Home / মুক্তমত / কেন খুন হলেন আফতাব আহমেদ?
কেন খুন হলেন আফতাব আহমেদ?

কেন খুন হলেন আফতাব আহমেদ?

কেন খুন হলেন আফতাব আহমেদ?
আনিস রায়হান

আমি নিজেও জানি না, কেন প্রবীণ আলোকচিত্রী আফতাব আহমেদ খুন হলেন! তিনি মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রীদের একজন। পরবর্তীতে জামায়াতের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়েছিল। শেখ মুজিবের আমলে বাসন্তীর জাল পরা সেই বিখ্যাত ছবিটি তার তোলা। যার কারণে মুজিব নিহত হয়েছিলেন বলেও অনেকে মনে করেন। সেই আফতাব আহমদ আজ কার হাতে কেন মারা গেলেন, এটা বিরাট প্রশ্ন! হতে পারে তিনি জামাতের অনেক গোপন তথ্য জানতেন। নতুবা এমনও হতে পারে, জামাতি কানেকশনের জন্য বিরোধী কোনো পক্ষ তাকে খুন করে থাকতে পারে। ঘটনা যাই হোক, এটা যে, সাদামাটা কিছু না, তা আমি নিশ্চিত। আরেক প্রবীণ আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদারের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল আমার। মুক্তিযুদ্ধের সব আলোকচিত্রীদের নিয়ে একটা বড় কাজ করেছিলাম ২০১১ সালে। তখন প্রায় সব বড় আলোকচিত্রীর সঙ্গেই দেখা করেছিলাম, কথা বলেছিলাম। রশীদ তালুকদার সেদিন আফতাব আহমদ সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আফতাব আহমদকে মোটেই পছন্দ করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের আলোকচিত্রী মহল আফতাব আহমেদকে নিজামীর হাত থেকে পদক নেয়া ও জামাতি কানেকশনের জন্য ঘৃণাই করতেন। সুতরাং আফতাব আহমদের খুন হওয়াটা আমার কাছে কোনো সাধারণ ঘটনা মনে হয় না।

basonti

ঘটনা যাই হোক, তার খোঁজ পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনী বের করবে। আমি এখানে আফতাব আহমদের বিস্তারিত পরিচয় তুলে ধরছি। তার সম্পর্কে জানা থাকা দরকার। তার সম্পর্কে আমার মন্তব্য একটাই, তিনি ছিলেন রাজাকার বনে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা। বন্দুক হাতে হয়তো যুদ্ধ করেননি। তবে একাত্তরে যে মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়েছিলেন, ছুটে বেড়িয়েছেন রণাঙ্গনে, তিনি তাদের একজন। ক্যামেরাই ছিল আলোকচিত্রীদের বন্দুক।
আফতাব আহমদ ১৯৩৫ সালে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানার মহিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। মাইনর স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ১৯৪৮ সালে তিনি রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাশ করেন। সে বছরই আইএ তে ভর্তি হন। কিন্তু আর্থিক অসুবিধার কারণে কলেজ জীবন শেষ হবার আগেই তাকে কাজ খুঁজতে হয়। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরি করার পর অবশেষে ১৯৬২ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দেন। একাত্তর সম্পর্কিত আফতাব আহমদের তোলা অনেক ছবি ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল। ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ছাড়াও ’৭৫-এর আগস্টে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড, ৭ নবেম্বরে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহু অমূল্য ছবি তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

সংক্ষেপে এটুকু বলেই শেষ করে দেয়া যেত তার পরিচয়। কিন্তু ’৭১-এর পর এমন কিছু ঘটনার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে গেছে যে চাইলেও কেউ তাকে পিছিয়ে রাখতে পারবেন না। ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ সূচিত হয় তারই একটি ছবির জের ধরে। অনেকে ছবিটির নাম দিয়েছেন জাল-বসনা বাসন্তী। ছবিটিতে দেখানো হয় বাসন্তী ও দুর্গতি নামের দুই যুবতী মেয়েকে। অভাবের জন্য যারা সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারছিল না। ছবিতে বাসন্তীর পরনে ছিল একটি মাছ ধরার জাল।
জাল বসনা বাসন্তীর এই ছবি ’৭৪-এ ক্ষমতাসীন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বঙ্গবন্ধু সরকারের পতনকে ত্বরান্বীত করে। দেশের আনাচে কানাচে দুর্ভিক্ষের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পেছনেও এই ছবিটির অবদান আছে বলে অনেকে মনে করেন। ছবিটি ছাপা হওয়ার কিছুকালের মধ্যেই বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য। জানা যায়, ছবিটি ছিল একটি সাজানো নাটক। পরবর্তীতে পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বলেন, ‘ওই ছবিটি প্রকাশের আগে থেকেই দেশের তৎকালীন অবস্থা নিয়ে জনগণ বিচলিত ছিলেন। দুর্ভিক্ষসৃষ্ট পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বঙ্গবন্ধু সরকার তখন প্রানপণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। এরকম একটা সময়ে বাসন্তীর ছবিটি ছাপা হয়। এবং ছবিটি জনমনে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মানুষের ভাবনা ছিল, এত কষ্ট করে দেশ স্বাধীন হল। অথচ স্বাধীন দেশে একটি যুবতী মেয়ের পরার মতো কাপড় নেই। এমনটা কেন হবে। পরবর্তীতে জানা যায় ছবিটি সাজানো ছিল। এবং এ থেকে মানুষ আসল সত্য জানতে পারে। একটা সরকারের বিরোধধি পক্ষ থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে ওই আলোকচিত্রী যে কাজটি করেছিলেন তা সাংবাদিকতার কোনো নীতিমালার মধ্যে পড়ে না। এটা অন্যায়।’

71 oic by aftab

৯৬ সালের ৫ অক্টোবর দৈনিক খবর-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘চিলমারির বন্দর থেকে কয়েকশ গজ দূরে বেশকিছু কুঁড়ে ঘর। এখানেই বাসন্তীদের আবাস। জেলেপাড়ায় ঢুকতেই একটি মনোহারি দোকান। দোকানের মালিক ধীরেন বাবুর সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, ‘৭৪-এর অনেক কথা। যেদিন বাসন্তীদের ছবি তোলা হয়, সেদিনও তার পরনে কাপড় ছিল। কিন্তু ছেঁড়া জাল পড়িয়ে কৌশলে তাদের ছবি তোলা হয়। এটা এক ধরনের চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয় বলে মনে করেন অনেকেই। বাসন্তীর কাকাত ভাই মনিন্ত্রনাথ দাস মাছের ব্যবসা ছেড়ে এখন বেকারির ব্যবসা করেন। তিনি বললেন, ‘৭৪-এর ছবি তোলার ঘটনা সেভাবে স্মরণ নেই।’ তবে পাশের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ছবি তোলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেই ছবি তোলার প্রত্যক্ষদর্শী হলেন, রাজো বালা। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন। প্রকৃতদৃশ্য বর্ণনা করতে চান না। এখনো ভয় পান। তার মতে, এসব বললে ক্ষতি হতে পারে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে বলে আর লাভ কি। পরে অনেক আলাপ-আলোচনার পর রাজো বালা বর্ণনা করেন সেই দৃশ্য। ছলছল চোখে আনমনা হয়ে কথা বলেন তিনি। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, ৭৪-এ যখন বাসন্তী-দুর্গতিদের ছবি তোলা হয়, তখন ছিল বর্ষাকাল। চারদিকে পানি আর পানি। এমনকি প্রেক্ষাপটে বেলা ১১টার দিকে তিনজন লোক আসেন বাসন্তীদের বাড়িতে। এদের মধ্যে একজন ছিল তৎকালীন স্থানীয় রিলিফ চেয়ারম্যান তার নাম আনছার। অপর দুজনকে রাজো বালা চিনতে পারেনি।
বাসন্তী-দুর্গতিদেরকে একটি কলা গাছের ভেলায় করে বাড়ি থেকে বের করা হয়। আর অন্য একটি ভেলায় রেখে তাদের ছবি নেয়া হয়। এ সময় পাশের একটি পাট ক্ষেতে ছিলেন রাজো বালা। ছবি তোলার আগে আগন্তকরা বাসন্তীদের মুখে কাঁচা পাটের ডগা দিয়ে বলে এগুলো খেতে থাকো। এর বেশি আর কিছু জানাতে পারেননি রাজো বালা।
বাসন্তীর কাকা বুদুরাম দাসের কাছে সেই ছবি তোলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কাচুমাচু করেন। এক পর্যায়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করেন সেই ছবি তোলার নেপথ্য কাহিনী। শেষ পর্যায়ে তিনি ঐ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং প্রতিকার চান।’
একই সালের ১২ অক্টোবর দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘বাসন্তী জন্ম অবধি বোবা তাই বাসন্তীর কাছে সেই কাহিনী জানা যায়নি। তবে সে ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী বাসন্তীর কাকা বুদুরাম দাশ (৮০) তার স্মৃতির পাতা হাতড়িয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকায় বসে জানালো সেদিনের কাহিনী। দিন-তারিখ মনে নেই; একদিন বুদুরাম, বাসন্তী ও তার পরিবারের কয়েকজন মিলে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের ওপর বসেছিল। এমন সময় দুপুর বেলা ইউপি চেয়ারম্যান আনসার আলি বেপারি কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ একজন সাংবাদিক নিয়ে আসে এবং বাসন্তীর ছবি তুলতে চায়। এ সময় তারা বাঁধের ওপর মাঝিদের রোদে শুকোতে দেয়া জাল তুলে এনে তা বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ির ওপর পরিয়ে ছবি তোলে।
এভাবে ছবি তুলতে বুদুরাম নিষেধ করেছিল। তবুও তারা শোনেননি। এ প্রসঙ্গে বুদুরাম দাশ তার ভাষায় জানায়, ‘চেয়ারম্যান সাব ছেঁড়া ইউক আর ফারা ইউক একনাতো শাড়ি আছে উয়ার উপরত ফির জালখান ক্যা পরান, ইয়ার মানে কি? তখন সাইবদের মদ্যে একজন কয় ইয়ার পরত আরো কত কিছু হইবে….’ (চেয়ারম্যান সাহেব। ছেঁড়া হোক একখানতো শাড়ি আছে, তার ওপর জাল কেন পরান; এর কারণ কি? তখন একজন সাহেব জানায় এরপর আরো অনেক কিছু হবে…..)।
তবে সেই ছবি তোলার সঙ্গে চেয়ারম্যান আনসার আলি বেপারি ছাড়া আর যারা ছিল বুদুরাম দাশ তাদের চেনে না। বাসন্তী তখন কিশোরী। একই সঙ্গে দুর্গতি নামে অপর এক প্রতিবেশী কিশোরীর জীর্ণ বস্ত্র শীর্ণ দেহের একটি ছবিও তোলা হয়েছিল। সেই ছবি ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের ট্রাজেডি হিসেবে দেশে-বিদেশে কাঁপন জাগিয়েছিল। শোনা গেছে দুর্গতি পরিবার-পরিজনসহ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে চলে গেছে সেই থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।’
এখানেই শেষ নয়। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে আফতাব আহমদের নিজ কর্মস্থল ইত্তেফাক বাদে প্রায় সব দৈনিক কাগজেই। দৈনিক ইত্তেফাক-এ এরপর ৯৮ সালের ৪ঠা জুন ‘ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমদের বক্তব্য’ শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপা হয়। সংবাদটিতে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের একযুগ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের উপর তোলা বাসন্তীর মর্মস্পর্শী ছবির জন্য তাহাকে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করিয়াছেন। …এই সংবাদচিত্রটির জন্য বেগম খালেদা জিয়া একজন ফটো সাংবাদিককে পুরস্কৃত করার যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়াছেন সেইজন্য তিনি তাহার নিকট কৃতজ্ঞ।’
লক্ষণীয় যে, বেগম জিয়া আফতাব আহমদকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন তখনই যখন প্রমাণ হয়ে গেছে যে বাসন্তীর ছবিটি ছিল সাজানো। আর সেই বাসন্তীর সাজানো ছবির জন্যই বেগম জিয়া তাকে পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেন। এজন্য আফতাব আহমদ কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণের চি‎হ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সব মিলিয়ে আফতাব আহমদের আলোকচিত্রের বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কিন্তু আফতাব আহমদ এ সব কিছুর চাইতেও বড় একটি কাজ করেন ২০০৬ সালে। এ বছর তিনি আলোকচিত্রে অবদান রাখার জন্য ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। অনেকের অভিযোগ বাসন্তীর ভুয়া ছবি তোলার জন্য বেগম জিয়া আগে তাকে পুরস্কৃত করার কথা বললেও তা তিনি করতে পারেননি। কারণ তখন তিনি ছিলেন বিরোধী দলে। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে তিনি আফতাব আহমদকে ভুলে যাননি। এ ধরনের সকল অভিযোগ এবং পূর্বোক্ত সব প্রতিবেদনের দাবী যদি অগ্রাহ্যও করা হয় তবুও আফতাব আহমদকে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রী হিসেবে মূল্যায়ন করা যায় না। কারণ একটাই। একুশে পদক পাবার পর তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। ২০০৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তিনি ছুটে যান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারি রাজাকারদের কাছে। ছাত্রশিবির আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে চিহ্নিত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর হাত থেকে তিনি গ্রহণ করেন পদক। এরপর আর কোনোভাবে তাকে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা বলে কেউ দাবি করতে পারে কিনা তা আজ অবান্তর প্রশ্ন। কেন তিনি খুন হলেন, এর মধ্যেই হয়তো জড়িয়ে আছে এসব প্রশ্নের উত্তর।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ