Home / মুক্তমত / প্রেস ক্লাবের সদস্য নই বলে শুকরিয়া

প্রেস ক্লাবের সদস্য নই বলে শুকরিয়া

তুষার আবদুল্লাহ

শুকরিয়া, আমি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য নই। সদস্য হওয়ার জন্য কোনোদিন আবেদনও করিনি। তাই মানসিক প্রশান্তি প্রেস ক্লাবের গায়ে বিভিন্ন সময়ে যে কলঙ্ক লেপন হয়েছে, তা আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি।আবার নিজেকেই প্রশ্ন করি, সত্যি কি আমাকে স্পর্শ করছে না? সংবাদকর্মী হিসেবে প্রেস ক্লাব তো আমারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ের জায়গা হতে পারত। কিন্তু সাংবাদিকতায় পা রাখার পর থেকে প্রেস ক্লাবে অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজনে যতবার গেছি, কোনোবারই সেখানকার পরিবেশ এবং সদস্যদের আচরণ দেখে ওই ক্লাবের সদস্য হওয়ার ইচ্ছে জাগেনি। প্রেস ক্লাবের সদস্য নন যারা, তাদের প্রতি সদস্যদের আচরণ অমানবিক বলাই ভালো। তারা অসদস্যদের অস্পৃশ্য ভাবেন।এমন আচরণ আমি নিজেও পেয়েছি।

২৯ ডিসেম্বর প্রেস ক্লাবে যে ঘটনাটি ঘটল, তা প্রেস ক্লাবের গায়ে আরো একটি কালো ও লজ্জার আবরণ লেপ্টে দিল। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচির দিন প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে সরকারপন্থী সম্মিলিত মুক্তিযোদ্ধা ফ্রন্টের একটি লাঠি মিছিল যাওয়ার সময় প্রেস ক্লাবের ভেতর থেকে বিএনপিপন্থী সাংবাদিকরা তাদের উদ্দেশ করে হইহই করে ওঠেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়ে যায় সংঘর্ষ। প্রেস ক্লাবের ভেতর থেকে বিএফইউজে বা সাংবাদিক ইউনিয়নের বিএনপিপন্থীরা মাইকে আরো উত্তেজনা ছড়াতে থাকেন। বাইরে থেকে প্রেস ক্লাবের ভেতর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে মিছিলকারীরা। আমরা টেলিভিশনগুলোর লাইভ সম্প্রচারে শুনতে পেলাম, সরকারপন্থীদের মিছিল বা জমায়েত থেকে বিএনপিপন্থী সাংবাদিক নেতার নাম ধরে গালিগালাজ করা হচ্ছে। অর্থাৎ তিনি তার নেতৃত্বে বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের নিয়ে প্রেস ক্লাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ১৮ দলীয় জোটনেত্রীর ডাকা গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ততা। প্রেস ক্লাবকে একটি নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নিয়ে তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ সাইটে দেখছি, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- প্রেস ক্লাব কি কোনো রাজনৈতিক দলের আঞ্চলিক কার্যালয়? প্রশ্নটি আমারও।

আসলে প্রেস ক্লাব ধীরে ধীরে সেই রকমই গড়ন নিয়েছে। প্রেস ক্লাবের ৭৬২ জন সদস্যের মধ্যে স্থায়ী সদস্য ৬৩২। এর মধ্যে ৬০ ভাগ সদস্যই বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। প্রেস ক্লাবে যদি আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক সদস্য থাকতে পারেন, তাহলে বিএনপিপন্থী সাংবাদিকও সদস্য থাকবেন। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। প্রশ্ন তখনই ওঠে, যখন জানতে পারি যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানও প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। আরো জানতে পারি দৈনিক সংগ্রামের প্রায় সব সাংবাদিকই প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ পেয়েছেন। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের, তাই সদস্যপদ তাদের সমমনারই বেশি পান। এখানে সদস্যপদে তা্ই আওয়ামী-বিএনপি-জামায়াত ভারসাম্য আসার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু দুই পক্ষের দিক থেকেই প্রেস ক্লাবকে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে নানাভাবে।

সাংবাদিক ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে এসে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ সাগর-রুনী হত্যার বিচারের দাবিতে দুই পক্ষ রাজপথে একসঙ্গে আন্দোলনে নামে। সেই সময়টাতেই প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থাপন নিয়ে দুই পক্ষ আবার বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের দিকে আলটিমেটাম ছুড়তে থাকে। ২৬ মার্চ সেই প্রতিকৃতি স্থাপনের কথা ছিল, কিন্তু প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটি সদস্যপদ বাতিলের হুমকি দিলে সরকারি দল-সমর্থিত সদস্যরা পিছু হটে। তারা সদস্যপদ রক্ষায় আর বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থাপনের সাহস দেখাননি। অন্যদিকে বর্তমান কমিটি কিন্তু একরকম স্থায়ী মঞ্চ বানিয়ে রেখেছিল প্রেস ক্লাবের অভ্যন্তরে। যেখানে বিএনপি-জামায়াতপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচি চলেছে নিয়মিত।

২৯ ডিসেম্বর বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের দখলে যখন প্রেস ক্লাব, তখন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রেস ক্লাবে গিয়ে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বললেন, “প্রেস ক্লাবকে দলীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা অনৈতিক। যারা এ রকম করে, তারাই প্রেস ক্লাবে হামলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।” তিনি পরে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রেস ক্লাবকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত করতে প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন রাখতে চাই তার প্রতিও-“আপনারা কি প্রেস ক্লাবকে রাজনীতিমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন? আপনি সাংবাদিক ইউনিয়নের যে অংশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা কি প্রেস ক্লাবকে রাজনীতিমুক্ত রেখেছে? যারা কোনো পন্থী হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করতে চান না, তাদের প্রেস ক্লাবে সদস্যপদ দিতে এগিয়ে এসেছেন? এই প্রশ্নটি ইকবাল সোবহান চৌধুরী বরাবর করছি ঠিকই, কিন্তু একই প্রশ্ন সব সাংবাদিক নেতার কাছেই। তাদের বেকার হয়ে যাওয়া সংবাদকর্মীদের জন্য চাকরি জোগাড় করে দেয়ার নিদর্শন দেখিনি। একুশে, সিএসবি, যমুনা, চ্যানেল ওয়ান বন্ধ হওয়ার পর তাদের কতটা পাশে পেয়েছি আমরা? আর প্রেস ক্লাবের সদস্য নন বা কোনো পন্থী নন, এমন সাংবাদিকরা প্রেস কনফারেন্স এলাকার বাইরে গিয়ে কি স্বস্তিতে একটু বসার সুযোগ পেয়েছেন?

প্রেস ক্লাবের সদস্যদের বনেদি আচরণের প্রণোদনাতে রিপোর্টার্স ইউনিটির জন্ম। এটা সবার জানা। প্রেস ক্লাবের মান্যবর সদস্যরা কেবল এইটুকুর জন্যই ধন্যবাদ পেতে পারেন। আর বাকি সবকিছুর জন্যই…। কোনো বিশেষণ অপচয় করতে ইচ্ছে হলো না।

তুষার আবদুল্লাহ: হেড অব নিউজ, সময় টেলিভিশন

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ