Home / মুক্তমত / আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল: আরিফ জেবতিক

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল: আরিফ জেবতিক

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল

আরিফ জেবতিক

প্রথমেই মনে হলো, সিনেমায় আমাদেরকে ভুল জিনিস শেখানো হয়। সাধারণত সিনেমায় দেখায় চৌধুরী সাহেব দুই হাত দিয়ে বুকের বামপাশ ধরে ওঁ ওঁ করে কোঁকাতে থাকেন, তারপর চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকেন-আমরা বুঝে নেই যে হার্ট এটাক করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এমনটা হলো না। ঘটনাটা খুব দ্রুতই ঘটে গেল। আমি গেটের ভেতরে ঢুকেছি আর বউ তখনও সিকিউরিটির লোকজনকে হ্যান্ডব্যাগ খুলে দেখাচ্ছে..আমার কাছে মনে হলো হঠাৎই সারা বুক জুড়ে হালকা একটা ব্যাথা ছড়িয়ে পড়ছে। তার চাইতেও বড় সমস্যা হচ্ছে খুব দুর্বল লাগছে, শরীরের মাসলগুলোতে ঠিক জোর পাচ্ছি না। এদিকটায় ভিড় পাতলা, লোকজন নাই বললেই চলে, সবাই মাঠের মাঝখানে।আমি আস্তে করে পাশের গ্যালারিতে বসে পড়লাম। এর পরেপরেই বউ ঢুকল, ‘তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’ আমি বললাম, ‘প্যানিক হয়ো না। ড্রাইভারকে ফোন করে ফিরে আসতে বলো, বাসায় চলে যাব।’ সময়মতো সবকিছু গণ্ডগোল লেগে যায়, দেখা গেল ড্রাইভারের ফোন ব্যস্ত।

এর মধ্যে আমার দরদর করে ঘাম বের হতে থাকল। বউয়ের গলার স্বর শুনে মনে হল এবার সে সত্যিই ভয় পেয়েছে। আমার ফোন এগিয়ে দিলাম, বললাম এখানে এ্যাপোলোর ইমার্জেন্সি নাম্বার সেভ করা আছে, ফোন করে এম্বুলেন্স আসতে বলো। এ্যাপোলোর ০১৯১১৫৫৫৫৫৫ নাম্বারে ফোন করা হলো, ওপাশ থেকে কেউ একজন জানালো এম্বুলেন্সের জন্য অন্য আরেকটি নাম্বারে ফোন করতে হবে। আমি শুনতে পেলাম আমার বউয়ের আঁকুতি, ‘ভাই, আমি আরেকটি নাম্বার লেখার অবস্থায় নেই, আপনি কি লাইনটা ট্রান্সফার করে দেবেন?’ সম্ভবত ভদ্রলোক রাজি হলেন না। বউ এখন এম্বুলেন্সের নতুন নাম্বার টুকতে থাকল।

টুকতে টুকতেই সে বলল, ‘মাঠে নিশ্চয়ই হেলথ সার্ভিস আছে। আমি ওদেরকে ডেকে নিয়ে আসি।’ এসব মেলায় সাধারণত কর্পোরেট স্বাস্থ্য বুথ থাকে। সে দৌঁড়ে চলে গেল ওদেরকে ডাকতে।

এদিকে আমার শরীর বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেভাবে ঘাম বের হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে যেন শাওয়ারের নিচে গোসল করছি। আমি ধীরে ধীরে সোজা হয়ে গ্যালারিতে শুয়ে পড়লাম। সময় কতক্ষণ আছে বুঝা যাচ্ছে না। মোবাইলে ফেসবুক অন করাই ছিল, একটা স্ট্যাটাস দিলাম, ‘কেউ ১৬ নম্বর গেটের পাশে থাকলে জলদি আসুন, জরুরি।’ যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে বউ একা এখানে কী করবে! পরিচিত কেউ পাশে থাকলে তখন অনেক বড় উপকার হবে।

এবার কলমা পড়লাম। আমার মা সবসময় একটা কথা বলেন, মৃত্যুর সময় নাকি আজরাইলকে কাছে দেখলেই শয়তানও কাছে চলে আসে। শয়তান তখন উল্টাপাল্টা করতে থাকে যাতে শেষ সময়ে কলমা পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। একমাত্র যাঁদের ঈমান খুব শক্ত তাঁরা অনায়াসে কলমা পড়তে পারে, তওবা করতে পারে-অন্যরা পারে না। দেখা গেল অনায়াসেই কলমা পড়তে পারছি। এটা দুইদিক দিয়ে সুখবর। প্রথমটি হচ্ছে এর মানে আশেপাশে শয়তান কোনো যন্ত্রনা করছে না, এর কারণ সম্ভবত মৃত্যুর মুহুর্ত এখনও উপস্থিত হয়নি। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, ঈমান ঠিকই আছে, আমার দাদী ছোটবেলা সুরা ইয়াসিন পড়ে আমাদের মাথায় ফু দিয়ে বলতেন, ‘ঈমান আর ইজ্জতের সঙ্গে মউত দিও’-সম্ভবত সেই দোয়া কবুল হয়ে গেছে। সো উইন উইন সিচুয়েশন।

আমি সেভাবে শুয়ে শুয়েই অপেক্ষা করতে থাকলাম। অনেকগুলো অপেক্ষা। হয়তো মৃত্যু, হয়তো এম্বুলেন্স, হয়তো পরিচিত কেউ এসে মুখের উপর উঁকি দেবে, হয়তো বউ ফিরে আসবে।

(আমি পরে জেনেছি মাঠে থাকা হেলথ ক্যাম্পের লোকজন আমার স্ত্রীকে বলেছেন আমাকে যেন ধরে ধরে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা এসে আমাকে দেখতে পারবেন না। আমার স্ত্রী যখন খুব কাকুতি মিনতি করে বলেছে যে আমাকে একা ধরে ক্যাম্পে নেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় এবং সম্ভবত আমার বড় হার্ট এটাক হয়েছে-তখন ক্যাম্প থেকে তাঁর কাকুতি মিনতিতে বিরক্ত হয়েই সম্ভবত বলেছে, আপনি যান, আমরা ১৬ নম্বর গেটের কাছে আসতেছি।…এই লোকগুলো কখনোই আসে নি, অন্তত আমি ওখানে আরো যে কুড়ি মিনিট ছিলাম, ততক্ষণ আসে নি। আমার বউ বোকার মতো আশা করে ওদিকে চেয়ে বসে ছিল। আমি ঠিক করেছি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পরে আমি ঐ লোকদেরকে খুঁজে বের করব, তাদের সঙ্গে কিছু আলাপ করব এবং সেগুলো ফেসবুকে পোস্ট করব।)

ইতিমধ্যে বউ চারপাশে অনেককেই ফোন করা শুরু করেছে। প্রথমেই ফোন করেছে ইমরান এইচ সরকারকে। ইমরানের পরামর্শই ছিল সবচাইতে কাজের। সে বলল,’ ভাবি, আপনি এম্বুলেন্সের জন্যও অপেক্ষা করার দরকার নাই। এভরি সেকেন্ড ম্যাটারস। যে গাড়ি পান সেটায় উঠে পড়ুন। সবচাইতে কাছে পড়বে ইউনাইটেড, সেখানে রওনা হোন, আমরা আসছি।’

এরমাঝে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখে তন্ময় এসেছে গেটের পাশে। সে আর আমার স্ত্রী আমাকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলল। এর মাঝেই ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে ফোন করে অবস্থান জানতে চাইল আমাদের। জানাল ডাক্তার মোমিনুজ্জামান বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ফেরত আসছেন। ইমার্জেন্সিতে সব প্রস্তুতি নিয়ে হৃদয়বান ডাক্তার আর চিকিৎসাকর্মীরা অপেক্ষায় আছেন।

অবরোধের ফাঁকা রাস্তাঘাট।

শো শো করে গাড়ি চলতে থাকল ইউনাইটেড হাসপাতালের পথে…।

পরিশিষ্ট: বাকিটুকু মোটামুটি সবাই জানেন। হৃদয়ে দুইটি রিং পরানো হয়েছে।

প্রথম ধাক্কা শেষ হওয়ার পরে আবারও কয়েকটি পরানো হতে পারে বলে ডাক্তার জানিয়েছেন। বিয়ের রিং থেকে হার্টের রিংয়ের দাম অনেক বেশি, এটা দেখে আমি চমৎকৃত। ডাক্তারের পরামর্শে এখন পরিপূর্ণ বিশ্রাম। ফেসবুকের পাসওয়ার্ডটি আপাতত ফেরত পেয়েছি। এই কয়দিন ফেসবুক আবার পরিবারের লোকজনের হাতে ছিল, তারা গণহারে লোকজন ব্লক মেরে বসে আছে।

ফোনে কথা বলা নিষেধ। দর্শনার্থীর বেলাও একই নিষেধাজ্ঞা। স্টার কাবাবে পায়া দিয়া রুমালি রুটি খাওয়াটাও মনে হয়ে মাসখানেক বন্ধ রাখতে হবে।-সব যন্ত্রনাই হজম করে যাচ্ছি।

এই দুঃসময়ে যারা আমার আর আমার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, দূর থেকে প্রার্থনা করেছেন, হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার পরিবারের সদস্যদেরকে শক্তি আর সাহস যুগিয়েছেন-তাঁদের সেই মমতা শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। শুধু নতজানু হয়ে ঋণ স্বীকার করি। দেশের বাইরে থেকে যেসব বন্ধুরা নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন, আর্থিক সহায়তা অফার করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা। ইউনাইটেড হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসকবৃন্দ আর অন্যান্য কর্মীদের প্রতি আলাদা করে কৃতজ্ঞতা।

আরিফ জেবতিক: লেখক, ব্লগার ও সাংবাদিক।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ