Home / ইসলাম / ইসলামে মানবাধিকার

ইসলামে মানবাধিকার

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবাধিকার পূর্ণাঙ্গ, চিরন্তন রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। দিশেহারা, অসহায় নির্যাতিত নিপীড়িত মানব জাতির মুক্তিকল্পে মুহাম্মদ (সা.) সকল মানুষকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন যা পৃথিবীতে কখনো হয়নি বা হবেও না।আল্লাহ প্রদত্ত চিরন্তন জীবন পদ্ধতি ‘ইসলাম’ মুহাম্মদ (সা.) দিশেহারা মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করেন।

ইসলামে মানবাধিকার বলতে সেই সকল অধিকারকে বুঝানো হয়, যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বান্দাদেরকে প্রদান করেছেন। এবং পৃথিবীর কোনো অপশক্তি সে সকল অধিকার কখনো রহিত করতে পারবে না। ইসলামে মানবাধিকারের ধারণা শুধু কোনো ঘোষণার মধ্যে সীমিত রাখেনি, বরং এটি প্রত্যেকটি মুসলমানের ঈমানেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মহানবী (সা.) আরবের সমাজে অরাজকতা দেখে, বাল্যকাল হতেই অত্যন্ত ব্যথিত হতেন। অন্তর্দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত আরব জাতি প্রিয় নবী (সা.)-এর বাল্যকালে মক্কার অদূরে ওকায মেলায় জুয়াখেলা, ঘোড়াদৌড় ও কাব্য প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই অন্যায় সমরের ভয়াবহতা ও বীভৎসতায় অত্যন্ত ব্যথিত বালক মুহাম্মদ (সা.) মক্কার নিঃস্বার্থ, উৎসাহী ও শান্তিপ্রিয় যুবকগণকে নিয়ে। হিলফুল ফুযুল নামে একটি শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করলেন। (হিলফুল ফুযুলের প্রতিজ্ঞার ব্যাপারে ইতিহাসে বর্ণিত আছে)

সমবেত জনগণ আল্লাহর নামে শপথ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন যে, তারা উৎপীড়িত ও অত্যাচারিতের পক্ষে সমর্থন করবেন এবং অত্যাচারির নিকট হতে লোকদের স্বত্বাধিকারী আদায় না করে ক্ষান্ত হবেন না। যতদিন সমুদ্র একটি লোম সিক্ত করার মত পানি অবশিষ্ট থাকবে ততদিন পর্যন্ত এ প্রতিজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

বিশ্বের ইতিহাসে এটাই সর্বপ্রথম সন্ত্রাস দমন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কল্যাণময়ী সেবাসংঘ। মহানবী (সা.) মানবজাতির সত্যিকারের মুক্তির লক্ষ্যে, সকল মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে যে সমস্ত মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রদান করেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিম্নে উপস্থাপন করা হল-

‘নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে প্রাণে রক্ষা করল। (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৩২)

শুধু আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগে কেন, সভ্যতার নামধারী বর্তমান বিশ্বের কোথাও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। অথচ দেড় হাজার বছর পূর্বে মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে উপরের আয়াতটি মানুষের নিকট উপস্থাপন করেন। জীবনের নিরাপত্তা তথা মর্যাদা সম্পর্কে কোরআনের সুস্পষ্ট বিধানের পাশাপাশি রাসূলে করীম (সা.)-এর অসংখ্য হাদীস রয়েছে।

বিদায় হজ্বের ভাষণে লক্ষাথিক সাহাবীর সামনে তিনি (সা.) ঘোষণা করেন, ‘হে লোকসকল। পরস্পরের জান ও সম্পদ, ইজ্জতের উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের জন্য হারাম করা হল।’

হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে হালাল উপায়ে সম্পত্তি অর্জনের নির্দেশ প্রদান করতেন। অনুরূপ সম্পদের নিরাপত্তাও প্রদান করেন। আল্লাহর বাণী তিনি (সা.) মানব জাতিকে শুনান। ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)

ইসলাম ধর্মে মানুষের জান সম্পদের নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে মানসম্মান রক্ষারও নির্দেশ দেয়। আল কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ। কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী হতে উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর কোনো নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয় উপহাসকারিণী অপেক্ষা সে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।’ (সূরা হজুরাত, আয়াত : ১১)

আল্লাহ তার বান্দাকে যে সকল স্বাধীনতা প্রদান করেছেন, রাসূলে করীম (সা.) তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেগুলোর পূর্ণ সংরক্ষণ করেছেন। যতদূর সম্ভব তিনি অপরাধীকে শাস্তি এবং তাকে সংশোধিত জীবন-যাপনের সুযোগ প্রদান করতেন।

রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, ‘অপরাধীকে ভুলবশত ক্ষমা করে দেওয়া ভুলবশত শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিযী)

মহানবী (সা.) প্রত্যেক মানুষকেই অন্যায় না করার কথা বলেছেন, পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রদান করেছেন।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানুষ যদি অত্যাচারীর জুলুম দেখেও তাকে প্রতিহত না করে তাহলে আল্লাহর ব্যাপক শাস্তি তাদের উপর নাযিল হবে।’ (আবু দাউদ, তিরমিযী)

ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্ববাসীকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেন, নিজে এর প্রয়োগ করেন। মহানবী (সা.) তার বাস্তব জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহাবাদের মতামত নিয়েছেন। যে কেউ তার (সা.) সামনে মতামত প্রদান করতে পারতেন। যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত হলে তিনি তা গ্রহণ করতেন। অযৌক্তিক বা অন্যায় মতামত হলে তিনি (সা.) উপেক্ষা করতেন। রাগ করতেন না, মতামত প্রকাশের অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করতেন না।

মহানবী (সা.) মানুষের বিবেক ও বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। স্বাধীনভাবে সকলে যার যার ধর্ম কর্ম পালন করার সুযোগ পায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে জোর নেই, সত্য পথভ্রান্ত পথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৫৬)

অধুনা বিশ্বে মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও পৃথিবীতে এই ধারণাটি সর্বপ্রথম প্রদান করেন ইসলাম। মহান স্রষ্টা আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন, ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর যেন তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১০)

মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা আদমের সন্তান, আর আদম (আ.) মাটির তৈরি। (বুখারী, মুসলিম)

নারী জাতিকে মানুষ হিসেবে মানবিক অধিকার প্রদানের পাশাপাশি তাদের নারীত্ব ও মাতৃত্বের জন্য বিশেষ অধিকার প্রদান করেন। বিদায় হজ্জের ভাষণে নবীজী (সা.) বলেছেন, ‘হে লোকসকল! নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে তোমাদের উপরও তাদেরও তেমন অধিকার রয়েছে।’

আল্লাহর রাসূল (সা.) যুদ্ধাবন্দীদের মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদেরকে মানবাধিকার প্রদান করেন। মহানবী (সা.) রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য তার অর্থনৈতিক মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। ন্যায়বিচার করার জন্য ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূলে করীম (সা.) নরহত্যার ঘৃণ্যতম কাজ চিরতরে বন্ধ করেন, আইন সমর্থিত কারণ ছাড়া কেউ অন্য কাউকে হত্যা করলে কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করেন।

বস্তুত, আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন পৃথিবীতে সভ্যতার ছোঁয়া ছিল না, সুশীল সমাজের ধারণা ছিল না, কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা ছিল না, সেই পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী (সা.) যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেন, সেই ব্যবস্থা মানব জাতির মুক্তির গ্যারান্টি।

রাসুলে মকবুল (সা.) তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাই গ্রহণ করেন। ফলে উক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণ তাদের অধিকার বুঝে পায়, পাপাচার ও দুর্নীতি বিলুপ্ত হয়, মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ