Home / শিক্ষা / কম বেতন কাঠামোর জন্য মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না

কম বেতন কাঠামোর জন্য মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না

মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি শিক্ষক। মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষকের মর্যাদাও দিতে হবে। দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানভেদে বৈষম্য মারাতœকভাবে বিদ্যমান। কম বেতন কাঠামোর জন্য মোধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না। দেশে আট ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮ লাখের বেশি শিক্ষক থাকলেও দক্ষ এবং যোগ্য শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায়। মেধা বিবেচনা না করে দলীয়, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়োগ দেওয়া, নিয়োগ পাওয়ার পর কোনো প্রশিক্ষণ না পাওয়া এবং জবাবদিহিতা না থাকায় শিক্ষকদের বর্তমান এ অবস্থা বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব থাকায় দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্ম বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন ইংরেজি, আবার বাংলা বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন গণিত বা অন্য কোনো বিষয়। শিক্ষার মান উন্নয়নে এ বিষয়টিও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের চেয়ে প্রাইভেট টিউশনির দিকে ঝুঁকছেন। যা শিক্ষকদের জন্য দুর্নাম বয়ে আনছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের বেশিরভাগ শিক্ষক প্রাইভেট-টিউশনি করেন না। কিছু শিক্ষকের কারণে এ দুর্নাম হচ্ছে। সরকারের এ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া উচিত। আবার শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অন্যান্য পেশার চাকরির চেয়ে কম হওয়ায় মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। শিক্ষকরা বলছেন, তারা সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখলেও তারা সেভাবে সম্মান পাচ্ছেন না। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৮ লাখ ৭১ হাজার শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ শিক্ষকই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। মাধ্যমিকের ২ লাখ ৩৮ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ২ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষকই বেসরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত। মাত্র ৭ হাজার শিক্ষক সরকারি বিদ্যালয়ের। কিন্তু জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) বেসরকারি শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণের তেমন সুযোগ নেই। সেখানে সরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া টিচার কোয়ালিটি ইমপ্র“ভমেন্ট প্রকল্পের মাধ্যমেও পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না। শিক্ষকদের যোগ্যতা, জ্ঞানের পরিধি, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরতা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বিজ্ঞানে দক্ষতা, শিক্ষাদানের কলাকৌশল, শিক্ষাদানে শিক্ষকসুলভ মনমানসিকতা শিক্ষকদের যোগ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ শিক্ষকের মান সার্বিক বিচারে অত্যন্ত নিম্নমানের।
শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবেচনায় দেখা যায়, মাধ্যমিক স্কুলে ৫১ ভাগের বেশি তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক, ৩৩ ভাগ দ্বিতীয় শ্রেণি এবং ১ ভাগেরও কম শিক্ষক প্রথম শ্রেণির স্নাতক। মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ২৯ ভাগ শিক্ষক তৃতীয় শ্রেণি, ২৯ ভাগ দ্বিতীয় শ্রেণি এবং পৌঁনে এক শতাংশ শিক্ষক প্রথম শ্রেণির স্নাতক। কলেজের ক্ষেত্রে ২ ভাগ শিক্ষক তৃতীয় শ্রেণি, ৭৯ ভাগ শিক্ষক দ্বিতীয় শ্রেণি এবং ৪ ভাগ শিক্ষক প্রথম শ্রেণির মাস্টার্স ডিগ্রীপ্রাপ্ত। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান গভর্নিং বডির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বহিঃচাপ ইত্যাদি কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হয় না। এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে সরকারিভাবে পরিচালিত এক জরিপে দেখানো হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের শতকরা ৪৫ ভাগ শিক্ষক প্রশিক্ষিত, মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ৬ ভাগ এবং কলেজের ক্ষেত্রে ৪ ভাগ শিক্ষক প্রশিক্ষিত। সেখানে বলা হয়, স্কুল ও মাদ্রাসায় মাধ্যমিক স্তরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শতকরা ৫৪ ভাগ শিক্ষক শিক্ষাদান কলাকৌশল সম্পর্কে অজ্ঞ। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ৯০ ভাগের বেশির প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ করে না। অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে আসেন না। ৮০ ভাগ শিক্ষক প্রস্তুতি ছাড়াই ক্লাসে আসেন। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে এমন হচ্ছে।
বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রকাশিত “দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে” শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলা হয়, যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ দান, ইন সার্ভিস ট্রেনিং, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত উন্নয়ন, ফলপ্রসূ পরিদর্শন, তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়ন, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, গ্রাম ও শহরের মধ্যে ব্যবধান সংকোচন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, ছাত্র ঝরে পড়া বিশেষ করে ছাত্রী ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহ রোধ এবং দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনয়নের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। কিন্তু সেখানে শিক্ষকের আর্থসামাজিক মর্যাদা উন্নয়নের কথা উল্লেখ না হওয়ায় শিক্ষকের রয়েছে ক্ষোভ।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনের নামে বিগত আমলের ৫০০-৭০০ টাকার পরিবর্তে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বেতন হিসেবে প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত পাঁচ বছরে তিন লাখ ৮৩ হাজারের অধিক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকের প্রধান ভূমিকা রাখতে হয়। তাই শিক্ষকদের আরো সচেতন হতে হবে। তারা সমাজ গড়ার কাজে যে অবদান রাখছে সে হিসেবে আরো প্রশংসা পাওয়া উচিত। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের নিজেকে আরো দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ