Home / ফিচার / শীর্ষ দশ অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকায় বাংলাদেশের মুসা বিন শামসের

শীর্ষ দশ অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকায় বাংলাদেশের মুসা বিন শামসের

অস্ত্র শিল্প বর্তমান বিশ্বের একটি আলোচিত বিষয়। বন্দুক, গুলি ও আরো আনেক ভারি অস্ত্র এ ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যবসায় প্রচুর পরিমাণে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলে। প্রচুর টাকার লেনদেন হয় এ ব্যবসায়। পৃথিবীতে অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে কুখ্যাত কিছু ব্যাক্তি। কর্তৃপক্ষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিংবা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে পেছনে ফেলে তারা তাদের রাজত্ব বিস্তার করেছে পৃথিবী জুড়ে। এ তালিকায় আছে বাংলাদেশী অস্ত্র ব্যাবসায়ী ড. মুসা বিন শামসের। সাংঘাতিক এ মানুষগুলোর সম্পর্কে নিচে বর্ণনা করা হল।

১০। আদনান খাশোগি

আদনান খাশোগি সৌদি আরবের একজন সফল ব্যবসায়ী। একই সাথে তিনি একজন বিখ্যাত অস্ত্র ব্যবসায়ী। খাশোগি লেখাপড়া করেন আমেরিকায়। ১৯৮০ সালে পৃথিবীর সেরা ধনীদের তালিকায় স্থান পায় খাশোগি। বর্তমানে তার বয়স ৭৬ বছর। ১৯৬০ সালে খাশোগি অস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে ইরাক-কন্ট্রা ঘটনার সময় তিনি গ্রেফতার হোন( ফিলিপাইনের নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট ফারদিনেন্দ এর স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসের সাথে)। কিন্তু দুই বছর তিনি ছাড়া পেয়ে যান। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের ঠিক পূর্বে খাশোগি আমেরিকার রাজনৈতিক উপদেষ্টা রিচার্ড পার্ল এর সাথে দেখা করেন। সম্ভবত ইরাক আক্রমণের সময় আমেরিকাকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল আদনান খাশোগি। বর্তমানে আদনান খাশোগি মোনাকোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

৯। ডেল স্টোফেল

ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি শক্তিকে পুনরজ্জীবিত করার জন্য অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিল ডেল স্টোফেল। তখনই পুরো বিশ্বে তিনি পরিচিতি পান। মুখে সিগারেট আর কাঁধে অস্ত্র হাতেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত ডেল স্টোফেল। “ভাড়াটে সৈনিক” হিসেবেও তার পরিচিতি আছে। ২০০৩ সালে ইরাকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের সাথে স্টোফেলের প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াই ওয়াক টেকনোলজি’ এর ৪০মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি হয়। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে টাকা পরিশোধে ইরাক সরকারের অনিয়ম নিয়ে স্টোফেল এক বেপরোয়া বক্তব্য দেন। মৃত্যুর আগে স্টোফেলকে ২৪.৭মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়। তার স্ত্রী বারবারা ২০০৯সালে ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে ২৫মিলিয়ন ডলারের মামলা করেন। ২০০৪ সালে বাগদাদ যাওয়ার পথে ডেল স্টোফেলকে হত্যা করা হয়।

৮। ড. মুসা বিন শামসের
ড. শামসের বিন মুসা একজন বাংলাদেশি পুঁজিপতি। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সেরাদের একজন ছিলেন শামসের বিন মুসা। সাউথ এশিয়ান প্রেস মুসা বিন শামসেরকে ‘প্রিন্স’ উপাধিতে ভূষিত করে। পৃথিবীর বড় বড় সব অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছিল শামসের, যার প্রমাণ পাওয়া যায় সুইস ব্যাংকে তার রাখা ৭মিলিয়ন ফ্রোজেন অর্থ থেকে। শামসের বিন মুসার প্রতিষ্ঠান “ড্যাটকো” পৃথিবীব্যাপী ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, যুদ্ধ বিমান ও মিসাইলের ব্যবসা করে যাচ্ছে। শামসের সবসময় একশত গাড়ি বহর নিয়ে চলাচল করেন যেগুলোর মডেল হল রোল-রয়েস ও লিমোজিন্স। শামসের হীরার জুতা পড়েন যার বাজার মূল্য ৩মিলিয়ন ডলার।

উল্লেখ্য, মুসা বিন শমসরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিমের বেয়াই। সম্প্রতি যার পুত্র ববি হাজ্জাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছেন।

৭। স্যামুয়েল ক্যুমিংস

স্যামুয়েল ক্যুমিংস একজন আমেরিকান অস্ত্র ব্যবসায়ী। তিনি “ইন্টারন্যশনাল আর্মামেন্ট কর্পোরেশন” এর প্রতিষ্ঠাতা। বেসরকারী অস্ত্র বাজার এককভাবে দখল করে আছে এ প্রতিষ্ঠান। ১৯৫০ সালে স্যামুয়েল একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে সিআইএ তে যোগ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে সিআইএ এর হয়ে প্রচুর অস্ত্র কেনার ফলে অস্ত্রের বাজার সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা লাভ করতে থাকে স্যামুয়েল। ১৯৫০-৬০ এ সময়ে তিনি তার প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেন। প্রথমে ছোট বাজার দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয় এবং পরে পুরো পৃথিবীতে প্রসার লাভ করেন। পৃথিবীর অনেক জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক নেতার সাথে তিনি লেনদেন করেছেন। এ কাতারে আছেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো, জেনারেল রাফায়েল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। ১৯৯৮ সালে ৭১বছর বয়সে স্ট্রোক করে মারা যান স্যামুয়েল ক্যুমিংস।

৬। ফারেস মানা’আ

ইয়েমেনের অপরিচিত অস্ত্র ব্যবসায়ী শেখ ফারেস মোহাম্মদ মানা’আ। তিনি ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাংশের শহর সা’দাহ এর গভর্নর। গভর্নর হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তদন্ত অনুযায়ী তিনি একজন রাঙ্কিংধারী অস্ত্র ব্যবসায়ী, যদিও লোকমুখে তার নাম খুব একটা শোনা যায় না। সোমালিয়ার বিদ্রোহী হারাকাত আল শাবাব মুজাহেদীন(আল কায়েদার সাথে যার যোগাযোগ আছে বলে অনুমান করা হয়)-এর সাথে মানা’আ এর কারবার জড়িত। লিবিয়ার নিহত প্রেসডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফির জন্য গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করেছিলেন মানা’আ। ২০১১সালে সা’দাহ শহরের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মাধ্যমে মানা’আ নতুন গভর্নর হিসেবে ক্ষমতা হরণ করে।
৫। সার্কিস সোঘানালিয়ান

ফ্লোরিডার এ অস্ত্র ব্যবসায়ী ৫অক্টোবর ২০১৩ এ মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুর সাথে সাথে অন্যরকম একজন মানুষের যবনিকাপাত হয়। তার জন্ম ১৯২৯ সালে। তার ছদ্মনাম ছিলো “মৃত্যুর বণিক”। সার্কিস মূলত প্রতিষ্ঠা লাভ করেন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে, যখন প্রচুর পরিমাণে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিরাজ করছিল। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের যোগান দেয় সার্কিস। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় সিআইএ’র সমর্থন নিয়ে ইরাকের কাছে প্রচুর অস্ত্র বিক্রি করে সার্কিস। সার্কিস লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় মিলিশিয়া বাহিনীর কাছে ভারী অস্ত্র বিক্রি করে। পাশাপাশি ইকুয়েডর, নিকারাগুয়াতে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল সার্কিস। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় আর্জেনটিনার কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছিল সার্কিস।

৪। মনজের আল কাসার

“প্রিন্স অব মার্বেলা” খেতাবপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক এ অস্ত্র ব্যবসায়ীর জন্ম সিরিয়াতে। ১৯৭০ এর শুরুর দিকে অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত হোন। ইয়েমেন সরকারের মতে কাসার পোল্যান্ড থেকে নিজের টাকায় সরকারের জন্য অস্ত্র যোগান দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে বসবাস করেন। তারপর তিনি মার্বেলাতে যান এবং সেখানে গিয়েই প্রিন্স খেতাব অর্জন করেন। তারপর জাহাজ অপহরণকারীদেরকে অস্ত্রের যোগান দিতে থাকে। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সময়ে ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও সোমালিয়াতে অস্ত্রের যোগান দেন কাসার। ২০০৭ সালে মাদ্রিদে তাকে গ্রেফতার করা হয় ও পরবর্তীতে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হয়।

৩। জিন বার্নার্ড ল্যাসনড

জিন বার্নার্ড এর জন্ম ফ্রান্সে। আর্জেনটিনার কোর্ট ও ইন্টারপোলের তিন বছরের গ্রেফতারি পরোয়ানার পর ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ড এ তাকে গ্রেফতার করা হয়। চোরাকারবার ও জালিয়তির জন্য ইউরোপিয়ান কোর্টের মুহুর্মুহু অভিযোগের পরও আশ্চর্যজনকভাবে ১০ বছর ধরে দক্ষিণ ফ্লোরিডাতে বসবাস করতে থাকে জিন বার্নার্ড। জিন বার্নার্ড এর হিসেবমতে, তার প্রতিষ্ঠান ক্যারিবিয়ান গ্রুপ অব কোম্পানিজ প্রতি বছর ১ থেকে ২.৫মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করে। ১৯৯২ সালে আর্জেনটিনা থেকে ইকুয়েডর ও ক্রোয়েশিয়াতে কয়েক হাজার টন অস্ত্র প্রেরণের সময় দালাল হিসেবে কাজ করেছেন জিন বার্নার্ড। জটিল এক দূর্নীতির কারণে তাকে আটক করা হয়, যার সত্য কখনো জানা যায় নি।
২। লিওনিড মিনিন

লিওনিড মিনিন এর জন্ম ১৯৪৭ সালে ইউক্রেনে। ১৯৭০ সালে তিনি ইসরায়েল চলে যান। একই দশকে তিনি জার্মান সরকার দ্বারা গ্রেফতার হোন। শিল্প চুরির সন্দেহে ও ভুল পরিচয় ব্যবহার করার কারণে তাকে গ্রেফতার হয়। সিয়েরালিওন এ বিদ্রোহের সময় মিনিন অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিল। রাশিয়ান বিভিন্ন অস্ত্রের প্রতিষ্ঠানেও অস্ত্রের যোগান দিতো মিনিন। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার জন্য ২০০০ সালে ইতালি সরকার মিনিনকে গ্রেফতার ও তাকে দুই বছরের শাস্তি দেয়। ২০০৫ সালে “লর্ড অব ওয়ার” নামে সিনেমা হয় মিনিন এর জীবন অবলম্বনে।

১। ভিক্টর বোট

ভিক্টর আনাতোলিভিখ বোট পৃথিবীর এক নম্বর অস্ত্র চোরাকারবারি। ২০১০ সালে ডিইএ এর ৫বছরের অপারেশনের পর তাকে থাইল্যান্ড থেকে আমেরিকায় হস্তান্তর করা হয়। আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানরত কলম্বিয়ান বিপ্লবীদেরকে অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিলেন ভিক্টর। ৯০এর দশকে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি গৃহযুদ্ধে অস্ত্রের যোগান দিয়েছিলেন ভিক্টর। একই সময়ে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরও এঙ্গোলা, লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন ও কঙ্গোতে অস্ত্র পাচারের জন্য তাকে “সেঙ্কশন্স বাস্টার” খেতাব দেয়া হয়। দিন দিন পৃথিবীব্যাপী তার অস্ত্রের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে এবং ভিক্টর বোট সাংঘাতিক এক মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে পারিচিতি পায়।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ