Home / জাতীয় / প্রধান জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকার.

প্রধান জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকার.

বাংলাদেশের প্রধান জল্লাদ মো. শাহজাহান ভূঁইয়া। তার জীবনের অজানা অধ্যায়ের শেষ নেই। স¤প্রতি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার আগ মুহূর্তে এ জল্লাদকে নিয়ে কত বছর জেলে আছে, তার নামে কতগুলো মামলা এবং এখন পর্যন্ত কতজনকে ফাঁসি দিয়েছেন গণমাধ্যমে মনগড়া সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু জল্লাদ শাহজাহান ইতিপূর্বে অনেক চেষ্টা করেও কোনো গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে পারেননি। সর্বশেষ তিনি ২০১২ সালে জেলখানার ভেতরেই এক সাংবাদিককে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনে ঘটে যাওয়া অসংখ্য গল্প এবং কারাগারের অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেন। ওই সাক্ষাৎকারেরই অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো।
বিভিন্নভাবেই মো. শাহজাহান ভূঁইয়াকে এদেশের প্রধান জল্লাদ বলা যায়। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে কারাবন্দি এই জল্লাদ এখন পর্যন্ত ৩২ জনকে ফাঁসি দিয়েছেন। জল্লাদ শাহজাহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫ ঘাতককে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছেন। এদেশের কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার, জঙ্গি নেতা বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানী, শারমীন রীমা হত্যা আসামি খুকু, মনির, ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসানসহ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করেন জল্লাদ শাহজাহান। এদেশে তিনিই একমাত্র জল্লাদ যিনি একরাতেই দুই কারাগারে ৪ আসামিকে ফাঁসি দিয়েছেন। তিনি হলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অভিনয় জগতে জল্লাদদের আইডল। বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধী বিচারে মৃত্যুদণ্ড পাচ্ছেন আশা করা যায় জল্লাদ শাহজাহানই তাদের ফাঁসি কার্যকর করবেন। তবে জল্লাদ শাহজাহানের জীবনে অনাকাক্সিক্ষত অনেক অর্জন থাকলেও তিনি কারোর সামান্যতম সহানুভূতিও পান না। আর পত্রিকায় তাকে নিয়ে ভুলেভরা যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা শুধরানোর কোনো সুযোগ নেই তার। কারণ তার সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ খুব কম মানুষই পান।
জল্লাদ শাহজাহানের পুরো নাম মো. শাহজাহান ভূঁইয়া। ১৯৫০ সালে ২৬ মার্চ তিনি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম হাসান আলী ভূঁইয়া। মাতা সবমেহের। তারা ৩ বোন ১ ভাই। শাহজাহান লেখাপড়া করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম খাস হাওলা ফ্রি পাইমারি স্কুল, মাধ্যমিক পড়াশোনা করেছেন পারলিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সর্বশেষ নরসিংদী সরকারি কলেজে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত। ১৯৭৪ সালে তিনি এইচএসসি পাশ করেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর-২৬৯১৬৪৯১০৬১২৯।
জল্লাদ মো. শাহজাহান ভূঁইয়া সেনাবাহিনীতে ৩ বছর কাজ করেছেন। ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড তাকে খুব আকর্ষণ করতো। বিশেষ করে তাদের শৃঙ্খলাবোধ তার সব থেকে বেশি ভালো লাগতো। তাই মনেপ্রাণে সব সময় স্বপ্ন দেখতেন সুযোগ পেলেই সেনাবাহিনীতে চাকরি করবেন। বাবার মাধ্যমে একবার খবর পান সেনাবাহিনীতে লোক নেয়া হচ্ছে। এরপর সেনাবাহিনীর চাকরির জন্য অংশগ্রহণ করলে টিকে যান তিনি। যথাসাধ্য ৩ বছর সেনাবাহিনীতে থাকার পর বড় অফিসারদের ধমকের কারণে জেদ করে বাড়ি চলে আসেন।
শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, অফিসারদের কমান্ড আমার ভালো লাগতো না। কারণ আমি তাদের থেকে পড়াশোনা এবং পারিবারিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে ছিলাশ। চাকরি করবো না বলে ১১ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে সেনাবাহিনীতে চাকরি করার স্বপ্নের এখানেই ইতি ঘটে।
শাহজাহান ভূঁইয়া স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪ বছর পর নরসিংদী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি তরতাজা তরুণ। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছেন সবে ২ বছর আগে। মনের অজান্তেই কমিউনিস্ট পার্টি ভালো লেগে যায়। সেখানেই তিনি নাম লিখিয়ে ফেলেন। তারপর পারফরমেন্স দেখে তাকে কেন্দ্রে ডেকে পাঠানো হয়। সেখান থেকে নরসিংদী জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি রাজি হন। ১৯৭৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ব্যক্তি হিসেবে শাহজাহান ভূঁইয়া খুবই ভালো প্রকৃতির ছিলেন। পারতপক্ষে কারোর উপকার ছাড়া ক্ষতি করার চেষ্টা করতেন না। তবে তিনি প্রচণ্ড বন্ধুপাগল ছিলেন। একবার তার গ্রামে নারীঘটিত একটি ঘটনা ঘটে। তাতে শাহজাহানের দুই বন্ধুসহ তার নামে অভিযোগ উঠে। তাকে নিয়ে গ্রামে বিচার বসে। সেই বিচারে তাকে অপরাধী প্রমাণ করে সাজা দেয়া হয়। এরপর থেকেই তার ক্ষিপ্ততা শুরু। তিনি অপমান সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধান্ত নেয়- অপরাধ জগতে প্রবেশ করে এই অপমানের চরম প্রতিশোধ নেবেন। যে সিদ্ধান্ত সেই কাজ। তারপরের ইতিহাস অনেক লম্বা।
নারীঘটিত ওই ঘটনার পর শাহজাহান ভূঁইয়া বাংলাদেশের একজন বহুল পরিচিত সন্ত্রাসীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাছাড়া কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করার পর থেকে যে কোনো অপারেশনে তার চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশন করেছিলেন ১৯৭৯ সালে মাদারিপুর জেলায়। আর তা ছিল শাহজাহান ভূঁইয়ার জীবনের শেষ অপারেশন। মাদারিপুরে অপারেশন শেষ করে মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকায় ফেরার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে শাহজাহানের দল মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকায় যাবে। এজন্য মানিকগঞ্জে পুলিশ চেকপোস্ট বসালে শাহজাহান তার ওই এলাকার বাহিনীর মাধ্যমে জেনে যায়। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও ওই এলাকা দিয়েই ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তিনি। রাতভর মানিকগঞ্জে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধ করেন কিন্তু পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি। এরপর ঢাকায় পৌঁছে যখন নরসিংদীর উদ্দেশে রওনা হন পথিমধ্যে পুরিশ তাকে আটক করে। তার গতিময় জীবনের এখানেই সমাপ্তি এবং এরপর থেইে শুরুতার বন্দিজীবন।
১৯৭৯ সালে আটক হওয়ার আগে ও পরে তার নামে সর্বমোট ৩৬টি মামলা হয়। এরমধ্যে ১টি অস্ত্র মামলা, ১টি ডাকাতি মামলা এবং অবশিষ্ট ৩৪টি হত্যা মামলা। বিচারকার্যে দেরি হওয়ার কারণে সাজা ছাড়াই তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ১৭ বছর হাজতি হিসেবে কারাগারে থাকেন। ১৯৯৫ সালে তার ১৪৩ বছর সাজা হয়। পরে ১০০ বছর জেল মাপ করে তাকে ৪৩ বছরের জেল দেয়া হয়। জেল থেকে বের হওয়অর তারিখ শাহজাহানের জেল কার্ডের ওপর লেখা আছে, ‘ডেট অব রিলিজ ২০৩৫’। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওই রিলিজ কার্ডের দিকে তাকিয়ে শাহজাহান বলেন, রিলিজ ডেটে তার বয়স হবে ৮৫ বছর। ততদিনে তিনি বাঁচবেন কিনা তা নিয়ে নিজেই সন্দিহান। আর বেঁচে থাকলেও তিনি কী তখন মুক্ত আকাশের দিকে তাতিয়ে জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে নিতে পারবেন?
শাহজাহান ভূঁইয়াকে জীবনের সোনালী সময়গুলো জেলখানাতেই কাটাতে হবে। এ অবস্থায় তিনি ভাবলেন জল্লাদ হিসেবে সময় দিলে তার সাজা কিছু দিনের জন্যও কম হবে। তাই নিজেকে অন্যভাবে প্রস্তুত করার জন্য জেল সুপারের কাছে জল্লাদের খাতায় নাম লেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৯৮৯ সালে প্রথম তিনি সহযোগী জল্লাদ হিসেবে গফরগাঁওয়ে নুরুল ইসলামকে ফাঁসি দিয়ে তার জল্লাদ জীবনের সূচনা করেন। ওটাই ছিল শাহজাহানের জীবনে কারাগারে কাউকে প্রথম ফাঁসি দেয়া। তার যোগ্যতা দেখে ৮ বছর পর ১৯৯৭ সালে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে প্রধান জল্লাদের আসন প্রদান করেন। আর প্রধান জল্লাদ হওয়ার পর ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসানকে প্রথম ফাঁসি দেন তিনি।
জল্লাদ শাহজাহান জানান, একটি ফাঁসি দিতে প্রধান জল্লারে সাথে ৬ জন সহযোগী লাগে এবং ফাঁসির রায় কার্যকর করলে প্রত্যেক জল্লাদের ২ মাস ৪ দিন করে কারাদণ্ড মওকুফ করা হয়। আর কারাগারে যারা জল্লাদ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শাহজাহান তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এদিকে বিশেষ দিনে কারা কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে দেখানোর জন্য বলে থাকেন এদিনে একশ’ থেকে প্রায় ১ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। আসলে যারা দীর্ঘদিন ধরে কারা ভোগ করছে বা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তাদেরকে মুক্তি দেয়ার কথা থাকলেও মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় বন্দি মুক্তি দেয়া হয়। তবে মাঝে মাঝে যাদের মাত্র ২/১ দিন বা এক সপ্তাহ কারাভোগের দিন বাকি আছে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে অনেকে বাহাবা নেয়ার চেষ্টা করে থাকেন।
২০১২ সালের ফেব্র“য়ারি মাস পর্যন্ত জল্লাদ মো. শাহজাহান সর্বমোট ৩২টি ফাঁসি কার্যকর করেছেন। কোনো জল্লাদের পক্ষে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে বেশি ফাঁসি কার্যকরের রেকর্ড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফাঁসিগুলো হচ্ছে- ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী কন্যা শারমীন রীমা হত্যা মামলার আসামি খুকু মনিরকে, ১৯৯৭ সালে বহুল আলোচিত ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসান, ২০০৪ সালের ১০ মে খুলনা জেলা কারাগারে এরশাদ শিকদারের ফাঁসি, ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রংপুর জেলা কারাগারে ইয়াসমিন হত্যা মামলার আসামি এএসআই মইনুল হক ও আব্দুস সাত্তারকে, ২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরে ইয়াসমিন হত্যা মামলার আরেক আসামি পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণ, ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ কাশিমপুর ও ময়মনসিংহে জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানী, আব্দুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও ইফতেখার মামুন, ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ খুনী বজলুল হুদা, আর্টিলারি মুহিউদ্দিন, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, ল্যান্সার মহিউদ্দিন আহমেদ।
শাহজাহান ভূঁইয়া যখন কাউকে ফাঁসি দেন তখন পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। তিনি যথাসম্ভব কারাগারে বসেই ওসব পত্রিকাগুলোর কপি সংগ্রহ করেন। পরিবারের সাথে শাহজাহানের সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই সুখকর ছিল না। তিনি যখন বাম রাজনীতির সাথে জড়িত হন তখনই তার বাবা তাকে খারাপ চোখে দেখতে শুরু করেন। জীবনের সোনালী মুহূর্তে তিনি যখন কারাগারে প্রবেশ করেন তারপর থেকে আর তার বাবার সাথে কোনোদিন যোগাযোগ হয়নি। তবে মা বেঁচে থাকা অবস্থায় নিয়মিত দেখতে আসলেও বাবা কোনোদিন তাকে জেলগেটে দেখতে আসেননি। এমনকি বাবার মৃত্যুর ২ মাস পর তিনি খবর পান। বর্তমানে বেঁচে আছেন ৩ বোন। তারা থাকেন বাবার রেখে যাওয়া ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের ১১২ নম্বর বাড়িতে। এখানে শাহজাহানের ৬ কাঠা জমি আছে।
শাহজাহান অভিযোগ করে বলেন, সব জমি বোনেরা নিয়ে নিয়েছে। এই বোনেরাও তাকে ১০/১৫ বছর আগে একবার দেখতে এসেছিল। তারপর আর কোনো খবর নেয়নি। সর্বশেষ গত ৩ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে একদিন তার বোনের ছেলে তাকে দেখতে এসেছিল। কিন্তু তারপর আর কোনো খবর নেয়নি তারা।
মো. শাহজাহান ভূঁইয়া জেলখানায় জল্লাদ শাহজাহান নামেই খ্যাত। এমনকি তার জগ-বালতি-প্লেটের ওপরেও জল্লাদ লেখা। হাজতিরা কয়েদি হয়ে গেলে কারাগারে তাদের মূল্যায়ন একটু বেশিই থাকে। তাই তারও এখন কারাগারে কিছুটা বেশিই মূল্যায়ন হয়। অন্যদের মতো তিনিও এখন কারাগারে নতুন হাজতিদের থাকা, খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করে থাকেন। এর বিনিময়ে কিছু টাকা পান এবং তা দিয়ে এখানে তিনি একটু আরাম-আয়েশে থাকতে পারেন। এখন তার দায়িত্বে প্রায় ২২ জন লোক থাকে। তার মধ্যে ৫ জনকে ফ্রি খাওয়ান এবং বাকিরা নতুন হাজতি আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে বলে তারা টাকা দিয়ে থাকেন। নিয়মানুসারে তার এ টাকা সিট বিক্রেতা, সুবেদার, জমাদার, জেলার থেকে শুরু করে জেল সুপার পর্যন্ত ভাগ পান। তাদের ভাগ দেয়ার পর যা বাঁচে তা দিয়েই চৌকা থেকে ভালো কিছু সবজি কিনে তাদেরকে খাওয়ান। সপ্তাহে একদিন পোলাও গোস্ত খাওয়ারও ব্যবস্থা করেন তিনি। বর্তমানে শাহজাহান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মেঘনা-২ ভবনে সিআইডির দায়িত্বে আছেন। সপ্তাহে একদিন করে দায়িত্ব পরিবর্তনের নিয়ম থাকলেও তিনি বিশেষ একটি দায়িত্বই পালন করে দিন কাটাচ্ছেন। ভোর ৬টার আগে ফাইলে অংশগ্রহণ করার জন্য অন্য সবার মতো তিনিও ঘুম থেকে উঠে যান। বাইরে থেকে ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে সকালের নাস্তা করেন। দুপুর ১২টায় বারো গুনতির পর লাঞ্চ দেয়া হয়। শাহজাহান তার সংসারের ২২ জন লোক নিয়ে বসেন। একে একে সবাইকে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দেয়ার পর তিনি খাবার খান। দুপুরের পরে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো কাজ থাকলে তিনি তা করেন বা নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ান। তবে বিকাল ৫টার আগেই সবাইকে ঘরে ফিরতে হয় বলে তখন তিনিও তার কক্ষে চলে আসেন। সন্ধ্যার নামাজের পর দেয়া হয় রাতের খাবার। তখন তিনি আবার সবাইকে খাওয়ানোর পর নিজে খান। খাওয়া শেষ হলে রাতের বিছানা ঠিক করে সবার ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন শাহজাহান। তার রুমে ৬২ জন মানুষ থাকার ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২৭০ জন লোক থাকে। তাদের প্রত্যেকের জন্য তার দৌড়ঝাপ একটু বেশিই করতে হয়। এতো কিছুর মধ্যেও তিনি তার রুম সব সময়ের জন্য পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখেন। সম্ভব হলে রাতে বিটিভির খবর দেখেন। তা নাহলে তার বহু পুরনো একটি রেডিওতে নিয়মিত রাত সাড়ে ১০টার বিবিসির খবর শোনেন। রাতে ঘুম না আসলে দাবা অথবা তাস খেলে সময় কাটান। কখনো কখনো মধ্যরাতে এফএম রেডিওতে প্রচারিত গান শোনেন। এভাবেই একসময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। পরেরদিন ভোরে আবারও ঘুম থেকে উঠে আগের রুটিনে তার নিয়মিত পথচলা শুরু হয়।

অভিযুক্ত কয়েদিদের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে যসব দেশে কার্যকর হয় বাংলাদেশের তার অন্যতম। ১৯৭১ সালে এ দেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর এখন পর্যন্ত ৪ শতাধিক মানুষকে ফাঁসি দেয়া হয়ে এবং বর্তমানে ১ হাজার ১৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে ১০৬ জন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ছাড়াও দেশের আরো ১৪টি কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ রয়েছে। ফাঁসি দেয়ার জন্য জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদের আমলে ম্যানিলা থেকে ১০ হাজার ফাঁসির রশি আমদানি করে বাংলাদেশ। এরপর আর কোনো রশি আনা হয়নি। ওই রশি দিয়েই এদেশের ফাঁসির কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে ফাঁসি দেয়ার জন্য বাংলাদেশে কয়েক ডজন জল্লাদ আছেন। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ (যারা নূন্যতম ৫জন আসামিকে ফাঁসি দিয়েছেন) জল্লাদরা হচ্ছেন- নরসিংদীর শাহজাহান ভূঁইয়া, গাজীপুরের হাফিজ উদ্দিন, কক্সবাজারের বাবুল মিয়া (২০১২ সালে তিনি মুক্তি পেয়েছেন), সাভারের কালু মিয়া, গোপালগঞ্জের শেখ মো. কামরুজ্জামান ফারুক ও শেখ সানোয়ার, ফরিদপুরের আবুল, জয়নাল বেপারী ও মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকার মোহাম্মদ মাসুম, তানভীর হাসান রাজু ও মনির হোসেন, নেত্রকোনার মোহাম্মদ বাবুল। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৭টি কারাগারে প্রায় ৭৫ হাজার বন্দি রয়েছে। যা স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ৩ গুণ বেশি।
প্রধান জল্লাদ মো. শাহজাহান ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, কারাগারে বন্দিদের জন্য সরকার থেকে যে খাবার দেয়ার কথা তা সাধারণ দেয়া হয় না। মোটা চালের ভাতে প্রায়ই ইটের খোয়া পাওয়া যায়, যা মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়। আড়াই হাজার বন্দির ধারণক্ষমতার কারাগারে প্রায় ১০ হাজার বন্দি রাখা হয়েছে। তাদের জন্য নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না। ফলে সহজেই বুঝতে পারছন কারাগারে বন্দিদের কিভাবে রাখা হচ্ছে। আর ১০ হাজার লোকের জন্য কারাগারে পানি সাপ্লাই দিতে পুরনো দুটি পানি তোলার মেশিন রয়েছে। যা অধিকাংশ সময়ই নষ্ট থাকে। তাই পানির অভাবে এখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। এখানে প্রতি ফোটা পানি হিসেব করে খরচ করতে হয়। চোখে না দেখলে এখানকার অমানসিক জীবনের বর্ণনা কেউই অনুধাবন করতে পারবেন না। দুবির্ষহ এ জীবনে প্রতিটি মুহূর্তে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। যার খবর মুক্ত আকাশের পাখিরা ছাড়া আর কেউ জানে না।
জল্লাদ শাহজাহান আরো বলেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল আমি তাদেরকে ফাঁসি দিয়েছি। আমি আশা করেছিলাম শেখের মেয়ে প্রধানমন্ত্রী, সে আমার দিকে একটু সুনজর দেবে। কিন্তু কে রাখে কার খবর? আমার কথা কেউ বিবেচনা করলো না। নেলসন ম্যান্ডেলা একসময় পৃথিবীর সব থেকে বেশি সময় জেলখানায় থেকে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন। আর এখন আমি জীবনের ৩৪টি বছর কারাগারে কাটিয়ে দিয়ে তার রেকর্ড ভেঙ্গে দিলাম। এখন আমার অপরাধ করার ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনোটাই নেই। আমাকে ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যা সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। মানবিক দিক বিবেচনা করলে একটি মানুষ জীবনের শেষ বয়সে এসে আশা আলো দেখতে পারেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেন তার সামান্যতম সহানুভূতি দেখান সে ব্যাপারে প্রধান জল্লাদ শাহজাহান ভূঁইয়া বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ