Home / জাতীয় / সালাম তোমায় “হিপ্পি মেজর”

সালাম তোমায় “হিপ্পি মেজর”

আজ বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী,বীর মুক্তিযোদ্ধা নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল এর ২৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৮ সালের ১৯ নভেম্বর ইসলামাবাদে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ অবস্থায় রাত ১০টা ৩০মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। জাসদ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে পড়লে মানসপটে ভেসে উঠে প্রলম্বিত চুল আর মুখভর্তি দাঁড়ি-এমন এক নায়কের কথা,যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই আধিপত্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে মাতৃভূমি রক্ষার সংগ্রামে নেমেছিলেন। বরিশালের উজিরপুরে জন্ম নেওয়া বাংলা মায়ের এই দামাল ছেলে নিজ গ্রাম থেকেই শুরু করেছিলেন মাতৃভূমির মুক্তি সংগ্রাম।মেজর জলিল
সাহসী এই যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে শত্রুমুক্ত করেছিলেন সাতক্ষীরা,বরিশাল-পটুয়াখালী ও খুলনা। কিন্তু স্বাধীন দেশে হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র-শস্ত্রসহ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বন্ধুবেশে মিত্রবাহিনী লুটে নিবে তা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তীব্র প্রতিবাদ করায় তাঁকে হতে হয়েছিল স্বাধীনদেশের প্রথম রাজবন্দী। বাংলার মাটিতে আধিপত্যবাদীদের প্রথম আগ্রাসনেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে যথেষ্ট মূল্যবান এই ভূ-খন্ডের বতর্মান অবস্থাও শোচনীয়। এখনো এখানে সম্প্রসারণবাদীদের নানা কূট-কৌশল এই ভূ-খন্ডের সার্বভৌমত্বকে করছে প্রশ্নের সম্মুখীন। তিস্তার পানি বন্টন,নব্য ফারাক্কা টিপাইমুখ অথবা সুন্দরবন বিধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শাসকচক্রের নতজানু মনোভাব প্রকট আকারে প্রকাশ করছে মেজর জলিলের মত সিংহপুরুষের অভাব। বন্ধুরাষ্ট্রের প্রভু সুলভ মনোভাবের কারণে এই জাতি খুঁজে ফিরছে আর একজন “হিপ্পী মেজর”-কে।
কি করেন নি এই জাতির জন্য অন্তঃপ্রাণ দেশপ্রেমিক মেজর জলিল। ভিনদেশী লুটেরাদের পাশাপাশি যখন মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের সোল এজেন্সীর দাবীদাররাও লুটপাটে ব্যস্ত,তখন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংঘবদ্ধ লুট আর সৎ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য এই স্বাধীনতা নয়। আপোষহীন মেজর তাই নৈরাজ্য আর স্বৈরাচার রুখতে আ স ম আব্দুর রব,শাহাজান সিরাজ প্রমুখকে নিয়ে গঠন করেছিলেন প্রথম কার্যকরী প্রতিবাদ-জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। এ ছিল তৎকালীন রাজতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রচন্ড বি “ভালো” একটি চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মেজর জলিল তাই বেছে নিয়েছিলেন আন্দোলন সংগ্রামের পথ। হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে আহত। জাতির মুক্তির পথ খুঁজে ফেরা জলিল পঁচাত্তরে গণবাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এমনিতেই জাসদের তৎকালীন কিছু কর্মকান্ড যেমন সিপাহী জনতার বিপ্লবের পরপর জনৈক মহিলা অফিসারসহ সেনাবাহিনীর ২২জন অফিসারকে হত্যা এবং এই হত্যাকান্ডকে শ্রেণীসংগ্রাম বলে চালানোর চেষ্টা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। বন্দীদশায় মেজর জলিল তাই উত্তরণের পথ খুঁজতে লাগলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জনের জন্য ইসলামী দর্শনই চূড়ান্ত দর্শন। তাঁর “দাবী,আন্দোলন দায়িত্ব” শীর্ষক বইয়ে তিনি বলেছেন,
“সর্বময় কর্তৃত্ব এবং মালিকানা তো পরম করুণাময় আল্লাহ তা’য়ালারই,বাংলাদেশের মাটিতে বসবাসকারী মানুষ আল্লাহরই একমাত্র প্রতিনিধিত্ব করবে,আমেরিকা কিংবা ভারতের প্রতিনিধিত্ব নয়। সেই ঈমানদার বাংলাদেশী মানুষেরই আজ সর্বাধিক প্রয়োজন। রাজনীতিবিদ,সমাজবিদ,বুদ্ধিজীবী,সামরিক এবং বেসামরিক চাকুরীজীবীদের মধ্যে যাঁরা ঈমানদার রয়েছেন,যাঁরা একমাত্র আল্লাহর প্রতি ‘তাওয়াক্কুল’ বা ভরসা করেন,তাঁদেরকেই আজ দেশ ও জাতির দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে। আমেরিকা,রাশিয়া কিংবা ভারতের উপরে নির্ভরশীল নয়,বিশ্বস্রষ্টা পরম করুণাময় আল্লাহর ওপরই আমাদের নির্ভরশীল হতে হবে।” (পৃষ্ঠা-৫২)
১৯৮৯ সালে প্রকাশিত বইয়ের চরণই প্রকাশ করে মেজর জলিল এর দূরদৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধ যাঁকে করেছিল লড়াকু,সমাজতন্ত্রের রাজনীতি যাকে করেছিল অভিজ্ঞ, ইসলামের মূল ধারায় প্রত্যাবর্তন এর ফলে পূর্ণতা পাওয়া এই দেশপ্রেমিক মুক্তিকামীর প্রয়োজন জাতীয় জীবনের সকল সংকট দূর্বিপাকে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের সকল আগ্রাসনে আমাদের মনে পড়বে সেই বাণী- “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা”।
জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা শেষ করছি তাঁর “প্রথম রাজবন্দী দশা”-র স্মৃতিকথা দিয়ে।
“যশোর সেনা ছাউনীর অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি নির্জন বাড়িতে আমাকে সকাল এগারোটায় বন্দী করা হয়। বাড়ী না যেন হানাবাড়ী। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশেপাশে বেশ নরকঙ্কাল পড়ে আছে। ঘরের রুমে মানুষের রক্তের দাগ। কোন ধর্ষিতা বোনের এলোমেলো ছেঁড়া চুল।”
স্বাধীন দেশের মাটিতে রাজবন্দী অবস্থায় থাকা মেজর জলিল এর সেই ঘর আজ পুরো দেশটা জুড়ে বিস্তৃত।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ