Home / শিক্ষা / পড়তে চাইলে বেছে নিন জার্মানিকে

পড়তে চাইলে বেছে নিন জার্মানিকে

বিশ্বায়ন ও উন্নয়নের এই যুগে শিক্ষার উন্নতমান ও নিজের ক্যারিয়ারকে গতিশীল করে তুলতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তবে সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সহযোগিতার অভাবে অনেক সময় যোগ্য প্রার্থী বঞ্ছিত হচ্ছেন বিদেশে উচ্চশিক্ষা হতে। অনেক সময় সঠিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা। এ দিক থেকে সহজেই শিক্ষার্থীরা বেছে নিতে পারেন জার্মানিকে। উন্নত জীবন ব্যবস্থা, শিক্ষার মান ও আবাসন সুবিধার দিক থেকে দেশটি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

কেন জার্মানিকে বেছে নেবেনঃ

munichuniversity

দেশটির অর্থনিতির মান বেশ শক্তিশালী যা তাদের শিক্ষার মানকে উন্নত করতে সহযোগিতা করেছে। জার্মান সরকার শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিশ্বের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ হয়ে থাকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুষদে। বিগত ১৫ বছরে জার্মানি বিদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার নিয়মেও অনেক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষায়িত বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান চালু করেছে যেখানে তারা মানসম্পন্ন বেশকিছু বিষয় পড়িয়ে থাকেন। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি ও ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি রয়েছে জার্মানিতে।

২০১২ সালের শেষের দিকে জার্মান সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে, যাতে বলা হয় জার্মানিতে পড়তে আসা শিক্ষার্থিরা পড়াশুনার পাশাপাশি আগের তুলনায় বেশি সময় কাজ করার সুযোগ পাবেন। যা তাদের শিক্ষা ব্যয়ভার মেটাতে সাহায্য করবে। পড়াশুনা শেষ করে একজন ছাত্র বা ছাত্রী চাকরি খোঁজার জন্য ১৮ মাস পর্যন্ত নতুন ভিসা পাবে।

জার্মানি নিরাপত্তার দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ স্থান। সহজ ও উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম ও জীবনযাত্রার মান এবং সহজেই জার্মান থেকে ইউরোপের অন্য দেশে সুযোগ করে নেবার সুবিধা দেশটিকে করে তুলেছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচনঃ

Leipzig - Vorlesung im Anatomie-Hörsaal an der Uni

শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের উপর নির্ভর করবে আপনার সমগ্র ব্যয়। তবে আশার কথা এই যে জার্মানির বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার খরচ দেশটির সরকার বহন করে এবং দেশের শিক্ষার্থীদের মত বিদেশি শিক্ষার্থীরাও বিনা খরচে শিক্ষার সু্যোগ পায়। জার্মানিতে মোট ১৬টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে যার ভিতরে ১৪ টিতে সরকার শিক্ষা ব্যয় মউকুফ করেছে। নিচে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উপযোগি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হলঃ

ফ্রী ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনঃ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির আবস্থান ৮৭ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে সমৃদ্ধ সমাজ বিজ্ঞান, মানবিক ও গবেষণা অনুষদ। কর্তৃপক্ষ আশা করছে খুব দ্রুত তারা তাদের মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী পাবে।

লুদভিক ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখঃ জার্মানির পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটি একটি। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে এটিরও রয়েছে শক্ত অবস্থান। মোট ১০০টির বেশি শিক্ষা বিভাগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষার্থীর ১৫ ভাগই বিদেশি। এখানে বেশ কয়েকটি বিভাগ যেমন ব্যবসায়, ব্যবস্থাপনা, মনোবিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়গুলি ইংরেজিতে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

উল্ম ইউনিভার্সিটিঃ উল্ম ইউনিভার্সিটিতে বেশকিছু বিষয় রয়েছে যেখানে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজিতে মাস্টার্স করতে পারে৷ এসব বিষয়গুলো হলো, অ্যাডভান্সড ম্যাটারিয়াল্স, অ্যাডভান্সড অনকোলজি, কম্যুনিকেশন টেকনোলজি, এনার্জি সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, ফিন্যান্স এন্ড মলিকিউলার সায়েন্স৷ শিক্ষার্থিদের জন্য গবেষণা সহকারি হিসেবে কাজ করারও সুযোগ রয়েছে এখানে।

হাইডেলব্যার্গ ইউনিভার্সিটিঃ হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউট দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক চর্চার জন্য বিখ্যাত৷ এখানে পড়ানো হয় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষা যেমনঃ বাংলা, হিন্দি, উর্দু, তামিল৷ হয় সংস্কৃতের চর্চাও৷ জার্মানিতে হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ই সর্বপ্রথম৷ সবমিলে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ১২টি অনুষদ৷ এর সঙ্গে রয়েছে তিনটি গ্রাজুয়েট স্কুল৷ এই স্কুলগুলো আসলে তিনটি বিভিন্ন গবেষণাগার৷ সেখানে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স এবং জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়৷ হাইডেলব্যার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে প্রায় ২৮ হাজার ছাত্র-ছাত্রী৷ বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি অর্থাৎ ১৮ শতাংশ৷

আবেদন প্রক্রিয়াঃ

জার্মানিতে আবেদনের জন্য মূলত প্রয়োজন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের নির্দিষ্ট অনুষদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন। আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা এখনো বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহারের বিষয়ে অনেক পিছিয়ে। তারা মূলত বিভিন্ন এজেন্সির সহযোগিতা নিতে বেশি আগ্রহী। ভারতীয় এক ছাত্রের প্রচেষ্টার কথা বলি, যিনি জার্মানির বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে চান্স পেয়েছেন একটিতে। সবার প্রথমেই আপনাকে সাহায্য নিতে হবে ইন্টারনেট থেকে। প্রথমে সব ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটগুলোর তালিকা করুন। যখন আপনি আপনার খরচ, বিষয়, ও আবাসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাবেন তখন আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হবে। আবেদনের নিয়ম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রকম হলেও এর নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব পেজে পাওয়া যাবে।
800px-Berlin_reichstag_CP

বিগত ১০ বছরে জার্মানিতে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা চার/পাঁচ গুন বৃদ্ধি পেলেও আশংঙ্কার কথা এই যে, ভিসা প্রাপ্তির জন্য জার্মান ভাষা শিক্ষার ইনষ্টিটিউটগুলির অফার লেটারের অপ-ব্যবহার হচ্ছে যত্রতত্র। যার ফলে শিক্ষার্থিরা ভিসা পাচ্ছে ঠিকই তবে ওই ভিসার সীমাবদ্ধতা থাকছে অনেক বেশি। তাই আবেদনের ক্ষেত্রে মটিভেসন লেটার (আবেদনের প্রথম পর্যায়ে নিজের শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের বর্ননা দিয়ে যে চিঠি লিখা হয়) তৈরি করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ই-মেইল করা যেতে পারে। ফিরতি ই-মেইলেই তারা আপনাকে জানিয়ে দেবেন পরবর্তিতে আপনাকে কি করতে হবে। আর একবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অফার লেটার পেলে ভিসাপ্রাপ্তিও সহজ।

জার্মানীতে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিকে তার নিজ দেশের জার্মান অ্যাম্বেসীতে ভিসার আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশের নাগরিকগণ ঢাকাস্থ জার্মান অ্যাম্বেসীতে ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। যদি কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্রটি অনুমোদন করেন তবে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ প্রার্থীকে ভিসা প্রদান করবেন। ভিসার জন্য সাধারনত যে জিনিসগুলো প্রয়োজন তা হল-

• ২টি যথাযথভাবে পূরণকৃত আবেদনপত্র এবং প্রয়োজনীয় ডিক্লারেশন লেটারের অনুলিপি

• ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি

• মূল পাসপোর্ট এবং এর ফটোকপি

• যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে যাবেন সেখান থেকে ইস্যুকৃত ‘Letter of Acceptance’

• আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমানপত্র ও এর ফটোকপি (যা প্রমান করবে জার্মানীতে অবস্থানকালীন সময়ে আপনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল অবস্থানে থাকবেন।

• কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাডেমিক রেফারেন্স লেটার।

এছাড়া, আবেদনের ব্যাপারে আরও কিছু তথ্য পাবেন জার্মানির ঢাকাস্থ দূতাবাসের ওয়েবসাইট- http://www.dhaka.diplo.de/

বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (BSA) এর ওয়েবসাইট- http://www.bsa-germany.de

আরও ভিজিট করতে পারেন- http://www.daad.de এবং ফেসবুকেও বেশকিছু গ্রুপ রয়েছে যেখানে জার্মান প্রবাসি শিক্ষার্থিরা দেশি শিক্ষার্থিদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকেন।

সমগ্র খরচ ও বৃত্তির সু্যোগঃ

প্রথমেই বলা হয়েছে সরকারি স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তরের জন্য কোনো টিউশন ফি নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ এবং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জন্য প্রতি সেমিস্টারে ৪০০ থেকে ৭২০ ইউরো নেওয়া হয়। আবাসন ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যয়ের জন্য সরকারি হিসাব অনুসারে আপনার প্রতিমাসে প্রয়োজন ৫০০ ইউরো। জার্মানিতে চিকিৎসা বীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক। এর জন্য আপনার প্রতি চার মাস অন্তরে প্রয়োজন ৭০ ইউরো। সবমিলে বলা যায়, এ সকল দিক দিয়ে জার্মানি বেশ ব্যয়বহুল। তবে আশার কথা এই যে, জার্মান সরকার বিদেশি দরিদ্র শিক্ষার্থিদের জন্য বেশকিছু বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। যেমন DAAD প্রতি বছর ১৩০০ ভারতীয় শিক্ষার্থীকে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দেয়। জার্মানিতে পড়তে আসা যেকোনো অ-সচ্ছল শিক্ষার্থী এ সকল বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। এ বিষয়ে উল্ম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত বাংলাদেশি ছাত্রী ফাহমিদা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ডয়েশল্যান্ড স্টিপেন্ডিয়ুম নামে বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিলাম৷ তবে প্রথম বছর সেটা না পেলেও দ্বিতীয় বছর পেয়েছি৷ এছাড়াও যে সকল প্রতিষ্ঠান দরিদ্র ও অসচ্ছল ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকেন তাদের মধ্যে রয়েছে- কনরাড আডেনাওয়ার ফাউন্ডেশন, হাইনরিশ ব্যোল ফাউন্ডেশন, ফ্রীডরিশ এবার্ট ফাউন্ডেশন, বোরিংগার ইংগেলহাইম ফাউন্ডেশন ইত্যাদি।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ