Home / ফিচার / চলমান আন্দোলনে স্বাধীনতা রক্ষার ঘোষণা

চলমান আন্দোলনে স্বাধীনতা রক্ষার ঘোষণা

শফিক রেহমান

মঙ্গলবার।

বছরের শেষ দিন। আগামীকাল নতুন বছরের প্রথম দিনে দৈনিক শুকতারা-তে ছাপতে হবে বিদায়ী বছরের বড় ঘটনাগুলোর সালতামামি। ছাপতে হবে আগামী বছরটি কেমন যাবে সে বিষয়ে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী।

কিন্তু কোনো সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী যে করা সম্ভব নয় সেটা সম্পাদক শামীম জানে।

আগামী বছরে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা কার কাছে থাকেব?
শেখ হাসিনা? খালেদা জিয়া? অথবা তৃতীয় কোনো শক্তির কাছে?
আগামী বছরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন কেমন কাটবে?
কারো পক্ষেই কি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব?

সকালেই চলে এসেছিল শামীম তার অফিসে।

প্ল্যান ছিল দুপুর নাগাদ সব বৃফিং শেষ করে বিকেল ছ’টায় অফিসেই সব স্টাফকে নিয়ে নিউ ইয়ার ইভ পার্টি করবে।

অন্যান্য বছরের মতো রাত বারোটার কিছু আগে নিউ ইয়ার ইভ পার্টি করা সম্ভব হবে না। ঢাকা মেট্রপলিটান পুলিশের হাই প্রোফাইল কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ অনুরোধ করেছেন, থার্টি ফার্স্ট নাইটে সবাই যেন সন্ধ্যা আটটার মধ্যেই যে যার ঘরে ফিরে যান।

কেন?

আটটার পরে কি ঢাকার পথে আরো পুলিশ-র্যাব-বিজিবি নামবে? অথবা সশস্ত্র বাহিনী?

বেনজীরের এই নজিরবিহীন অনুরোধ মেনে চলার জন্য শামীম পত্রিকার স্কেলিটন স্টাফ বাদে অন্য সবাইকে সন্ধ্যার আগেই ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

থার্টি ফার্স্ট নাইটে নয়- থার্টি ফার্স্ট ইভনিংয়ের পার্টির জন্য অর্ডার দিয়েছিল কুপার্সের কেক। কিন্তু কড়া নির্দেশ দিয়েছিল কোনো মোমবাতি যেন আনা না হয়। কেকের ওপর যেন একটাও মোম সেট না করা হয়।

নিউজ এডিটর মেরি জানতে চেয়েছিল, মোমবাতি কেন নিষিদ্ধ করা হবে?

মোমবাতি হচ্ছে নম্রতা, প্রেম ও শান্তির প্রতীক। বিশ্ব জুড়ে যুগযুগান্তরকাল ধরে এটাই আমরা দেখেছি। জেনেছি। কিন্তু ২০১৩-এর ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ জাগরণে মোমবাতিকে ব্যবহার করা হয়েছে উগ্রতা, অশান্তি ও ফাসির দাবির প্রতীক রূপে। ইতিহাস বিকৃতির এক্সপার্ট আওয়ামী লীগ এখন ওয়ার্ল্ড কালচার বিকৃতির কাজেও নেমেছে। সুতরাং আওয়ামী শাসন আমলে নিরাপদে থাকতে হলে নিউ ইয়ার, বার্থডে, বিয়ে, বিয়ে বার্ষিকী- এসব অনুষ্ঠানে আর মোমবাতি ব্যবহার না করাই উচিত হবে। শামীম বিরক্ত মুখে উত্তর দিয়েছিল। তুমি বছরের একটা সালতামামি লিখে রেখ। শামীম নির্দেশ দিয়েছিল।

চেয়ারে বসতেই রিসেপশন থেকে জানালো বিবিসি লন্ডন থেকে মিজ রানী সিং খোজ করছেন। তিনি ঢাকায় এসে ওয়াইডাবলিউসিএ-তে উঠেছেন। ফোন করতে অনুরোধ করেছেন।

শামীম তাকে চিনতো না।

সে তাকে মোবাইলে ফোন করল। প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পর রানী সিং যা জানালেন, সংক্ষেপে তা হচ্ছে, বিবিসির পক্ষ থেকে বিএনপিনেত্রী খালেদা জিয়ার ইন্টারভিউ নিতে তিনি আগ্রহী। এ বিষয়ে লন্ডন থেকে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে আগেই আলাপ করে গত পরশুদিন ঢাকায় এসেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় গুলশানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসের প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার পর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রবার্ট গিবসনের বারিধারাতে তার নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেও শমসের মবিন চৌধুরী যিনি শেরু নামেও পরিচিত, তিনি গুলশানে তার নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেন নি। খালেদা জিয়ার বাড়ির বাইরে আসার পরপরই সরকারি বাহিনী তাকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আটকের ঠিক আগে তাকে ফোন করে শমসের মবিন জানিয়েছিলেন তার সর্বশেষ অবস্থান।

এখন কিভাবে ম্যাডাম জিয়ার ইন্টারভিউ নেওয়া সম্ভব? শমসের মবিন চৌধুরীকে আটক করার কোনো বৈধ কারণ দেখানো হয়েছিল কি? রানী সিং দুটি প্রশ্ন করলেন।

বোধ হয় ইন্টারভিউ নেওয়া সম্ভব হবে না। ম্যাডাম জিয়া তার বাড়িতে একা। তার কোনো পার্সনাল সাপোর্টিং স্টাফ নেই। এপয়েন্টমেন্ট সেক্রেটারি ছিলেন এডভোকেট শিমুল বিশ্বাস। তাকে বহুদিন আগেই পুলিশ ধরে নিয়ে জেলে পুরেছে। ম্যাডাম জিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাও সম্ভব নয়। বাড়িতে গেলে পুলিশ অ্যারেস্ট করতে পারে। আপনাদেরই দেশের হাই কমিশনার যখন ম্যাডাম জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চান তখন শমসের মবিন সরকারের ক্লিয়ারেন্স নিয়ে, তিনি, রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ আগেই ম্যাডামের বাড়িতে পৌছে ওই মিটিং সেটআপ করেন। পূর্ব অনুমতি নিয়ে ওই মিটিংয়ের পরেই শমসের মবিনকে গ্রেফতারের ফলে আবারও প্রমাণিত হলো হাসিনা সরকারকে অর্থাৎ হাসিনাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করা যায় না। কারণ, হাসিনাই এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই যে আপনি পূর্ব অনুমতি অর্থাৎ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন, তারপরে আমার সঙ্গে কথা বলার দায়ে আপনাকে গ্রেফতার করা হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। এখানে আইনের শাসন নেই। এক্সকিউজ মি। আমার অন্য মোবাইলটা বাজছে। একটু হোল্ড করুন। শামীম বলল।

অন্য ফোনটিতে কয়েক সেকেন্ড আলাপ করে শামীম ফিরে গেল প্রথম ফোনে।

মিজ সিং। ইউ হ্যাভ এ গুড নিউজ। এই মাত্র খবর পেলাম শমসের মবিনকে পুলিশ আপাতত ছেড়ে দিয়েছে। আপনি তাকেই ডিরেক্ট ফোন করতে পারেন। নাম্বারটা নিশ্চয়ই আছে। তবে ম্যাডামের সঙ্গে হাই কমিশনারকে দেখা করিয়ে দেওয়ার পর তিনি যে বিপদে পড়েছেন, তার পরে বিবিসির কাউকে দেখা করিয়ে দেয়াটা সম্ভব হয়তো হবে না। শামীম লাইন কেটে দিল। তারপর ইন্টারকমে মেরিকে আসতে বলল।

একটু পরেই শামীমের রুমে মেরি এল।

পরনে শাড়ি। হালকা গোলাপি জমিনে ছোট ছোট লাল জামদানি ডিজাইন। লাল ব্লাউজ। কপালে ছোট লাল টিপ।

হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ। চেয়ারে বসে হাত বাড়িয়ে মেরি বলল।

হ্যাপি নিউ ইয়ার। শামীম ওর হাত ধরে একটু ঝাকিয়ে বলল। কিন্তু হাতটা তখনই ছেড়ে দিল না। আস্তে আস্তে বলল, দেখো, সৈয়দ আশরাফের নজরে পড়ে যেও না। এই সময়ে গোলাপি শাড়ি না পরলেও পারতে।

নজরে পড়লে কি হবে? একটু মুচকি হেসে মেরি বলল। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না।

কিন্তু শামীম তার হাত গুটিয়ে নিল। তারপর বলল, নজরে পড়লে এমপি শাম্মী আখতারের মতো আটকে রাখতে পারেন। অথবা এমপি রাশেদা বেগম হীরার মতো আটক করে পরে ছেড়েও দিতে পারেন। এখন তুঘলকি আমল চলছে। তাছাড়া কারো কারো বিশ্বাস, সৈয়দ আশরাফ অসুস্থ। গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাভিশনে মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থাপিত ফ্রন্টলাইন টক শোতে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া গত রোববারে বিকেলে তার বাসভবনের গেইটের ভেতরে দাড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে যখন কথা বলছিলেন তখন তিনি শাদা শাড়ি পরে ছিলেন। অথচ সৈয়দ আশরাফ বলেন, তিনি গোলাপি শাড়ি পরে ছিলেন। আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়েই বলছি সৈয়দ আশরাফ ভুল বলেছিলেন। সম্ভবত সৈয়দ আশরাফ অসুস্থ ছিলেন।

ওই অনুষ্ঠানে নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবিরও ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ যে দিনের বিশেষ সময়ে অসুস্থ থাকতে পারেন সেই বিষয়টির প্রতি ওই দুই বক্তার আলোচনায় ইংগিত করা হয়। শামীম হাসল।

এটা মাইনর ব্যাপার। মেজর ব্যাপারটি হচ্ছে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের কোনো প্রতিউত্তর এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা দিতে পারেন নি। তিনি অসমর্থ হওয়ায় প্রতিউত্তর দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন সৈয়দ আশরাফ ও ডা. দীপু মনি। এতে বোঝা যায় সৈয়দ আশরাফ নন, আসলে খালেদার বাক্যবুলেটে হেভি ইনজিউরড বা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শেখ হাসিনা।

প্রথমত, তিনি ভাবতে পারেন নি প্রায় এক হাজার নারী পুরুষ গোপালিশ, অনেক শাদা পোশাকি পুলিশ এবং সেই বাড়ির সামনে মোতায়েন পাচটি বালুর ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপারদের ছদ্মবেশে ভিনদেশি গোয়েন্দাদের প্রখর চোখ এড়িয়ে উদ্যমী ও সাহসী রিপোর্টার-ফটোগ্রাফাররা অন্য বাড়ির দেয়াল টপকে ম্যাডামের বাড়িতে ঢুকে পড়বে।

তার ইন্টারভিউ নিতে পারবে এবং সেটা টিভিতে আপলোড করে দিতে পারবে। যার ফলে সারা বাংলাদেশ খালেদার অতি প্রতীক্ষিত তেজীয়ান একটি পারফরম্যান্স লাইভ দেখতে পারবে। বস্তুত ২৯ ডিসেম্বর নয়া পল্টনে বিএনপি হেড কোয়ার্টার্সের সামনে খালেদা পৌছাতে পারলে এবং সেখানে কোনো বক্তৃতা দিতে পারলেও তার চেয়ে অনেক বেশি এফেক্টিভ হয়েছে নিজের বাড়িতে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা বসে থাকার পরে অবরুদ্ধ অবস্থায় বাংলাদেশের পতাকা হাতে তার এই বিবৃতি। হাসিনা তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন সরকারি বাহিনীর সেদিনের এই দুর্বলতা। জয় কিছুদিন আগেই একটি ইনডিয়ান পত্রিকায় গর্ব করে বলেছিলেন, তার মা ও তাকে নিশ্ছিদ্র পাহারা দিচ্ছে বিশ্বস্ত বাহিনী। এ সব পাহারাই যে ভঙ্গুর সেটা প্রমাণিত হলো আরো একবার। মেরি বলল।

তাদের নিজেদের পাহারা আরো জোরালো করার জন্য আমেরিকাবাসী জয় এখন চেষ্টা করতে পারেন সিআইএ-র সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন কোনো ফোর্স আনতে। ফোন নাম্বার (১) (৭০৩) ৪৮২-০৬২৩ এবং ফ্যাক্স নাম্বার (১) (৭০৩) ১৪৮২-১৭। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলায় জয়ের মা কাজ লাগিয়েছিলেন এফবিআই-কে। তাতে লাভ হয়নি। তারেক রহমান ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। এখন এফবিআই নয়- জয়ের শেষ ভরসা হতে পারে সিআইএ। তারপর বলো। শামীম বলল।

খালেদার ওই বক্তব্যের পর কেন হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন তার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, হাসিনা ভাবতে পারেন নি খালেদা তার স্বভাবসুলভ নম্রতা ও বিনয়ের বাধা কাটিয়ে কঠোর ও সরাসরি ভাষায় এত চোখা বক্তব্য রাখবেন। এজন্য কেউ কেউ খালেদার সমালোচনা করে বলেছেন, তার উচিত ছিল তার অতীত স্টাইলেই বলা। কিন্তু এই সমালোচনার বিপরীতে অনেকেই বলেছেন, ওই দিন খালেদার মুখের ভাষা এবং দেহের ভাষা উভয়ই ছিল সময়োচিত। এর আগে গুলশানে তার কার্যালয়ে মঙ্গলবার ২৪ ডিসেম্বরের প্রেস কনফারেন্সে খালেদাকে দেখা গিয়েছিল হাস্যোজ্জ্বল চেহারায়। বিরোধী দলের কর্মসূচি ঘোষণায় লিখিত বিবৃতি পড়ার সময়ে তিনি তার সব আবেগ রেখেছিলেন নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু রোববার ২৯ ডিসেম্বরে অবরুদ্ধ অবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রেস বিবৃতিতে খালেদা তার মনের অবরুদ্ধ কথাগুলোকে মুক্ত করে দেন। তিনি যা বলার তা রাখঢাক না করে, সাফ সাফ বলে দেন। আর এ সবই ছিল দেশবাসীর মনের কথা। তাই ওই বিবৃতির সময়ে দেশবাসী হয়েছে উদ্দীপ্ত, বিরোধী কর্মীরা হয়েছেন উজ্জীবিত এবং বিরোধী নেতারা হয়েছেন অনুপ্রাণিত। তারা বলেছেন, হ্যা, এমনটাই তো আমরা শুনতে চেয়েছিলাম।

এর আগে একাধিকবার শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়াকে মাঠে নামতে। খালেদা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সেদিন বিকেলে মাঠে নামেন। কিন্তু মাঠ ছিল ফাকা। মাঠ ছিল হাসিনা বিহীন। কিছুকাল আগে সংসদের তামাশা নির্বাচনে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবার পরে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন, ফাকা মাঠে গোল তো হবেই। রোববার বিকেলে খালেদা ফাকা মাঠে সরকারি দলের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে একটার পর একটা গোল করছেন। বেঞ্চে বসা দুই সাবস্টিটিউট, অসুস্থ সৈয়দ আশরাফ এবং মোটাসুস্থ (আওয়ামী ভাষায় ‘মোটাতাজা’ বলাই হয়তো সঙ্গত) দীপু মনি এখন খেলা শেষ হয়ে যাবার পর মাঠে নেমে গোল দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু সরি। টাইম ইজ ওভার।

খালেদা বলেন, সে (হাসিনা) না বলেছিল খালেদা জিয়া বের হোক রাস্তায়। আজকে আমি রাজপথে যেতে চাই। বাধা দেন কেন, কেন বাধা দেন? তার তো রাজপথে আসার কোনো সাহস নেই। চলেন দুনিয়ার সিকিউরিটি নিয়ে, আর মানুষ মারেন, মানুষ গুম করেন, মানুষ খুন করেন। মনে করছেন যে ভুলে যাবেন। সারা ওয়ার্ল্ড জেনে গেছে হাসিনা কতো মানুষ খুন করেছে, কতো মানুষ গুম করেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে, পুলিশ বাহিনী, র্যাব বাহিনী।

দুই ফাকা মাঠের মধ্যে তফাৎটা এখানে ধরিয়ে দেন খালেদা। এই ভোটযুদ্ধ মাঠে বিরোধীরা যায়নি রাজনৈতিক কারণে, ভীরুতার জন্য নয়। কিন্তু মল্লযুদ্ধ মাঠে হাসিনা যান নি ভীরুতার কারণে। হাসিনার এই ভীরুতা অতীতেও মানুষ দেখেছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর দুইবার তিনি দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তখন খালেদাকে সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা করে শাসকরা ব্যর্থ হয়েছিল।

খালেদা জিয়া আরো বলেন, আর কতো মানুষ মারেন সেটাও দেখব। এর আগেও তো ক্ষমতায় থাকা কালে মেরেছেন। … আপনারা আইনজীবীদের গ্রেফতার করছেন। সাংবাদিকদের প্রতি নির্যাতন চালাচ্ছেন। মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। মহিলা পুলিশদের প্রতি তিনি বলেন, আপনাদের মহিলাদের প্রতি এতটুকু সম্মান নেই? দরদ নেই? আমরা অন্তত মহিলাদের সম্মানটুকু রক্ষা করি। সেটাও তো আপনারা করেননি। কি আচরণ করছেন?

এখানে খালেদা ধরিয়ে দিয়েছেন নারী পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও ঠিক শেখ হাসিনার মতোই অপরের প্রতি সম্মানের অভাব আছে।

এরপরে খালেদা বলেন, অথচ আমাদের সময়ে ১৭৩ দিন আপনারা হরতাল বলেছেন, অবরোধ করেছেন, নানারকম বিশৃঙ্খলা করেছেন, লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ খুন করেছেন অথচ একটি গুলিও চালাইনি আমরা। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি দরদ আছে আমাদের। মায়া আছে। সে জন্যই আমরা জনগণকে গুলি করে হত্যা করতে পারি না।

খালেদা তার অন্তঃস্থল থেকে এসব কথা বলেছেন। সাবেক আইজি কাইয়ুম জানিয়েছেন, ১৯৯৫-৯৬ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলন চলার সময়ে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, ওই আন্দোলন দমনে একটা গুলিও যেন না চলে। তাই হয়েছিল।

শান্তি, প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মানবোধ এবং সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালনের প্রতি খালেদা জিয়ার নিষ্ঠা আবার ফুটে ওঠে এর পরের কিছু কথায়। পুলিশ বাহিনীর প্রতি তিনি বলেন, আপনাদের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আপনারা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু আমি মনে করি আপনারা সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। সম্মানের সাথে আপনারা কাজ করতে পারেন। আমরাও কাজ করতে পারি। সেভাবেই আপনারা করেন। আপনাদের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই, পুলিশ বাহিনী। কিন্তু এটা তো ঠিক নয় যে, আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেবেন না। এটা ঠিক নয়। … ধাক্কাধাক্কি বন্ধ করেন। আমরা কেউ ধাক্কাধাক্কি করতে আসিনি। আমি বলছি আপনারা (পুলিশ) চাকরি করেন, করবেন। কিন্তু এ রকম গায়ের ওপরে উঠে পড়বেন না। দূরে থাকেন। আপনাদের জায়গা যেখানে সেখানে থাকুন। আপনাদের রাস্তায় থাকার কথা। বাড়ির মধ্যে এসে গেছেন কেন?

খালেদা জিয়ার এ কথায় বাংলাদেশের মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়েছে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার মূল্যবোধের সঙ্গে যে তার হাজার মাইল তফাৎ আছে সেটা আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশাসনে শেখ হাসিনার আঞ্চলিকতা সর্বজন নিন্দিত। খালেদা জিয়া সে বিষয়ে হাসিনাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দেশ কোথায়? গোপালি? গোপালগঞ্জ জেলার নামই বদলে যাবে। বুঝেছেন? গোপালগঞ্জ আর থাকবে না।

ভবিষ্যৎ খালেদা সরকার যে গোপালগঞ্জের নাম বদলে দেবে এমনটা তিনি বলেননি। নাম হয়তো সাধারণ মানুষই বদলে দিতে চাইবে এবং হয়তো খালেদাই সেটা রুখে দেবেন। কারণ ব্যক্তিগতভাবে নাম বদলে তিনি কোনো দিনই আগ্রহী ছিরেন না যেমনটা শেখ হাসিনা ছিলেন এবং আছেন। ভবিষ্যৎ হাসিনা সরকার হয়তো বাংলাদেশেরই নাম পালটে দেবে। গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকা তার সম্পাদকীয়র শেষ লাইনে লিখেছে, কোন পথে এগোয় মুজিবের দেশ, দেখতে আগ্রহী সকলেই।

মুজিবের দেশ?

একটু সংক্ষিপ্ত করলেই তো ওটা হয়ে যায় মুজিবদেশ।

ইনডিয়ান পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশকে মুজিবদেশে রূপান্তরিত করে ইনডিয়ার হাতে তুলে দিতে যে শেখ হাসিনা আগ্রহী সেটা এখন অনেকেই মনে করেন। হয়তো জানুয়ারি ২০১০-এ হাসিনা দিল্লিতে গিয়ে যে চুক্তি করে এসেছেন এবং যেটা বাংলাদেশে অপ্রকাশিত এবং সংসদে অনালোচিত সেখানে কোনো শর্তে এই ধরনের সম্ভাবনার ইংগিত আছে। হয়তো হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির শেষ মুহূর্তে মুজিবদেশ রক্ষার জন্য ইনডিয়ান সেনা হস্তক্ষেপের আবেদনের কোনো সুযোগ আছে। হয়তো ইনডিয়ান পররাষ্ট্র সচিব মিজ সুজাতা সিং ঢাকায় এসে সেই আশ্বাসই দিয়ে গিয়েছেন শেখ হাসিনাকে।

খালেদা জিয়া এরপর কয়েকটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, কতোগুলো আলেমকে হত্যা করেছেন? এতিমকে হত্যা করেছেন? কতোজন বিডিআর অফিসারকে হত্যা করেছেন? সেদিন কোথায় ছিল হাসিনা? এতগুলো অফিসারকে মারল, ৫৭ জন অফিসারকে হত্যা করল। সেদিন হাসিনার এই ফোর্স কোথায় ছিল? কেন সে ফোর্স পাঠায় নাই? আসলে তো সে নিজেই জড়িত ছিল ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে।

লক্ষ্যণীয় যে শেখ হাসিনার দুই সাবস্টিটিউট এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু সবাই জানেন, এসব প্রশ্ন এবং পারসেপশন বা ধারণা এখন সারা বাংলাদেশে উচ্চারিত হয়।

এর কিছু পরেই খালেদা সবচেয়ে দর্শনীয় গোলটি করেন। তিনি বলেন, হাসিনার বাহিনীতে আজকে তো অনেক আননোন ফেইস (অচেনা চেহারা) দেখা যায়, যাদেরকে চেনা যায় না তারা আসলেই বাংলাদেশী কিনা। বাংলাদেশে আজ ২৯ ডিসেম্বর কর্মসূচি ছিল আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জন রোড মার্চ। (আপনারা) গণতন্ত্র চাইবেন না, দেশ রক্ষা করতেও চাইবেন না। গোলামি করবেন? দালালি করবেন? এই গোলামকে তো (ওরা) রাখবে না। লেন্দুপ দর্জির ইতিহাসটা পড়ে দেখেন। সে-ও কিন্তু টেকেনি বেশি দিন। তাকেও বিদায় নিতে হয়েছে। দালালি করে, দেশ বিক্রি করেও। কাজেই দেশ বিক্রি চলবে না হাসিনার। দেশ রক্ষা হবেই ইনশাআল্লাহ। দালালি বন্ধ করতে বলেন। আর হাসিনার দালালি করে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশের মানুষের সাথে থাকেন। জনগণের সাথে থাকেন। দেশের মানুষের সাথে থাকেন। তবেই কাজে দেবে। দেশ বাচবে, মানুষ বাচবে। আজকে সবার দায়িত্ব হয়ে গিয়েছে দেশ বাচানো, মানুষ বাচানো।

এটাই খালেদা জিয়ার বটম লাইন কথা। শেষ কথা। আজকে সবার দায়িত্ব হয়ে গিয়েছে দেশ বাচানো, মানুষ বাচানো।

অনেকে বলেন, পুলিশ, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার পরিবেষ্টিত হয়ে অতি বিক্ষুব্ধ অবস্থায় লেন্দুপ দর্জির নামটি মনে করাটা ছিল বিস্ময়কর। কেউ কেউ বলেন, লেন্দুপ দর্জির নাম শুনে হতবাক হয়েছেন হাসিনা। তিনি জানতে চেয়েছেন লেন্দুপ দর্জি কে ছিলেন?

উত্তরটা সংক্ষেপে হচ্ছে : কাজী লেন্দুপ দর্জি খাংসারপা ছিলেন সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সংক্ষেপে লেন্দুপ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯০৪-এ তার জন্ম হয়েছিল সিকিমের সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে। কৈশোর ও যৌবনে তিনি ধর্মশিক্ষা নেওয়ার পরে একটি বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান লামা হন। ১৯৬২-তে তিনি রাজনৈতিক দল সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর প্রেসিডেন্ট হন। তার স্ত্রী কাজিনি এলসা মারিয়া ছিলেন স্কটল্যান্ডের অভিজাত বংশ উদ্ভূত। তিনি এডিনবরা ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং তার স্বামীর প্রধান পরামর্শক ছিলেন। এক সময়ে তিনি একটি ফ্রেঞ্চ পত্রিকায় সাংবাদিক ছিলেন। লেন্দুপের বৌদ্ধ ধর্ম তিনিও গ্রহণ করেন। মিলিতভাবে তারা সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসকে পরিচালনা করেন এবং তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে সুফল অর্জন করেন। ১৯৭৪-এ লেন্দুপ হন সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। পরের বছর ১৯৭৫-এ সিকিম আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিকভাবে যোগ দেয় ইনডিয়ার সঙ্গে। লেন্দুপ মুখ্যমন্ত্রী থাকলেও ১৯৭৯-তে তাকে বিদায় নিতে হয়। তার গড়া সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসও বিলীন হয়ে যায় ইনডিয়ার ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে। ২৮ জুলাই ২০০৭-এ পশ্চিম বাংলায় কালিমপং শহরে ১০২ বছর বয়সে লেন্দুপের মৃত্যু হয়।

সিকিমের জনসংখ্যা ছয় লক্ষের কিছু বেশি। এরা বৌদ্ধ অথবা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অর্থনৈতিকভাবে সিকিমের চাইতে বেশি গরিব রাজ্য ইনডিয়া রাষ্ট্রে আর মাত্র দুটি আছে।

বলা যায় লেন্দুপ দর্জির দুর্ভাগ্য এবং সিকিমের দুরবস্থা বিষয়ে খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই ভালো জ্ঞান রাখেন। ২৯ ডিসেম্বরের বিকেলে অতি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সিকিম এবং ইনডিয়ার নাম উচ্চারণ না করে তিনি সতর্কবাণী দিয়েছেন হাসিনা ও বাংলাদেশের পরিণতি কি হতে পারে।

তাই খালেদা জিয়া সেদিন তার বিবৃতি শেষ করতে পারতেন এটা বলে যে, আমার স্বামী জিয়াউর রহমান ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ দিবাগত রাতে ২৬ মার্চ ভোরে ‘উই রিভোল্ট’ -আমরা বিদ্রোহ করলাম এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপর ২৭ মার্চ ১৯৭১-এ তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর আজ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩-তে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার ঘোষণা দিলাম।

৩১ ডিসেম্বর ২০১৩

(বানান রীতি লেখকের নিজস্ব)

শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক, টিভি অ্যাঙকর, বিবিসির সাবেক কর্মী (১৯৫৭-১৯৯১), লন্ডনে বহুভাষাভিত্তিক স্পেকট্রাম রেডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও (১৯৮৭-১৯৯২)।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ