Home / জাতীয় / ‘রাজনীতি অধিক লাভজনক ব্যবসা’
‘রাজনীতি অধিক লাভজনক ব্যবসা’

‘রাজনীতি অধিক লাভজনক ব্যবসা’

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া হলফনামায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তা জনমনে বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, বিগত পাঁচ বছরে একেকজন জনপ্রতিনিধি কিভাবে পাহাড়সম সম্পদের মালিক হয়ে উঠতে পারলেন। এ বিষয়টি এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি।

জনপ্রতিনিধিরা জনকল্যাণে রাজনীতি করেন বলে গলা উঁচিয়ে দাবি করে আসছেন। কিন্তু জনগণের টাকা তারা দেশের কল্যাণে ব্যয় না করে আত্মকল্যাণে নিয়োগ করেন। এ অভিমত বিশিষ্টজনদের।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র(টিআইবি)নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্পদের বিবরণীর প্রকাশের এই বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ইতিবাচক এই অর্থে যে, এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় একটি জবাবদিহিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুযোগটি ফলপ্রসূ হবে তখনই, যখন সম্পদ আহরণের উৎস, বৈধ ও ঘোষিত আয়ের উৎস সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ হবে।আর যদি সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ না হয় তাহলেও একে আইনগত বিচারের আওতায় আনা গেলে তা সুফলই বয়ে আনবে।

তবে তা করতে হলে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে(এনবিআর)যথাযথ ভুমিকা পালন করতে হবে পেশাদারিত্বের সাথে এবং সব ধরনের প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, জনপ্রতিনিধির পালনীয় ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পদকে ব্যবহার করার নগ্ন দৃষ্টান্ত যে গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়, তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে যারা আসীন হন তাদের বুঝতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে, ভোটাররা এসব অন্যায়-অনিয়ম করার জন্য তাদের ভোট দেয় না। বরং জনগণের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই জনগণ তাদের নির্বাচিত করে।

‘এদেশে সকল দলই যে, জনকল্যাণ নয় বরং কেবল ক্ষমতার জন্যই রাজনীতি করে এটা আবার প্রমানিত হলো’ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আজ আমরা যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেটাও এই ক্ষমতা এবং সম্পদের জন্যই।

ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্যে অঢেল সম্পদের বিবরণী নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণীর তথ্যে দেখা যায়, আগেরবার করা নির্বাচনের চেয়ে এবার যে পরিমাণ সম্পদ তাদের হয়েছে, সেটা আগের চেয়ে একশ গুণ কিংবা কোথাও কোথাও আরো বেশিগুণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে হয় আমাদের দেশে যে কোনো ব্যবসার চেয়ে রাজনীতি অধিক লাভজনক এবং এ কারণেই রাজনীতিতে অধিক হারে মনোনিবেশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন অনেক রাজনীতিক আছেন যাদের পেশা রাজনীতি এবং তারা কোনো ধরনের ব্যবসার সঙ্গেই সম্পৃক্ত নন।অথচ তাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা কি করে সম্ভব?

‘জবাবদিহিতা না থাকলেই জনপ্রতিনিধিরা এভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে পারেন’—এ অভিমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুদক, এনবিআর এবং দেশের প্রচলিত আইন কোনোটিই এভাবে রাতারাতি সম্পদবৃদ্ধিকে অনুমোদন করে না। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ক্ষমতাসীনদের কাছে দুদক, এনবিআর ও প্রচলিত আইন সব কিছুই অসহায়।

ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সম্পর্ককে ‘জাদুর কাঠির ছোঁয়া’ বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠি যুক্ত আছে। তাই তারা (জনপ্রতিনিধিরা)ক্ষমতাকে ব্যবহার করেন দুইভাবে। প্রথমত, ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধাসহ বিভিন্ন রকম সুবিধা নেন, অপরদিকে সরকারি সম্পদ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থেকে তারা রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

তিনি বলেন, তাদের অনুসৃত রাজনীতি ও ক্ষমতা জনকল্যাণের পরিবর্তে কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণেই লাগছে। জনপ্রতিনিধিরা রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসা করে তুলেছেন। আর এর ফলে রাজনীতিকরা নির্বাচনকে স্রেফ ‘টাকার খেলা’য় পরিণত করেছেন।

বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে তারা নির্বাচন করেন এবং ক্ষমতার দাবিদার হন। হলফনামায় তারা যে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন তা তাদের ক্ষমতা অপব্যবহারের বদৌলতেই হয়েছে। অর্থাৎ তারা তাদের ক্ষমতার জন্যই বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের গণতন্ত্র হলো ধনাঢ্যের দ্বারা, ধনাঢ্যের জন্য এবং ধনাঢ্যের শাসন। আর এর ফলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনকল্যাণমুখি না হয়ে হয়ে উঠেছে জনস্বার্থবিরোধী।

প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণী নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও। সেইসাথে ঘরে বাইরে আলোচনায়-আড্ডায় সর্বত্রই এ নিয়ে কথা বলছে মানুষ।

ব্লগার সুফী ফারুক ইবনে আবু বকর ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আয়কর বিবরণীর তথ্যগুলো খুবই হাস্যকর। কেউ কেউ বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ৩/৫ লাখ টাকা! অথচ একজন জনপ্রতিনিধির একটা ডিসেন্ট গাড়ি তেলসহ মেইনটেইন করতে বৎসরে ৩ লক্ষ্ টাকার বেশি লাগে। প্রাসাদের মতো বাড়ির দাম ২৫ লাখ টাকা।

এর মানে হলো, তাদের প্রকৃত সম্পদের ১০ ভাগের একভাগও আসেনি এই বিবরণীতে। অথচ সেই সম্পদ বিবরণী প্রকাশ নিয়েও তাদের আপত্তি।

‘লজ্জার শেষ সীমা পার হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা অনিয়ম-দুর্নীতি করবে; আবার সেই সংবাদের একশ’ ভাগের একভাগ প্রকাশ করা হলে তা নিয়ে তারা গলাবাজিও করবে!

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ