Home / জাতীয় / সমঝোতার কৌশল খুঁজতে ব্যস্ত জাতিসংঘ

সমঝোতার কৌশল খুঁজতে ব্যস্ত জাতিসংঘ

চলমান রাজনৈতিক সংকট দূর করতে কিভাবে সমঝোতায় পৌঁছানো যায় সে কৌশল খুঁজতে ব্যস্ত রয়েছে জাতিসংঘ। ঢাকায় সফররত সংস্থার মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুশীল সমাজ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠককালে এ কৌশল খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা জাতিসংঘের একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, একজন সমঝোতা বিশেষজ্ঞ এবং দু’জন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞকে নিয়ে তারানকো গতকাল রোববার পৃথক বৈঠকগুলোতে সমঝোতায় পৌঁছানো নিয়ে কি করা যায় সংশ্লিষ্টদের কাছে এ ধরনের নানা প্রশ্ন করেছেন। তারানকোর সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ বলেছেন, সব দলের মধ্যে সমঝোতা হলে অনেক কিছুই করা সম্ভব জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকে এ কথাই জানানো হয়েছে। সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তারানকো বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানতে চাইলে বলা হয়েছে, একতরফা নির্বাচনের এই রেলগাড়িটা থামাতে হবে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সঙ্গে তারানকোর বৈঠক শেষে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের এবং দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, এ মুহূর্তে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। তবে তারানকোর সঙ্গে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলে তা হয়নি।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত দু’দিন তারানকো দৌড়-ঝাঁপের পর আজ সোমবার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা নিয়ে নাটকীয় সিদ্ধান্ত আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত জানা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক : আইনি কাঠামোর মধ্যে সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছানোসহ সবকিছুই সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ। তবে যা করার দ্রুত করতে হবে। কারণ, সমঝোতার বিষয়টি মীমাংসা না হওয়ায় এরই মধ্যে বিষয়টি জটিল হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে তারানকোর বৈঠক প্রসঙ্গে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
তারানকোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছানো সম্ভব কিনা! আমি তাদের বলেছি, সমঝোতা হলে অনেক কিছুই সম্ভব। তবে সবকিছুই আইনের আলোকে হতে হবে।
এর আগে বৈঠকে তারানকো সিইসির কাছে জানতে চান নির্বাচন পেছানোর সুযোগ আছে কিনা! জবাবে সিইসি বলেন, আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই ইসির হাতে নেই। তবে সব দল ঐকমত্যে পৌঁছলেই কেবল নির্বাচন পেছানোর সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে দলগুলোকে অবশ্যই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে।
সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠক : সুশীল সমাজের ৪ প্রতিনিধির সঙ্গে বিকেলে বৈঠক করেছেন তারানকো। তারা হলেন ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. বদিউল আলম মজুমদার ও অধ্যাপক শাহদীন মালিক। প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা প্রত্যেকেই জাতিসংঘের আমন্ত্রণে এখানে এসেছিলাম। প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান বুয়েটের সাবেক ভিসি জামিলুর রেজা চৌধুরী।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তারানকোর সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন পেছানোর ওপর জোর দেন যাতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
ড. কামাল বলেন, ফার্নান্দেজ তারানকো তাদের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানতে চেয়েছেন। তারা বলেছেন, আইনত নির্বাচন এখনো পেছানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
তিনি বলেন, আমরা বলেছি, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান দরকার। একতরফা নির্বাচনের এই রেলগাড়িটা থামাতে হবে।
অধ্যাপক শাহদীন মালিক বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল। দেশের মানুষ চায় ওইরকম একটি নির্বাচন, যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। জাতিসংঘ দূতের সঙ্গে কি কথা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওনারা নিউইয়র্ক থেকে কোনো ফর্মুলা নিয়ে আসেননি। তিনি সবার সঙ্গে কথা বলবেন। সবাই যেটা চায়, তেমন একটি নির্বাচনই তারা চান।
এরশাদের সঙ্গে বৈঠক: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তারানকোকে জানিয়েছেন, সব দল ছাড়া জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে না। বারিধারার দূতাবাস রোডের প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসভবনে গতকাল সকালে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের।
সকাল সাড়ে ৯টায় থেকে সাড়ে ১০টায় পর্যন্ত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের আলোচনা হয়েছে। সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, সে বিষয়ে তারা জানতে চেয়েছেন। আমাদের চেয়ারম্যান সুনির্দিষ্ট অনেক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন তাদের কাছে।
হাওলাদার জানান, জাপা চেয়ারম্যান এ প্রতিনিধি দলকে আরো জানান, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেয়া এবং আস্থা অর্জনে সব দলের একত্রে বসে আলোচনা করতে হবে। আমরা বলেছি, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে এটি নিরসন করতে হবে। সময় দিতে হবে, যেন সব দল নির্বাচনে আসতে পারে। সরকারি দল, বিরোধী দল এবং দেশের বিশিষ্টজনকে এক টেবিলে বসে আলোচনা করে একটি শান্তির পথ খুঁজতে হবে।
জাপা মহাসচিব আরো জানান, কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার সময়ও আমরা বলেছি নির্বাচনের সময় পেছাতে হবে এবং সব দলের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমরা প্রয়োজনে আবারো বসব।
একই সময়ে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের সাংবাদিকদের জানান, তারা (জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল) আমাদের অবস্থান ও মতামত জানতে চেয়েছেন। আমরা তাদের বলেছি এই মুহূর্তে নির্বাচন হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। নির্বাচনের সময় পিছিয়ে সবার সঙ্গে বসে একটি পদ্ধতি বের করতে হবে, যে পদ্ধতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আমরা নির্বাচনে অংশ নেব না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেন, নির্বাচনের সময় পেছালেও সব দল আসবে কি না তা আমরা বলতে পারব না। তবে সব দল না এলে আমরা নির্বাচনে যাব না।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক বাতিল : সকালে বিজ্ঞপ্তি, দিনভর দৌড়-ঝাঁপ করেও অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর দেখা পেল না জামায়াতে ইসলামী। বিকেল সাড়ে ৩টায় তারানকোর সঙ্গে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ হবে- মর্মে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে সাংবাদিকদের জানানো হলেও শেষতক সে বৈঠক হয়নি। বিকেল পৌনে ৩টায় এ প্রতিবেদককে মোবাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জানান, নির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়েছে। তবে আগামীকাল (আজ) হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
গওহর রিজভী ও শমশের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক: তারানকোর সফরের তৃতীয় দিনে নির্ধারিত না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এবং বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শমশের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারানকো।
দুপুরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় বৈঠক করে তারানকো সোজা চলে যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রথমদিকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন এমন খরব চাউর হয়ে গেলেও পরে জানা যায় গওহর রিজভীর সঙ্গে বৈঠক করছেন তারানকো।
দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা পৌনে ২টা পর্যন্ত তারানকো এবং জাতিসংঘ প্রতিনিধি দল রিজভীর সঙ্গে বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যান সোনারগাঁও হোটেলে। সেখানে সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠক শেষে তারানকো ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরনের সঙ্গে সন্ধ্যার পর বৈঠক করে সোজা চলে যান শমশের মবিন চৌধুরীর বাসায়। সেখানে প্রায় ১ ঘণ্টার বৈঠক করেন তারানকো। গওহর রিজভী এবং শমশের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে কি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে হয়তো কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত দুই জোটের শীর্ষ নেতার কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যই গওহর রিজভী এবং শমশের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ