Home / জাতীয় / ইতিহাসে নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক ঘটনা-আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত

ইতিহাসে নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক ঘটনা-আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত

লিশের সহযোগিতায় সুপ্রিম কোর্টে ঢুকে আইনজীবীদের ওপর সরকার সমর্থকদের সশস্ত্র হামলা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং ন্যক্কারজনক ঘটনা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে কলুষিত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তারা এ ঘটনার নিন্দা জানান। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ঢুকে আইনজীবীদের ওপর যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, ওলামা লীগ ও ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের জানাজা হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তিনি যদি হামলা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাহলে এটা দুঃখজনক। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক এবং দুঃখজনক। বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনা বিদেশি পত্রিকায় দেখতে হবে এমনটা কল্পনাও করিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্ট মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। সে জায়গাটাকে সবধরনের কলুষ ও রাজনীতিমুক্ত রাখা উচিত বলে আমি মনে করছি। এটাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা দেয়া সবার কর্তব্য। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এটাকেও কলঙ্কিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে খন্দকার মাহাবুব হোসেন বলেছেন, আপনারা আমাদের ভাই ও সন্তান। আপনারা গণতন্ত্রকে রক্ষা করুন। দেশে গৃহযুদ্ধ বাঁধলে আপনাদের আত্মীয়-স্বজনরাও ছাড় পাবে না।
গত রোববার পুলিশের সহযোগিতায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় সরকার সমর্থক নেতা-কর্মীরা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ঢুকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে তারা। ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ অংশ হিসেবে কর্মসূচি পালনে রোববার বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা তাদের বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেটে অবস্থান করতে থাকলে ওইদিন ৩টা ২০ মিনিটে এ হামলা চালায় সরকার সমর্থক সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। এ সময় তাদের হাতে লাঠি, কাঁচের বোতল ও ইট-পাটকেল ছিল। পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের হামলায় গুরুতর আহত হয় সুপ্রিম কোর্টের ১০/১২ জন আইনজীবী। হামলার সময় একজন মহিলা আইনজীবীকে পিটিয়ে বিবস্ত্র করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল ও বাড়ি ফেরার পথে মোট ১৩ জন আইনজীবীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন সোমবারও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের এপার ওপার ইট-পাটকেল ও জুতা ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটে। এবার হামলা করে মহিলা যুবলীগের কর্মীরা। তারা ফটকের বাইরে থেকে ভেতরে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করে। এই দুই ঘটনায় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। অবশ্য সোমবার ডিএমপি কমিশনার বেনজির আহমেদ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে, তাই ব্যবস্থা নিতে পুলিশের দেরি হয়েছে। যদিও রোববার ফটকের বাইরে থেকেই ভেতরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাতটি জলকামান ও সাউন্ডগ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আইনজীবীদের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তাতে সুপ্রিম কোর্টের জানাজা হয়ে গেছে। বিরোধী দলের মার্চ ফর ডেমোক্রেসি করতে দিলে কী হতো। এতে কি কোনো অপরাধ হতো। কী অদ্ভূত গণতন্ত্র। এর নামই যদি গণতন্ত্র হয় তাহলে এ গণতন্ত্র চাই না। তিনি বলেন, সবাই বলছে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে, কিন্তু আওয়ামী লীগ তার দৃঢ় সিদ্ধান্তে অটল। এটা নির্বাচনতো নয়ই। এটা সিলেকশনের চেয়েও খারাপ। তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। সরকারি পক্ষই এ জন্য দায়ী। সরকার যদি এরকম করে, আমরা কী করতে পারি। যে সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধুর কন্যা তার কাছ থেকে এমন বিষয় প্রত্যাশা করা যায় না। এটা জাতির জন্য কলঙ্ক। খুবই দুঃখের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘৫৪ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করছি। মরার আগে যদি এ বিষয়টা দেখতে হয় তার চাইতে আর কষ্টের কী হতে পারে! এটা সহ্য করার মতো না।’
এ বিষয় নিয়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘পুরো বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক। এটা দুঃখজনক একটা ঘটনা। বিদেশের কয়েকটা পত্রিকাতেও এ নিউজ দেখেছি। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনা বিদেশি পত্রিকায় দেখতে হবে এমনটা কল্পনাও করিনি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারাজীবন বারের আইনজীবীদের ঐক্যের জন্য কাজ করেছি। সে প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে যায়, তখন আর বলার কী থাকে। আমি আসলে মর্মাহত।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে যারা রাজনীতি করছেন এবং যারা এভাবে ভাঙচুর চালিয়েছেন উভয়পক্ষের নিন্দা জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্ট মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। সে জায়গাটাকে সবধরনের কলুষ ও রাজনীতিমুক্ত রাখা উচিত বলে আমি মনে করছি। এটাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা দেয়া সবার কর্তব্য। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এটাকেও কলঙ্কিত করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘কেবল সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে কেন, যে কোনো জায়গাতে আইনশৃঙ্খলা বিঘিœত করা উচিত না। আন্দোলনের নামে বাসের মধ্যে বোমা মেরে মানুষ মারা, ট্রেনে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মারা, মানুষের দুর্ভোগের চূড়ান্তে নিয়ে যাওয়া ও জীবনের নিশ্চয়তা ব্যাহত করার কোনো কাজই গ্রহণযোগ্য না। যারা এ ধরনের কর্মকা-ে লিপ্ত, তারা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। এসব দুর্বৃত্ত দেশের শত্রু।’ তিনি সুপ্রিম কোর্ট এলাকা রাজনীতিমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রোববার মার্চ ফর ডেমোক্রেসির অংশ হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিল আইনজীবীরা। এ কর্মসূচি পালনের এক পর্যায়ে সরকারদলীয় বহিরাগত সন্ত্রাসী পুলিশের সহযোগিতায় আইনজীবীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। এটা সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে থাকবে। সন্ত্রাসীরা হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে আইনজীবীদের ধাওয়া করে। প্রাণ বাঁচাতে আইনজীবীরা সমিতি ভবনে আশ্রয় নিলে সেখানেও সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত এ তা-বলীলা চললেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেননি। প্রধান বিচারপতির এ নির্লিপ্ত ভূমিকার তীব্রনিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মনে করছেন আইনজীবীদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি ঢুকে পড়ার কারণেই রোববার ও সোমবারের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। আমরা বিভিন্ন সময়ে আইনজীবীদের নানা বিষয় নিয়ে আন্দোলন করেছি। কিন্তু কখনোই এমন ঘটেনি। আমাদের কোনো আন্দোলনে দলীয় রাজনীতি ঢুকাইনি। এখন দলীয় রাজনীতি ঢুকে পড়ার কারণে সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটা খুবই অনভিপ্রেত।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম আইনজীবীদের কর্মসূচিতে বহিরাগত রাজনৈতিক নেতারা ঢুকেছে বলে অভিযোগ করলেন। আইনজীবীদের কর্মসূচির নামে রাজনৈতিক নেতার প্রবেশ করাতেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ আইনজীবী নেতা বলেন, সুপ্রিম কোর্টে বহিরাগতদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নৈরাজ্যকর তা-ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। পাশাপাশি আইনজীবীদের কর্মসূচির নামে রাজনৈতিক নেতাদের অবাধ প্রবেশ ও তৎপরতা নিন্দাজনক। এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে পালন করা হলে সুপ্রিম কোর্টে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। এতে করে সুপ্রিম কোর্টের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এর নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ