Home / সম্পাদকীয় / কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি

কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার কর্মক্ষেত্র ছিল কাগজে কলমে ‘মুজিবনগর’, তবে বাস্তবে কলকাতা। কারণ কলকাতাই ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের প্রশাসনিক কর্মস্থল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার গঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। এ সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল। বেশ কিছু বিদেশি সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট দেশি-বিদেশি অতিথি এবং প্রধানত ১৯৭০ সালে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয় কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলায় এক বিশাল আমবাগানে। স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর, যা বাংলাদেশ সরকারের সদর দফতর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে বিপ্লবী সরকারের কাজকর্ম পরিচালিত হয় আসলে কলকাতা থেকে। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে ছিল বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়। এখানেই বসতেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী।
আমি একাত্তরে ঢাকায় দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চলে যাই কলকাতায়। সেখানে থিয়েটার রোডে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করার নির্দেশ দেন। তার আগেই শেখ ফজলুল হক মনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা বের করার। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আমি এই দুটো দায়িত্বই পালন করি।
স্বাধীন বাংলা বেতারের কার্যালয় ছিল বালিগঞ্জে, আর ‘বাংলার বাণী’র অফিস ভবানীপুরে। এলগিন রোডে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বাড়ির অদূরে রাজেন্দ্র স্ট্রিটে একটি তিন তলা বাড়ির নিচ তলায় ছিল ‘বাংলার বাণী’র অফিস ও আমার থাকার ব্যবস্থা। বাংলার বাণী কম্পোজ ও ছাপা হতো কলেজ স্ট্রিটের কালি প্রেসে। তাই সকালে স্বাধীন বাংলা বেতারের জন্য ‘সংবাদ পর্যালোচনার’ স্ক্রিপ্ট লিখে বালিগঞ্জে পেঁৗছে দিয়ে চলে যেতাম কলেজ স্ট্রিট, আর ফিরতাম রাতে। এভাবেই চলেছিল ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন পর্যন্ত।
যে কোনো যুদ্ধে রণক্ষেত্রে সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্তি্বক লড়াইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শত্রুর মনোবল ভেঙে দিতে এবং সমর্থকদের উজ্জীবিত ও চাঙ্গা করার লক্ষ্যেই ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। দখলদার পাকিস্তানিরা সামরিক হামলার পাশাপাশি স্বাধীনতাকামী মানুষ বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্দক প্রচারযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এর জবাব দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য-আদর্শ প্রচার ও জনগণের সংগ্রামী চেতনা জোরদার করার জন্য বাঙালিরাও জোরদার প্রচারযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশের শিক্ষক, অধ্যাপক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্র-পত্রিকা এবং বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। জাতির সেই মরণপণ সংগ্রামের নয় মাসে শত্রুর অপপ্রচারের দাঁতভাঙা জবাব প্রদান এবং স্বাধীনতার চেতনাকে শাণিত করার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সার্বিক পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন টাঙ্গাইলের আবদুল মান্নান এমএনএ। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশবাসীকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে অনুপ্রাণিত করা এবং শত্রুপক্ষের প্রচার-প্রপাগান্ডার জবাব দানের জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সংবাদ, সংবাদভাষ্য, সংবাদ পর্যালোচনা, কথিকা, নিবন্ধ, গল্প, নাটক, কবিতা, নকশা ইত্যাদি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে যারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে শওকত ওসমান, ড. আনিসুজ্জামান, ড. এ আর মলি্লক, ড. মজহারুল ইসলাম, সৈয়দ আলি আহসান, ড. সারোয়ার মুর্শিদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, রণেশ দাসগুপ্ত, এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ, জহির রায়হান, সেকেন্দার আবু জাফর, অধ্যাপক আবদুল হাফিজ, অধ্যাপক বদরুল হাসান, গাজীউল হক, আলমগীর কবীর, আলি জাকের, ওহিদুল হক, অজয় রায়, আবদুল তোয়াব খান, কামাল লোহানি, মহাদেব সাহা, মাহবুব তালুকদার, নির্মলেন্দু গুণ, সুব্রত বড়ুয়া, আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী, মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী, আমিনুল হক বাদশাহ, মোস্তফা মনোয়ার, পারভিন হোসেন, নাসরীন আহমদ, সলিমুল্লাহ এবং আমির হোসেন প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সমর দাস, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, অজিত রায়, রথীন রায়, কাদেরী কিবরিয়া, স্বপ্না রায়, রফিকুল হক, কল্যাণী ঘোষ, মঞ্জুর আহমদ, মান্না হক, অরূপ রতন চৌধুরীর নাম।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে স্বাধীন বাংলা বেতার ছিল বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামে অফুরন্ত উদ্দীপনা ও প্রেরণার উৎস। স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শোনাও ছিল বিপজ্জনক। ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি ছিল অবধারিত। তবু সেই উত্তাল দিনগুলোতে প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর বাংলাদেশের মানুষ রেডিও ঘিরে বসত স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শোনার জন্য। শুনে বৃদ্ধি পেত তাদের মনোবল ও উদ্দীপনা। বিশেষ করে এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ শোনার জন্য মানুষ সারাদিন অপেক্ষা করত কখন সন্ধ্যা হবে। শুধু বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এবং দেশান্তরী বাঙালিদের মধ্যেই নয়, চরমপত্র অনুষ্ঠানটি অসাধারণ জনপ্রিয় ছিল পশ্চিম বাংলার মানুষের মধ্যেও। চরমপত্র শোনার জন্য কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় পান-বিড়ির দোকানে ভিড় জমে যেত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আরেকটি জনপ্রিয় বেতার অনুষ্ঠান ছিল ‘আকাশ বাণী’ কলকাতা থেকে প্রচারিত ‘সংবাদ পরিক্রমা’। বেশির ভাগ দিনই সংবাদ পরিক্রমা লিখতেন প্রণবেশ সেন। আর প্রতিদিন দরাজ গলায় আবেগ দিয়ে পড়তেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সুলিখিত ও সুপঠিত ‘সংবাদ পরিক্রমার’ আবেদন ছিল বিপুল ও ব্যাপক।
এই সময়কার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’র প্রথম পৃষ্ঠায় আমার লেখা ‘মুজিব কারাগারে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’ শীর্ষক একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘আকাশ বাণীর’ ‘সংবাদ পরিক্রমা’ অনুষ্ঠানে সম্পাদকীয়টি হুবহু পাঠ করে শোনান দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা ও বিভিন্ন মুক্ত এলাকা থেকে বেশ কিছু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘জয়বাংলা’. মুজিববাহিনীর মুখপত্র ‘বাংলার বাণী’, ‘দি পিপল’, ‘জন্মভূমি’, ‘অভিযান’, ‘দাবানল’, ‘স্বাধীন বাংলা’,’বিপ্লবী বাংলাদেশ’, ‘বাংলার মুখ’ প্রভৃতির নাম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণার জন্য প্রকাশিত এসব পত্রপত্রিকা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব পত্রিকা নিয়ে কেউ ধরা পড়লে তার একমাত্র শাস্তি ছিল তাৎক্ষণিক প্রাণদণ্ড। তবে তার মধ্যেও বিশেষ করে সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ ও ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা দুটি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে দেশের ভেতরে পাঠানো হতো। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার ও জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সর্বাত্দক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে। সেই ধারাতেই সরকারের উদার সহায়তা পেয়েছে বিপ্লবী সরকার, মুক্তিযোদ্ধা এবং বেতার-পত্রপত্রিকা। আর রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইকে বেগবান করার জন্য নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা প্রচার মাধ্যমে কাজ করেছেন অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার চেতনাই ছিল তাদের প্রেরণার উৎস। তবে কলকাতায় যে থিয়েটার রোডকে কেন্দ্র করে শুধু স্বাধীনতার লক্ষ্যেই সর্বাত্দক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে তা নয়, সেখানে বসে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্তও চালানো হয়েছে। এই কুচক্রীদের নাটের গুরু ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। তার বিশিষ্ট সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন মাহবুবুল আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখ। স্বাধীনতার পরিবর্তে কনফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আপসরফায় পৌঁছার জন্য মার্কিন কূটনীতিকদের সহযোগিতায় ষড়যন্ত্র করেছিলেন মোশতাক এবং তার সহচররা। তবে এটা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মোশতাকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং তাকে জাতিসংঘে লবিং-এর জন্য প্রেরিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধানের পদ থেকে বরখাস্ত করে প্রতিনিধি দল থেকেই বাদ দেওয়া হয়। সম্পাদক, ডেইলি সান

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ