Home / ইসলাম / ইসলামের দৃষ্টিতে বিজয় দিবস

ইসলামের দৃষ্টিতে বিজয় দিবস

শিরোনাম পড়েই কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, বিজয় দিবস পালন করব, তার মধ্যেও আবার ইসলাম আছে নাকি? হ্যাঁ, পাঠকবৃন্দ- বিজয় দিবস কীভাবে উদযাপন করতে হবে তারও দিক-নির্দেশনা রয়েছে কোরআন-হাদিসে। আমরা সবাই জানি, ওংষধস রং ঃযব পড়সঢ়ষবঃব পড়ফব ড়ভ ষরভব তথা ‘ইসলাম হচ্ছে সর্বজনীন জীবন ব্যবস্থা’। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এমন কোনো বিষয় নেই যার নির্দেশনা কোরআন-হাদিসে নেই। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আল্লাহ পাকের নির্দেশনা অনুসারে আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলোর বাস্তব নমুনা পেশ করে গেছেন।
মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বর্ণিত একটি সূরা হচ্ছে, ‘আল ফাতহ’ যার অর্থ হচ্ছে- বিজয়। আরেকটি সূরার নাম হচ্ছে, ‘আন-নাসর’ যার অর্থ হচ্ছে-মুক্তি ও সাহায্য। সূরা নাসরের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিজয় উত্সব করার নিয়ম বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে। তখন মানুষদের তুমি দেখবে, তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। অতপর তুমি তোমার মালিকের প্রশংসা কর এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা কর; অবশ্যই তিনি তাওবা কবুলকারী’ (সূরা আন-নাসর:১-৩)। এই সূরায় আল্লাহ তায়ালা বিজয় অর্জনের পর আমাদের দুটি কাজ করতে বলেছেন। এক, বিজয় অর্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে তার দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করা। দুই. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আল্লাহতায়ালার এই দুটি নির্দেশনার মধ্যে অনেক তাত্পর্য নিহিত রয়েছে। মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে আমরা পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেছি। এ সময়ে বহু জানমালের ক্ষতি হয়েছে। কিছু ভাইয়ের রক্তের বিনিময় আমাদের আল্লাহতায়ালা স্বাধীন মাতৃভূমি দান করেছেন। যে দেশে আমরা বাংলা ভাষায় সবকিছু করতে পারব। আমাদের কথা বলার অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার ফিরে পাব। এ এক অপূর্ব পাওয়া। স্বাধীন হওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? এ কারণেই আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, তোমরা বিজয় লাভ করেছ, এখন তোমাদের কাজ হচ্ছে, এ বিজয়ের জন্য আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কিংবা তাসবিহ পাঠ করে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। শুধু কৃতজ্ঞতা পেশ করলেই হবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সমস্ত খুনাখুনি হয়েছে, ভুলত্রুটি হয়েছে, অন্যের অধিকার নষ্ট হয়েছে, এর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করতে হবে। আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু-মেহেরবান। তিনি ক্ষমাপ্রার্থীকে খালি হাতে ফেরত দিবেন না। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আর ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে বিজয়ী ব্যক্তিরা মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারে। বিজয়ের দিনে বাংলাদেশী ভাই-বোনদের এ দুটি কাজই করা শ্রেয়। বিজয়ের দিনে আরও একটি কাজ করা যেতে পারে। যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন সেই সমস্ত শহীদদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে মাগফিরাত ও বেহেস্তের সর্বোচ্চ মাকাম লাভের দোয়া করতে পারি। তাদের শাহাদাত থেকে আমরা নতুন করে আবারও শপথ নিতে পারি— সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা, বাতিলের কাছে মাথা নত না করার এবং অন্যের কাছে নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে না দেয়ার।
অনেকেই বিজয় উত্সব করতে গিয়ে আল্লাহকে একদম ভুলে যান। হারিয়ে যান অপসংস্কৃতির অতল গহব্বরে। যা আদৌ ইসলাম সাপোর্ট করে না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, যে আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেছেন, সেই আল্লাহ আবার আমাদের এ বিজয় কেড়ে নিতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী) তুমি বলো, হে রাজাধিরাজ (মহান আল্লাহ), তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে সাম্রাজ্য দান কর, আবার যার কাছ থেকে চাও তা কেড়েও নাও, যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত কর, যাকে ইচ্ছা তুমি অপমানিত কর; সব রকমের কল্যাণ তো তোমার হাতেই নিবদ্ধ; নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর ওপর একক ক্ষমতাবান’(সূরা আল ইমরান:২৬)।
অষ্টম হিজরিতে যখন মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয় করলেন, তখন তিনি চাইলে মক্কার শত্রুদের সবাইকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী তা করেননি। তিনি মক্কার কুরাইশদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। এ থেকেও আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য যুদ্ধাপরাধের তথাকথিত বিচার চলছে এই দেশে। অথচ শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরপরই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে রাসুলের দেখানো পথেই হেঁটেছিলেন এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, জাতিকে বিভক্ত করার নতুন খেলা শুরু হয়েছে এখন। রাসুলের শেখানো পদ্ধতি অবলম্বন করে আমরা অতীত সব ভেদাভেদ ভুলে কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়া যায় সে চিন্তা করতে পারি। নবী (সা.) ফাতহে মক্কা বা মক্কা বিজয়ের দিনে আরও একটি কাজ করেছিলেন, সেটি হচ্ছে- কাবাঘরে রক্ষিত সব মূর্তিগুলোকে ভেঙে দিয়ে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র ঘোষণা করেছিলেন। বিজয়ের এইদিনে মুসলমানদের উচিত মন মগজ থেকে খোদা বিরোধিতা সরিয়ে ফেলে তাওহীদকে প্রতিষ্ঠা করা। নাস্তিক্যবাদকে পা দিয়ে মুছে দিয়ে একাত্মবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নবী (সা.) বিজয়ের দিন শোকরিয়া স্বরূপ আট রাকাআত নামাজ আদায় করেছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে আমরাও আট রাকাআত নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করতে পারি। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের দিন। স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অটুট থাকুক চিরদিন। এ প্রত্যাশাই করছি আল্লাহর কাছে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ