Home / জাতীয় / বাংলাদেশে এসেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা

বাংলাদেশে এসেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা

শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছিলেন অবিসংবাদিত বিশ্ব নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৭ বছর আগে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী। রাষ্ট্রক্ষমতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী সাড়ম্বরে উদযাপনের অংশ হিসেবে সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উদ্বোধন করার সিদ্ধান্ত নেয় স্মারক ‘শিখা চিরন্তন’। আর এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয় ম্যান্ডেলাসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতাকে। এ তালিকায় সবার আগে ছিল নেলসন ম্যান্ডেলার নাম। বাংলাদেশের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ ভোরে বাংলার মাটিতে নামেন তিনি। ওঠেন হোটেল শেরাটনে। খানিক বিশ্রাম নিয়েই তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মঞ্চে ওঠেন। মঞ্চে একই সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত, তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান সুলেমান ডেমিরেল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমি যদি আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলি বর্ণবাদী শাসক গোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশ শাসন করার কারণে দেশের কোনো উন্নয়ন হয়নিÑ এতে আমাদের দেশের মানুষের কোনো লাভ হবে না। বরঞ্চ আমাকে স্মরণ রাখতে হবে দেশের মানুষ অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে আমাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছেন। ম্যান্ডেলা বলেন, আজ আমি বারবার ভাবি একই কথাÑ আমি মানুষের সেই স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণে কতটুকু সক্ষম হয়েছি। স্মারক ‘শিখা চিরন্তন’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের ঢল নেমেছিল। অনুষ্ঠান সংগঠকদের একজন তৎকালীন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মোহম্মদ জমির জানিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের ওই ঢল নেমেছিল মূলত ম্যান্ডেলাকে দেখার জন্যই। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ এমন একজন মুক্তবাকের মানুষকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন। ম্যান্ডেলার স্মৃতি স্মরণ করে মোহম্মদ জমির জানান, আমি তখন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব। দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন ম্যান্ডেলার সঙ্গে। রাষ্ট্রদূত আমার নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে ম্যান্ডেলা বলে ওঠেন, আমি তার নাম জানি। এরপর বললেন, আমার সঙ্গে কথা বলবেন। এ রকম সুযোগ মানুষের জীবনে কমই আসে! মোহম্মদ জমির জানান, বিকালেই ম্যান্ডেলার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে যাই হোটেল শেরাটনে। অনুভব করলাম প্রবল উত্তেজনা। এত বড় মানুষ! মানবতার মুক্তির জন্য লড়াই ও সংগ্রামের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তার! কী কথা হবে? হোটেল শেরাটনে ম্যান্ডেলার সঙ্গে ছিলেন তার এক মেয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত। কোনো ভনিতা ছাড়াই ম্যান্ডেলা বলেন, আমার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ! মোহম্মদ জমির বলেন, মনে পড়ে যায় ১৯৭৯ সালের কথা। সে সময় আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ ডেস্কের পরিচালক। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চতুর্থ কমিটিতে বর্ণবৈষম্যমূলক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতো। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধানের দায়িত্বে থাকার সুবাদে ম্যান্ডেলার মুক্তির ব্যাপারে কথা হতো। কালো মানুষের অধিকারের জন্য দীর্ঘ এক নৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন ম্যান্ডেলা। কিন্তু কখনও নীতিবোধ থেকে বিচ্যুত হননি এক তিলও। বাংলাদেশ থেকে আমরা তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। মোহম্মদ জমির জানান, ভাবতে অবাক লাগেÑ সেই আমি বসে আছি ম্যান্ডেলার একান্ত সান্নিধ্যে। বাংলাদেশে আসার আগে থেকেই তার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। তারপরও অসুস্থ শরীর নিয়ে বাংলাদেশে আসতে কোনো দ্বিধায় ভোগেননি তিনি। জানান, স্বাধীনতার জন্য বাঙালির যে আত্মত্যাগ; তার প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশেই তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। বলেছিলেন, কিছু আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেই বাংলাদেশ পাল্টে যেতে পারে। এজন্য দরকার স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। নইলে দেশ মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ স্বচ্ছতা না থাকলে দায়বদ্ধতা থাকে না। দায়বদ্ধতা না থাকলে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। দু’দিনের সফর শেষে ম্যান্ডেলা বাংলাদেশ ছাড়েন ২৭ মার্চ।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ