Home / ফিচার / পীর সাহেবের নসিহত ও একটি ইরানি গল্প

পীর সাহেবের নসিহত ও একটি ইরানি গল্প

মহিউদ্দিন খান মোহন
অনেকেই বলে থাকেন যে, বাংলাদেশে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও পরামর্শকের অভাব নেই। আপনি হাত বাড়ালেই তাদেরকে পাবেন। পাশাপাশি দালালের অভাবও নেই বাংলাদেশে। জমির দালাল, গরু-খাসির দালাল, দেহ ব্যবসার দালাল, বিদেশি শক্তির দালাল, স্বৈরশাসকের দালাল ইত্যাদিতে ভর্তি বাংলাদেশ। এসব দালাল সময়-সুযোগ মতো নিজেদের কাজটা আদায় করে নেয়। কখনও বা এক ব্যবসায় সুবিধা করতে না পারলে ভিন্ন সেক্টরে দালালির চেষ্টা করে। তবে যেখানেই তারা অবস্থান করুক, তাদের দালাল চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। আবার প্রভু বদল করতেও এদের জুড়ি নেই। যখন যাকে দিয়ে সুবিধা তার দালালি করেই বেঁচেবর্তে থাকার চেষ্টা করে।
এ দালালির বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সব সময় দৃশ্যমান। সমাজের কিছু মানুষ আছে, যারা নিজেদেরকে নিরপেক্ষ বলে প্রচার করে একটা আলাদা অবস্থান তৈরি করতে চায়। পরিণত হতে চায় ‘বিশিষ্টজনে’। এ লক্ষ্যে তারা কিছুটা, ‘অভিনব’ কিছুটা ‘চমকপ্রদ’ কথা বলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বিফল হয় না। দালালি করে বেশ আয়েশেই থাকে।
‘পীর’ পদবিটি আমাদের সমাজে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং ভক্তিযোগ্য বলে বিবেচিত। ‘পীর’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘চুল-দাড়ি’ সমৃদ্ধ জোব্বা-জাব্বা পরিহিত একজন বয়স্ক মানুষের ছবি। যার চারপাশে ভিড় করে থাকে অগণিত মুরিদান। কেউ তার লম্বা বাবড়ি আঁচড়ে দেয়, কেউ হাতে পায়ে মালিশ করে তেল। আবার কেউ অবিভক্তিবশত পৌষ মাসেও হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে পীরকে শান্তি দেয়ার জন্য।
আমাদের দেশে বর্তমানে যেসব পীর-দরবেশ আছেন, তাদের কারও প্রতিই আমার তেমন কোনো আকর্ষণ নেই। কেন নেই তা একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। পীর নামধারী দু’চারজনের কাছাকাছি গিয়ে যে ছবি দেখেছি, তাতে দ্বিতীয়বার ওমুখো হতে মন চায়নি। কথা-কাজ, কিংবা নসিহত-জীবন-যাপন কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। আশির দশকের শেষদিকে আমাকে একজন পীরের মুরিদ বানানোর বহু চেষ্টা আমার পরিচিত একজন করেছিলেন। তার আস্তানায় নিয়েও গিয়েছিলেন কয়েকবার। আমি কবুল করিনি। বলেছি লোকটা ধান্ধাবাজ। তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন আমার ওপর। পরবর্তীতে ওই পীর সাহেবের বাহিনীর সঙ্গে পুলিশের দু’দিনব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ হয়েছিল কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায়। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছিলেন পীর সাহেব। তারপর তার নেপথ্যের অনেক ঘটনাই বেরিয়ে এসেছিলো পত্রপত্রিকায়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওই পীরের নাম-টাম এখন আর শোনা যায় না।
তবে আমার লেখার আজকের বিষয়বস্তু আধ্যাত্মিক পীর নয়। পীর প্রসঙ্গ আসাতে অতীতের কথাগুলো বলে ফেললাম। আধ্যাত্মিক লাইনে সাচ্চা ও হাক্কানি পীরের পাশাপাশি যেমন ভণ্ড-লুচ্চা পীরের অভাব নেই। তেমনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কতিপয় মানুষকে ‘পীর’ সাজার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তারা কাজকর্ম কথাবার্তায় এমন ভাব ফুটিয়ে তুলতে চান যে, তারা অত্যন্ত জ্ঞানী।
যা হোক, সাম্প্রতিককালে আমাদের সাংবাদিকতার অঙ্গনে একজন ‘পীরে’র আগমন ঘটেছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি এখানে সেখানে কাজকর্ম করে আসছেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এ পীর মহোদয় ভাবটা ধরেন নিরপেক্ষতার, কিন্তু বিশেষ চেতনার ফেরিওয়ালা সেজে এদেশে আধিপত্যবাদী শক্তির এজেন্টদের পক্ষেই কলম ধরেন। টিভি টকশোগুলোতেও তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। লেখা-কিংবা বলায় তিনি দেশের জাতীয়তাবাদী পক্ষকে কুপোকাত করার চেষ্টা যেমন করেন, তেমনি তার সমর্থিত দলটির প্রতি অগাধ প্রেমটাকেও লুকিয়ে রাখতে পারেন না।
দেশে যখন জরুরি সরকারের জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল, গণতন্ত্রবিহীন বাংলাদেশে যখন মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দিনাতিপাত করছিল, তখন আলোচ্য পীর মহোদয়কে দেখা গেছে ফখরুদ্দিন-মইন উ’র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তথ্য দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। সে সময় দেশের একটি বৃহত্ শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত থাকলেও ভিন্ন একটি দৈনিকে বিশেষ নিবন্ধ লিখে অনেকেরই দৃষ্ট কেড়েছিলেন। সে সময়ের জরুরি সরকারের ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলাকে সমর্থন জানিয়ে পীর সাহেব ঢাকার মৌচাক এলাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে ‘যদি রাজদণ্ড দাও আমাকে পূর্ণিমা রাতে দিও, দুই নেত্রী অবসর নিলে হাওড় দেখাতে নেব’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছিলেন (২৭ মে. ২০০৮)। তার ওই নিবন্ধের পুরোটাই ছিল বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার নসিহতে পরিপূর্ণ। এমনকি তারা দু’জন ‘বিদায়’ হওয়ার পর তাদের পরিবারের কেউ যাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে না আসতে পারে তারও আকুতি ছিল ওই লেখায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পীর সাহেব লিখেছিলেন, স্বৈরশাসক এরশাদ নাকি তাকে চিঠি লিখেছিলেন। আর সেজন্য ওই রচনায় তিনি এরশাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন।
পীর সাহেব তার রচনায় একস্থানে লিখেছিলেন, ‘দুই নেত্রী যদি জনগণের কাছে তাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা স্বীকার করে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেন, আমি অতি সাধারণ সংবাদকর্মী হয়ে আমার সকল উষ্ণ ভালোবাসা দিয়ে অভিনন্দন জানাব।’ পীর সাহেবের সে আশা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রয়োজনের অপরিহার্যতার কারণেই দুই শীর্ষ নেত্রী পুনরায় নেতৃত্বে ফিরে এসেছেন। ২০০৭-০৮ এ তাদেরকে এদেশের রাজনীতি থেকে বিতাড়নের যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল তা ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতা দখলকারী মইন উ গং এবং তাদের তল্পিবাহক কতিপয় রাজনীতিক, পেশাজীবীর প্রাণান্ত অপ-প্রয়াস সত্ত্বেও এদেশের জনগণ বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে রেখেছেন। তাদের ক্রিয়া-কাণ্ড সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে, বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তাদের বিকল্প যে এখনো এদেশে তৈরি হয়নি, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। আর সে জন্যই পীর সাহেবের যেমন দু’নেত্রীকে উষ্ণ ভালোবাসার অভিনন্দন জানানোর সুযোগ হয়নি। তেমনি তাদেরকে জ্যোত্স্না রাতে সুনামগঞ্জের হাওড় দেখাতে নিয়ে যাবার খায়েশও তার পূর্ণ হয়নি।
পীর সাহেবের ওই রচনার প্রসঙ্গ টেনে ওই সময় আমি দৈনিক দিনকালে ‘পীর সাহেবের আজব প্রস্তাব’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। নিবন্ধটির একেবারে শেষ প্রান্তে মন্তব্য ছিল—‘আর লম্বা করতে চাই না। শুধু বলতে চাই, সুযোগ পেয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন, লিখছেন। বাতাস ঘুরে গেলে তারাও যে কথা-সুর পাল্টাবেন এটাও ঠিক। তখন হয়তো আলোচ্য পীর সাহেব তার প্রস্তাব উল্টে দিয়ে বলবেন—বাংলাদেশের জন্য দু’নেত্রীর নেতৃত্ব অপরিহার্য। তখন হয়তো তিনি আরেকজনকে তার আদর্শ পিতা হিসেবে জাহির করবেন। ধান্ধাবাজ আর মতলববাজরা সব সময় এটাই করে থাকে। (দৈনিক দিনকাল, ১৮ জুন ২০০৮)
অতি সম্প্রতি সে পীর সাহেব বিএনপির প্রতি নবতর এক নসিহত করেছেন। গত ১৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় ‘বিএনপিকে জামায়াত ছেড়ে আসতেই হবে’ শিরোনামে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি বিএনপি’র ভালোর জন্য এই বলে উপদেশ দিয়েছেন যে, দলটিকে জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে দিতে হবে। দীর্ঘ ওই পরামর্শপত্রে পীর সাহেব বলতে চেয়েছেন বিএনপি জামায়তকে সঙ্গে নিয়ে মহা ভুল করে ফেলেছে, তারা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। আর এ অন্ধকার পথ থেকে এ মুহূর্তে বিএনপি বেরিয়ে না এলে দেশের শাসন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য দুঃসংবাদ। ‘……. দেশ, মানুষ ও গণতন্ত্রের কল্যাণে বিএনপিকে ফিরে আসতেই হবে। সন্ত্রাসবাদী জামায়াত-শিবিরের সঙ্গ এ মুহূর্তে ছাড়তেই হবে।’
বিজ্ঞ এ পরামর্শকের অতীব মূল্যবান পরামর্শ বিএনপি কতটা কানে তুলবে তা আমাদের জানার কথা না। আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে। প্রথমত পীর সাহেব জামায়াতকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠন বলেছেন যা তার অপরিপকস্ফ মগজ এবং মতলবি চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। কেননা, যেসব কার্যাবলী সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচিত এবং যে ধরনের সংগঠন সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত, জামায়াত তার কতটা অবলম্বন করেছে তা অবশ্যই বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে।
সন্ত্রাসবাদ একটি আপেক্ষিক শব্দ। এটা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রশক্তিসমূহ সুবিধামতো ব্যবহার করে থাকে। উপ-মহাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে উজ্জীবিত ও জীবন দিতে প্রস্তুত ক্ষুদিরাম, মাষ্টার দা সূর্যসেন বা তিতুমীরকেও ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। অথচ তারা আমাদের কাছে বীরত্বের প্রতিচ্ছবি, স্বাধীনতার সংগ্রামী পূর্বপুরুষ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বলতো ‘দুষ্কৃতকারী’। আবার স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের সরকার বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মীদের দুষ্কৃতকারী-সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। সুতরাং এটা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, কায়েমী স্বার্থবাদীরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্তদেরকে দুষ্কৃতকারী-সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামী এখন যে রাজনীতি করছে, তা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি নয়। তবে, এটা সত্যি যে, সরকারের দমননীতির কারণে তাদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচিগুলো প্রায় সময়ই সহিংস হয়ে উঠছে; যা কারোই কাম্য নয়।
এখন দেখা যাক পীর সাহেব কেন বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার নসিহত করলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী ২০০০ সাল থেকে। ২০১২ তে এসে তা ১৮ দলে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক জোট যখন হয়, তখন সংশ্লিষ্ট দলগুলো নিজেদের লাভ-লোকসান হিসাব করেই জোট বাঁধে। বিএনপিও নিশ্চয়ই তা করেছে। কিন্তু ঘটনাটা অন্য জায়গায়। আওয়ামী অন্তপ্রাণ পীর সাহেবরা বিএনপির ‘ভালোর’ জন্য এতটা উদগ্রীব হয়ে উঠলেন কেন? বিএনপি যদি জামায়াতের হাত ধরে ‘অন্ধকারে’ তলিয়েই যায়, তাতে পীর সাহেবের তো কষ্ট পাবার কথা নয়। বরং তার প্রিয় আওয়ামী লীগের পথ আলোয় উদ্ভাসিত পরিষ্কার হয়ে যাবার আনন্দে তার ঢোল বাজানোর কথা! কিন্তু উল্টোটা ঘটতে দেখে সন্দেহপ্রবণ মানুষদের মনটা খচমচ করছে। তারা বলছেন যে, এদেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনৈতিক শক্তিসমূহের ঐক্য আধিপত্যবাদী বহিঃশক্তি ও তাদের এদেশি এজেন্টদের কাছে ভয়ঙ্কর অশনি সঙ্কেত হিসেবেই বিবেচিত। সে ঐক্য বিনষ্ট করে ফায়দা লুটতে আধিপত্যবাদী শক্তির দালাল তথ্য দালালরা যে নানা রকম ফন্দি-ফিকির আঁটবে, ওয়াজ-নসিহত করবে তাতে আর বিচিত্র কি।
কিন্তু এ জামায়াতে ইসলামীকে বগলদাবা করে ১৯৯৫-৯৬ সময়ে আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল, তখন এসব ‘পীর-আউলিয়াদের’ কোনো উপদেশ শোনা যায়নি। কেন, তখন জামায়াতে ইসলামীর শরীরে কি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদে’র দুর্গন্ধের(?) পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির সুগন্ধ বেরুচ্ছিল? পীর সাহেব তো তখনও সংবাদপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। কই, তখনতো তাকে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার উদ্দেশে উপদেশ খয়রাত করতে। ‘জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ুন, ওরা সন্ত্রাসবাদী, যুদ্ধাপরাধী!’
প্রকৃতপক্ষে সবই হলো মতলববাজী আর ধান্ধাবাজী। নিজেকে আমি কখনোই নিরপেক্ষ সাংবাদিক বা লেখক বলে পরিচয় দেই না। কারণ আমি একটি রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাস করি। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমার আদর্শ। কিন্তু যখন দেখি ‘নিরপেক্ষতা’র নেকাব পরে কেউ কেউ দলবাজি করছে তখন নিজে নিজেই লজ্জা পাই। এসব হিপোক্রেসির কোনো অর্থ আছে বলে মনে হয় না। নাচতে নেমে ঘোমটা দিয়ে লাভ কি?
বিএনপির জন্য পীর সাহেবের দরদ উথলে উঠতে দেখে অতি সম্প্রতি পড়া একটি ইরানি গল্পের কথা মনে পড়ছে। ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলরের দফতর কর্তৃক প্রকাশিত নিউজ লেটার-এর সেপ্টেম্বর ২০১৩ সংখ্যায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে। ‘মাহদী আযার ইয়াযদী’র লেখা ‘গাধার আরোহী শিয়াল’ শিরোনামে গল্পটির সারমর্ম হলো—রোজ রাতে এক শিয়াল কৃষকের আঙুর বাগানে ঢুকে পাকা আঙুর খেত, আর কাঁচা আঙুর নষ্ট করতো। অনেকদিন চেষ্টার পর আঙুর বাগানের মালিক ফাঁদ পেতে শিয়ালটিকে ধরে রামধোলাই দিল। আহত শিয়াল জঙ্গলে গিয়ে নেকড়ের সাহায্য-সহযোগিতা চাইল বাগান মালিককে শায়েস্তা করার জন্য। নেকড়ে শিয়ালকে সহযোগিতার আশ্বাস দিল, তবে তার আগে খাবারের ব্যবস্থা করতে বলল। শিয়াল তখন বলল—বাগান মালিকের গাধাটাকে এখানে ধরে আনতে পারলে কয়েকদিন দু’জনে পেটপুরে খাওয়া যাবে। শিয়াল গাধার কাছে গেল। সে গাধাকে বুঝালো গেরস্থের বাড়িতে বন্দি না থেকে বনের মধ্যে অবারিত সবুজে বাস করাই ভালো। কত খাবার, কী মুক্ত পরিবেশ! বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্রণার পর গাধা রাজি হলো। শিয়াল গাধাকে নিয়ে রওয়ানা হলো। কিছুদূর এসে শিয়াল ল্যাংড়াতে শুরু করল। বললো, সে খুব অসুস্থ হাঁটতে পারছে না। তাই সে গাধার পিঠে চড়ে বনে যেতে চায়। গাধা শিয়ালকে পিঠে নিলো। জঙ্গলের কাছাকাছি আসতেই গাধা গাছের আড়ালে লুকানো নেকড়েকে দেখতে পেলো। সে ঘটনা বুঝে ফেলল। শিয়ালকে বললো, আমি একটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ফেলে এসেছি যার মধ্যে চারটি উপদেশ রয়েছে ওটা এখনই আনতে হবে। গাধা আবার লোকালয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
লোকালয়ে এসে শিয়াল জিজ্ঞেস করলো, চারটি উপদেশ কি কি? গাধা বললো—এক নম্বর হলো উপদেশনামাটি সব সময় সঙ্গে রাখতে হবে। দুই নম্বর হলো, ‘জীবনের সকল মন্দের চেয়েও অধিক মন্দ আছে। যখন তুমি কোনো খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকো, তখন সতর্ক থাকবে এর চেয়েও খারাপ অবস্থার মধ্যে যেন পতিত না হও।’ তৃতীয় উপদেশ হলো, ‘যদি জ্ঞানী বন্ধু খুঁজে না পাও, তাহলে জানবে বোকা বন্ধুর চেয়ে জ্ঞানী শত্রুও উত্তম। কেননা, বুদ্ধিমান শত্রু সমালোচনার মাধ্যমে তোমার ভুলগুলো শুধরে দেবে। যেহেতু বোকা বন্ধু খারাপ-ভালো কিছুই বোঝে না, সে কীভাবে তোমার উপকারে আসবে?’
চতুর্থ উপদেশ হলো, ‘শিয়াল ও নেকড়ের প্রতিবেশী হওয়া থেকে বিরত থাকা। কেউ নেকড়ের কাছে ‘ইনসাফ’ আর শিয়ালের কাছে ‘বিশ্বস্ততা’ দেখেনি।’
গল্পটি এখানে কতটা প্রাসঙ্গিক হলো জানি না। তবে, গল্পের শিয়ালের মতো পীর সাহেবরা কথার জাদুতে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিএনপিকে কোন জঙ্গলের কোন নেকড়ের কাছে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন সেটাই এখন ভাববার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
mohon91@yahoo.com

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ