Home / ফিচার / সংবাদপত্রের দিন ফুরিয়ে আসছে!

সংবাদপত্রের দিন ফুরিয়ে আসছে!

কাগজে ছাপা সংবাদপত্রের দিন বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। সংবাদ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে পত্রিকার গুরুত্ব ক্রমশ কমে আসছে। রেডিও এবং টেলিভিশন উদ্ভাবনের পর সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনেকখানি কমে যায়। নতুন যুগের তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে ছাপা সংবাপত্রের অস্তিত্ব অনেকটাই হুমকির মুখে পড়েছে।

এখন মোবাইল টেলিফোন সেট থেকেও তাতক্ষণিকভাবে তরতাজা সংবাদটি জানতে পারা যায়। পারসনাল কম্পিউটার (পিসি), ল্যাপটপ, নোট বুক, নেট বুক, ট্যাবলেট পিসি, স্মার্ট ফোন, ইত্যাদি ডিজিটাল ডিভাইস এখন অনেকেরই নাগালের মধ্যে এসে গেছে।

ইন্টারনেট, ওয়াই ফাই বা থ্রি-জি প্রযুক্তির সহায়তায় এসব ডিভাইস ব্যবহার করে এখন যে কেউ যে কোনো স্থান থেকে সংবাদ সংগ্রহ, প্রচার, জানাশোনা বা দেখার কাজটি করতে পারেন।

২৪ ঘন্টার স্যাটেলাইট টিভি, এফ এম রেডিও, পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ বা অডিও-ভিডিওযুক্ত সম্পূর্ণ অনলাইন নিউজ পোর্টাল আজকের সাংবাদিকতার দিগন্তকে বহুদূরে প্রসারিত করে দিয়েছে।

ফলে, তাতক্ষণিকভাবে যে কোনো সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে। তাই দৈনিক ছাপা পত্রিকাটিতে সে খবরটি পড়ার জন্য পরদিন সকাল পর্যন্ত আর অপেক্ষা করে থাকতে হয় না।

নতুন জামানার এ অনলাইন সাংবাদিকতা এখন বিশ্বব্যাপী প্রধান ধারায় পরিণত হয়েছে।আজকাল পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ, ই-পেপার, ই-ম্যাগাজিন বা ব্যক্তিগত ব্লগ ও ওয়েবসাইট থেকে সংবাদ পড়া-শোনা-দেখার কাজটি করে নিচ্ছেন অনেক বেশী পাঠক-দর্শক-শ্রোতা। তারা আর এখন কোনো অঞ্চল, দেশ, ধর্ম, পেশা বা বয়সের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন। তারা বিশ্ব-গ্রামের ডিজিটাল মানুষ।

নতুন চ্যালেঞ্জ

সাংবাদিকতার ভূবনে অনলাইন জার্নালিম নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এটা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নতুন চালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে।

এরইমধ্যে নিউজ রুমগুলো কর্পোরেট হাউজ বা টাকাওয়ালাদের আড্ডার ড্রয়িং রুম বা বিনোদনের হেরেমখানায় পরিণত হয়েছে। আবার যে কেউ সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয় শিক্ষা ছাড়াই ঘরে বসে একখানা কম্পিউটার নিয়ে অনলাইন খুলে ফেলেছেন। ফলে সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বা নীতি-নৈতিকতা অনেকখানিই বিসর্জন হয়ে গেছে।

অনলাইন সাংবাদিকতার যুগে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনার কাজটি আরো প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কে কার আগে সংবাদটি ধরতে পারেন বা ধরাতে পারেন তা নিয়ে সব সময় তড়িঘড়ি ব্যস্ততা। দিন-রাত ২৪ ঘন্টা ও সপ্তাহে সাত দিন এরকম ২৪/৭ মাপে সংবাদ প্রচার করতে গিয়ে সময়ের সঙ্গে পাল্ল দিতে হচ্ছে সাংবাদিককে। এ অবস্থায় সংবাদের মানের ক্ষেত্রে আপোষ করা ছাড়া উপায় থাকে না।

ওদিকে পাঠক-দর্শক-শ্রোতার মাঝে সংবাদের জন্য আগ্রহ যেমন বেড়েছে তেমনি সংবাদের যথার্থতা নিয়েও কৌতুহল বেড়ে গেছে। আগে গণমাধ্যমে একটা খবর প্রকাশ পেলে পাঠক-দর্শক-শ্রোতা তাকে সহজেই সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিল। এখন তারা সংবাদটির বস্তুনিষ্ঠতা ও যথার্থতা যাচাই বাছাই করে নিতে চায়। কারণ, তারা দেখছেন একই ঘটনার রিপোর্ট এক এক মিডিয়াতে এক এক রকম করে প্রকাশ করা হচ্ছে।

ইন্টারনেট প্রোটোকলের মাধ্যমে বিশ্বের সব কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে যে কোনো উন্মুক্ত ভান্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে বা নিজের লেখায় সেটা ব্যবহার করতে পারছেন যে কেউই। সে তথ্য ব্যাক্তিগত ব্লগ বা অনলাইন মিডিয়াতে ছড়িয়ে দিতেও পারেন যে কেউ। ফলে তথ্যের ওপর এখন আর কারো একচ্ছত্র কতৃত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

তথ্য প্রবাহের এ অবাধ সুযোগে এখন যে কেউই যেমন খুশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন আবার যেমন খুশি মতামত ছড়িয়ে দিতেও পারছেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনলাইন ব্যবহারকারীরা একে অপরের সঙ্গে মতামত বিনিময় করতে পারছেন।

এদিকে, ছাপা পত্রিকা, রেডিও বা টিভির পাঠক-শ্রোতা-দর্শক এখন তাদের পছন্দের ভিত্তিতে নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এদের ধরে রাখার জন্য অনলাইন মিডিয়াতে টেক্সট, অডিও বা ভিডিও মাধ্যমে খবর পরিবেশনার পাশাপাশি পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের জন্য মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় অনলাইন মিডিয়াগুলো মুক্ত মাধ্যম হিসেবে জনসাধারণের মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে গণন্ত্রকেই বরং এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে। সেকারণে এখন কোনো স্বৈরশাসকের পক্ষেই খবরকে নিষিদ্ধ করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

ওদিকে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-টুইটার, ফেসবুক, গ্রুপ – ইমেইল ও ব্লগে পছন্দসই বা প্রয়োজন উপযোগী খবর- মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এ যেন তথ্যের এক উন্মুক্ত জলাশয় যেখান থেকে যে কেউ তার সুবিধামত সেচের জল নিচ্ছেন, সেখানে মাছ ধরছেন বা ময়লা পরিষ্কার করছেন। আবার কেউ সুবিধামত ময়লা আবর্জনা ঢালছেনও।

আগামীর সাংবাদিকতা

নিউজোনোমিকস অনলাইন ম্যাগাজিনের একজন নিয়মিত লেখক কেন ডকটর (Ken Doctor) তার সাম্প্রতিক এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ছাপা পত্রিকার গুরুত্ব হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আয় রোজগারেও টান পড়তে শুরু করেছে। বিজ্ঞাপন দাতারা এখন বিগত দিনের মিডিয়ার চেয়ে আগামি দিনের মিডিয়ার দিকেই ঝুঁকছেন বেশী করে।

তাছাড়া, ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারাও অনলাইন মাধ্যমে কম খরচে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারছেন। মোবাইল ডিভাইসের কল্যাণে এসব বিজ্ঞাপন অনেক বেশী মানুষের নজরে পড়ছে বলেও কেন ডকটর উল্লেখ করেছেন।

তিনি ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক হিসাব থেকে দেখিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ সময় ব্যয় করেন তাদের স্মার্ট ফোন বা ট্যাবলেট পিসি’র অনলাইনে।

বিখ্যাত আমাজন প্রকাশনী সংস্থার ছাপা বইয়ের তুলনায় চারগুণ বেশী বিক্রি হচ্ছে তাদের ইলেক্ট্রনিক বই বা ই-বুক। কেন ডকটর জানিয়েছেন, অনলাইনে ভিডিও দেখার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৬০০ গুণ। অর্থাৎ, গড়ে মাসে প্রত্যেকে ২২ ঘন্টা ভিডিও দেখছেন। দেখা যাচ্ছে, অনলাইন পত্রিকার মতোই ই-বুক, অনলাইন ভিডিও বা অনলাইন মিউজিক বিক্রিও বাড়ছে।

কেন ডকটর আরও উল্লেখ করেছেন, ২০১২ সালে মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে শতকরা ২৫ ভাগ সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে তা বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

অনলাইনে বিবিসি’র সংবাদ পারিবেশনের এক হিসাব থেকে দেখা গেছে, গত জুন মাস পর্যন্ত ডেস্কটপ কম্পিউটারে সংবাদ বেশী পড়া হতো। কিন্তু জুনের পর থেকে ডেস্কটপকে ছাড়িয়ে গেছে মোবাইল ডিভাইস।

এ অবস্থায় খবরের বাজার চাহিদা বেড়ে গেছে এবং খবর বিক্রেতাদের ব্যবসার সুযোগও বেড়ে গেছে। তাই সাংবাদিকদের কাছ থেকে তার মিডিয়া কর্তৃপক্ষ আরো দ্রুত ও লাগসই খবর পেতে চায়।

অনলাইন সাংবাদিকতার এ যুগে অনেক পত্রিকা প্রতিষ্ঠান তার রিপোর্টারদের অডিও বা ভিডিও বার্তা সংগ্রহ করতে উতসাহিত করছে। আবার তাতক্ষণিকতার প্রয়োজনে অডিও-ভিজুয়াল মিডিয়ার সাংবাদিকদের চটজলদি কিছু একটা খবরের ভগ্নাংশ নিউজরুমে পাঠাতে বলছে। এ রকম খবরের একটা তাতক্ষণিক চমক থাকলেও ঘটনার সমাপ্তিতে দেখা গেল এটাতো তেমন কোন খবরই হলো না।

একজন সাংবাদিক কোনো একটি ঘটনার খবর পাওয়ার আগেই ঘটনাস্থলে বা কাছাকাছি অবস্থানকারী অন্যরা তা প্রত্যক্ষ করতে পারেন। তাদের কেউ একজন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘটনার ছবি তুলতে পারেন, ভিডিও করতে পারেন, ভয়েস রেকর্ড করতে পারেন। সেটা আবার কেউ তাদের নিজস্ব ফেসবুক বা ব্লগে প্রকাশ করেও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে সাংবাদিক সেকেন্ডারি সোর্স থেকে সহায়তা নিয়ে ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যমে পরিবেশন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে এ রকম ব্যক্তিগতভাবে সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদের তথ্য চিত্র, ভিডিও বা অডিও রেকর্ড বড় কোন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়ে বিপুল দর্শক-শ্রোতার জন্য পরিবেশন করতে পারে।

অনলাইন সাংবাদিকতার এ যুগে একজন সাংবাদিককে সারাক্ষণই চোখ-কান খোলা রাখতে হয়, যখন তখন ই-মেইল, ফেসবুক- টুইটারে চোখ বুলাতে হয়। স্কাইপিতে কল শুনতে কান পেতে রাখতে হয়। মোবাইল ফোন অন রেখেই ঘুমাতে যেতে হয়। এমনকি সাংবাদিককে ভিনদেশের ভাষা রপ্ত করতে হয়, নিত্য নতুন প্রযুক্তিও আয়ত্ব করতে হয়।

সাংবাদিকের যখন এরকম ত্রাহি মধুসূধন অবস্থা তখন পাঠক-শ্রোতা-দর্শক কী করবেন? একদিন পর পর ছাপা একখানা পত্রিকার জন্য ২৪ ঘন্টা অপেক্ষা করবেন? নাকি টিভি-রেডিওতে ঘন্টা বাধা বুলেটিনের জন্য ঘড়ি দেখবেন?

মোবাইল প্রযুক্তি এখন যাদের হাতের নাগালে, তাদের জন্য তাতক্ষণিকভাবে খবর জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে নানা ডিজিটাল ডিভাইস বাজারে আসছে, অন্যদিকে তা সহজলভ্যও হয়ে পড়েছে। আর এ রকম ডিজিটাল নাগরিকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তারাও খবর গিলছেন গোগ্রাসে। সবার আগে সর্বশেষ খবর তারাই পাচ্ছেন।

তাই, নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে এখন নাগরিকরা সংবাদের ব্যাপারে আগের চেয়ে বেশী প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। এখন তাদের উপযোগী মাধ্যমে খবর পরিবেশন করতে হচ্ছে। এ ছাড়াও তারাও অনেক খবর তৈরি করতে পারছেন নতুন প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে।

ফলে সংবাদ সংগ্রহ এবং পরবেশনার কাজটি আর সাংবাদিকদের একচেটিয়া করায়ত্বে নেই। আজকের ডিজিটাল পরিস্থিতিতে খবর প্রচণ্ড গতি পেয়েছে; ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। এখন সংবাদ পাওয়া যায় সর্বক্ষণ, যেখানে-সেখানে; বসে, দাড়িয়ে, শুয়ে বা পথ চলতে চলতে। সংবাদের এরকম সর্বব্যাপী অগ্রযাত্রায় ছাপা পত্রিকাটির দিন ফুরিয়ে আসছে বলে গণমাধ্যম গুরুরা যথার্থই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, অনলাইনওয়ালারা পরিবেশবাদীদের সুরে প্রচারণা চালাচ্ছেন যে, পত্রিকা পড়া মানে বেশী বেশী গাছ ধ্বংস করা। পত্রিকার বিরুদ্ধে এমন আগ্রাসী প্রচারণা কাগজে ছাপা সংবাদপত্রকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।#

লেখক: বিশিষ্ট সাংবদিক, কলামিস্ট ও বিশেষ প্রতিনিধি, রেডিও তেহরান, ঢাকা।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ