলেন। দুজনের দ্বন্দ্বের ফলে তাজউদ্দিন সাহেব বেশিদিন মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেননি। এমনকি তাকে পার্টির জেনারেল সেক্রেটারির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তার স্ত্রী জোহরা বেগমও কখনো মন্ত্রী হতে পারেননি। তার ছেলে সোহেল তাজও মন্ত্রী হয়ে টিকতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধে না থাকার ফলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল তা তিনি অনুধাবন করতে পারছিলেন না। তাছাড়া শেখ কামাল ছাড়া তার পরিবারের কেউই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ফলে তথাকথিত সমাজতন্ত্রী নানা গ্রুপ তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এক সময় তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ত্যাগ করে একদলীয় রাজনীতি চালু করেন। বিষয়টি তিনি বুঝে করেছিলেন কি-না, আমার সন্দেহ আছে। তিনি গণতন্ত্র ও ইসলাম থেকে সটকে দূরে পড়ে গেলেন।
বঙ্গবন্ধুর পতনের সময় শেখ হাসিনা বিদেশে ছিলেন। এর ফলে তাকে পাঁচ বছর দিল্লি সরকারের অতিথি থাকতে হয়েছে। এ সময় ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক দর্শন কী হবে, তার শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষাই এখন তার জীবনে মূল আদর্শ ও দর্শন। জীবন দিয়ে হলেও তাকে সেই দর্শন বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই হাসিনাকে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে হবে দিল্লির স্বার্থে।
জিয়া সাহেব বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি বিষয়টি ভালো করে বুঝতেন। আওয়ামী লীগ বা তার অদৃশ্য চালিকাশক্তির মূল দর্শন হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামকে গৃহধর্মে পরিণত করা। মানুষের ভেতর ইসলাম যেন জীবন-দর্শন হিসাবে প্রোথিত না হয়। সে জন্যেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে তথাকথিত নির্বাচনের নামে জাতীয় সংসদের ২৪০ সিট দান করা হয়। এবার হাসিনা নির্বাচন না করেই ৩০০ সিট নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চান। তার বাবা ছিলেন ২৯৩ সিট নিয়ে। তার বাবা ছিলেন বাঙালি মুসলমান। তার এ অবস্থান ছিল খুবই শক্তিশালী। তাই তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে জিয়া সাহেবকেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। দিল্লির মূল দর্শন হলো মহাভারত। প্রতিবেশী সবাইকে মহাভারতীয় দর্শনে বিশ্বাস করতে হবে। ভারতের মৌলবাদীরা বলেন, ভারতে থাকতে হলে জাতীয়তা হতে হবে হিন্দু। তারা প্রচার করেন হিন্দুত্ববাদ। অনেক কট্টরপন্থী ভারতীয় নেতা বলছেন মুসলমানদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তারা তো হিন্দু ছিল, আবার হিন্দুত্ববাদে ফিরে আসতে হবে। ফলে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো ইসলাম, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় সংস্কৃতি। তাই আমাদের চলমান সঙ্কট কিন্তু শুধু নির্বাচনী সঙ্কট নয়। একদল বলছে, আমরা শুধুই বাঙালি, আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির উত্স বাঙালিয়ানা। আরেক দল বলছে, আমরা বাঙালি মুসলমান। আমাদের সংস্কৃতির উত্স ধর্ম ও ভৌগোলিক অবস্থান। এখন প্রশ্ন হলো, ভারত কাকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় দেখতে চায়। ভারত কিন্তু একটি কট্টর ধর্মীয় রাষ্ট্র। কিন্তু বিশ্ববাসীকে বেকুব বানানোর জন্যে কাগজে-কলমে সেক্যুলার সেজেছে। ভারতের এই নীতি অনুসরণ করেন বাংলাদেশের হাজার হাজার বুদ্ধিজীবী। আমাদের তরুণ সমাজও আজ বিভ্রান্ত। এ পন্থার বিরুদ্ধে গেলেই তরুণদের মৌলবাদী ধর্মান্ধ বলে গালাগাল করা হয়।
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ