Home / জাতীয় / শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরনে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের মর্মন্তুদ যন্ত্রণার দিন। একাত্তরের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যখন শেষ প্রান্তে, বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে যখন সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি, আনুষ্ঠানিক ঘোষনা যখন বাকী- তখনই দেশকে মেধাশূন্য করার পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়। পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ যখন অনিবার্য, তখনই এদেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞে। কেননা তারা বুঝতে পেরেছিল পরাজয় তাদের অনিবার্য। তাই বিজয়ে আনন্দ যখন দ্বানপ্রান্তে তখন সে আনন্দে বিষাদের কালো ছায়া ফেলে। ঢাকার রায়েরবাজার এবং মিরপুরে কয়েকশ’ শিক্ষাবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকের পিছনে হাত বাঁধা মৃতদেহ আবিষ্কারের মর্মন্তুদ ঘটনা। গোটা জাতিসহ সারাবিশ্ব হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এ মর্মস্পর্শী হত্যাকান্ডে। একে একে আবিষ্কৃত হতে থাকে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বড় বড় শহর-বন্দরে একই ধরনের হত্যাকান্ডের খবর। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হলেও ঢাকায় ১০ ডিসেম্বর থেকেই সমাজের প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বদের আলবদর বাহিনী ঘরবাড়িতে হানা দিয়ে ধরপাকড় শুরু করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেতে থাকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’দিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে দেশের শ্যেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়। ঘাতকচক্র কেবল ঢাকা শহরেই প্রায় দেড়শ’ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশার কৃতী মানুষকে অপহরণ করে চোখ বেঁধে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে। সান্ধ্য আইনের মধ্যে রাতের আঁধারে তালিকা ধরে ধরে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী এবং পদস্থ সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তাদের হত্যা করে ফেলে রাখা হয় নিস্তব্ধ ভুতুড়ে অন্ধকারে। পরদিন সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় হতভাগ্য এসব বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ। এ যেন বাঙালির সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক নির্মম বধ্যভূমি। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও বা অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। হাত পিছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়িভুঁড়িও বের করে ফেলা হয়েছিল অনেকের। স্বাধীনতা ছুঁইছুঁই উল্লসিত মানুষ স্বজন হারানোর সেই কালরাত্রির কথা জানতে পেরে শিউরে উঠেছিল। স্থবির হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল মেধাশূন্য। তখনও স্বজনের রক্তের উপর উল্লসিত নৃত্যরত এদেশীয় নরঘাতকরা। বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধিকার সংগ্রামে এসব বুদ্ধিজীবী নিজ নিজ মেধা, মনন ও লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগঠকদের প্রেরণা জুগিয়েছেন। দেখিয়েছেন মুক্তির পথ। গোটা জাতিকেও উদ্দীপ্ত করেছেন স্বাধিকারের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার পথে যেতে। দেশপ্রেমিক ভূমিকাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের জন্য। স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় ঘাতকচক্রের। তাই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য হত্যাযজ্ঞের গোপন ফন্দি আঁটে নরঘাতকের দল। হানাদারদের হত্যার তালিকায় উঠে আসে অসংখ্য বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী মানুষের নাম। পরে কৃতী এসব বুদ্ধিজীবীর তালিকাই তুলে দেয়া হয়েছিল সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপ কুখ্যাত আলবদর, রাজাকার ও আলশামস বাহিনীর হাতে। নেপথ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের উপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, সে অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক-প্রকৌশলী। তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. জিসি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনওয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, রাশেদুল হাসান, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দিন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমদ, লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, ডা. যোগেশ চন্দ্র সাহা, নতুন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফয়জুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হবিবুর রহমান, কবি মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বানীতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের শোকাবহ দিনে শোককে শক্তিতে পরিণত করে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতির বিবেক হিসেবে খ্যাত আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, বিজয়ের প্রাক্কালে হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এদেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বহু গুণীজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। জাতিকে মেধাহীন করাই ছিলো তাদের হীন উদ্দেশ্য। বুদ্ধিজীবীদের এভাবে বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে জাতি হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনেছি। রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে। রায় বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। কোনো ষড়যন্ত্রই জাতিকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধীদের যারা রক্ষার চেষ্টা করছে তাদেরও একদিন বিচার হবে। এসব রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মা শান্তি পাবে। দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এক কলঙ্কময় দিন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নামে। তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। তাদের আত্মত্যাগ জাতি কখনোই ভুলবে না।
বেগম খালেদা জিয়া বানীতে বলেন, ১৪ ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন। বাংলাদেশকে মেধা মননে পঙ্গু করার হীন উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে এ দিনে হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করোছিলো। ওরা ভেবেছিলো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করলেই এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে এবং উন্নয়ন অগ্রগতি রুদ্ধ করে দেয়া যাবে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। আজকের এ শোকাবহ দিনে দেশবাসীর প্রতি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আহবান জানান। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি: সূর্যোদয় ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৭:০৫ মিনিট: মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, সকাল ৭:৩৫ মিনিট: বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন, সকাল ৮:০৫ মিনিটে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ এবং বিকেল ৩ টায় আলোচনা সভা। স্থান : কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন। প্রধান অতিথি: আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভাপতিত্ব করবেন: আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং জাতীয় সংসদের য় উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। আরও বক্তব্য রাখবেন: জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ।
বিএনপি: শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষ্যে আজ শনিবার সকাল ৮টায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করবেন।
সিপিবি: সকাল ৮ টায় রায়েরবাজার বধ্যভুমি স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে আট টায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষপমাল্য অর্পন করবে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ