Home / জাতীয় / দুঃসহ স্মৃতির ১৪ ডিসেম্বর

দুঃসহ স্মৃতির ১৪ ডিসেম্বর

বীভত্স ছিল হত্যাযজ্ঞ। স্বজনরা যখন খোঁজ পেল হারানো স্বজনের, বুকে টেনে নিথর দেহ, ভয়ে শিউরে ওঠে শরীর। দেহজুড়ে আঘাতের চিহ্ন। কারও চোখ, হাত-পা বাঁধা। কারও শরীরে একাধিক গুলি। অনেককে হত্যা করা হয়েছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে, কুপিয়ে। থেঁতলানো ছিল মাথা। কারও চোখ উপড়ানো, কারও শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। নির্যাতনের বীভত্সতা চিনতে দেয়নি অনেক প্রিয়জনের মৃতদেহ। আর যারা ফিরে
আসেননি, স্বজনের কান্নাচোখ এখনও খুঁজে ফেরে প্রিয় স্বজনকে।
দুঃসহ স্মৃতির ১৪ ডিসেম্বর আজ। একাত্তরে দেশের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের মর্মস্তুদ দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’দিন আগে, একাত্তরের এই দিনেই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রসংঘের এদেশীয় দোসররা মেতে ওঠে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পাশবিক হত্যাযজ্ঞে। তালিকা ধরে ধরে, ঘর থেকে টেনে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে হত্যা করা হয় বরেণ্য শিক্ষক, গবেষক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের। মেতে উঠেছিল জাতিকে মেধাশূন্য করার এক পাশবিক খেলায়।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আজ দিবসটি এসেছে অন্য এক বিজয়ের ইতিহাস রচে। শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার। আলবদর কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল ঘাতক চৌধুরী মুঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কিন্তু দেশের বাইরে পলাতক সেই দুই ঘাতককে এখনও ফিরিয়ে আনা যায়নি। বিচার বন্ধে তাণ্ডব চালাচ্ছে জামায়াত ও শিবির। চলছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গভীর ষড়যন্ত্র। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তারা। নেওয়া হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠানামালা। শহীদ পরিবারসহ সর্বস্তরের মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার : জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় প্রথম বুদ্ধিজীবী হত্যার মামলা করা হয় (মামলা নং-১৫)। আলবদর বাহিনীর চৌধুরী মুঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানকে আসামি করে মামলাটি করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিনের বোন ফরিদাবানু। মামলাটি সিআইডিতে পাঠানোর পর তদন্তের দায়িত্ব পড়ে সিআইডির তত্কালীন সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমানের ওপর (বর্তমানে অবসরে)। তদন্ত চলাকালে এই কর্মকর্তা ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যুদ্ধাপরাধ আইনে মামলা করার অনুমতি চান। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মীয়-স্বজনদের ৪০ জনের সাক্ষ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক আইনে মামলাটি নতুন করে দায়েরের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। সে অনুযায়ী ২০০২ সালে রমনা থানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা পাঠায়। ওই প্রস্তাবনায় বলা হয়, কলাবরেটর অ্যাক্ট বাতিল হয়ে যাওয়ায় প্রচলিত আইনে বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পরে ২০১০ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারে বুদ্ধিজীবী হত্যার মামলাটিও একীভূত করা হয়। সে অনুযায়ী শুরু হয় বিচার কাজ। এ বছরের ৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ চৌধুরী মুঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান দু’জনকেই ফাঁসির আদেশ দেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়, প্রমাণিত ১১টি অভিযোগের সবগুলোতেই ফাঁসির আদেশ দেওয়া হল। আসামিরা পলাতক থাকায় তারা গ্রেফতার হওয়া বা আত্মসমর্পণ করার পর এ রায় কার্যকর করা হবে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড না দিলে এটি হবে বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
ফিরিয়ে আনতে বাধা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চৌধুরী মুঈনুদ্দিন বর্তমানে ইংল্যান্ডের বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল রোডে বাস করছেন। আর আশরাফুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বলেন, রায়ে ডিএমপি কমিশনারকে আসামি দু’জনকে বন্দি করে ফিরিয়ে আনতে বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে রায় প্রকাশের পর থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, রায় অনুযায়ী পুলিশ উদ্যোগী হয়েছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্যসব আসামির মতোই ইন্টারপোলকে রিকিউজিশন দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার ও অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আহসান বলেন, সাজাপ্রাপ্ত দু’জনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে। তবে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা ছাড়া ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাননি পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (ইন্টারপোল) মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া।
কত বুদ্ধিজীবী হত্যা : বুদ্ধিজীবী হত্যার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সঙ্কলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘নিউজ উইক’-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৭০ জন। এর মধ্যে ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিত্সক, ৪২ আইনজীবী ও ১৬ শিল্পী-সাহিত্যিক প্রকৌশলী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে গঠিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনী। সে হত্যাযজ্ঞে চৌধুরী মুঈনুদ্দিন ছিলেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও ‘অপারেশন ইনচার্জ’ আর আশরাফুজ্জামান খান ‘চিফ এক্সিটিউটিভ’। মাত্র ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ দু’জনের তত্ত্বাবধানেই হত্যা করা হয় ১৮ বুদ্ধিজীবীকে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ