Home / অর্থনীতি ও বানিজ্য / সুপারশপে চলছে কোটি টাকার ‘ফাও কামাই’
সুপারশপে চলছে কোটি টাকার ‘ফাও কামাই’

সুপারশপে চলছে কোটি টাকার ‘ফাও কামাই’

গ্রাহককে খুচরা পয়সা না দিয়ে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা ‘অবৈধ’ পথে আয় করছে দেশের সুপারশপগুলো। বিপুল গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া এই টাকা পকেটস্থ করছেন শপ-মালিকরা। আর বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনেও নিচ্ছেন গ্রাহক।

মেশিনে নির্ভুল হিসাবের নামেই গ্রাহকের পকেট কাটছে সুপারশপগুলো।

সুপারশপগুলোতে দেখা যায় গ্রাহকের পণ্যমূল্য শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই খুচরো পয়সায় চলে যাচ্ছে। আর মেশিন যখনই খুচরা পয়সা দেখাচ্ছে বিক্রয়কর্মী তা পুরো টাকায় হিসাব করে গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি আদায় করছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, সুপারশপগুলোর এই আচরণ অসততার সামিল।

তাদের মতে, সাধারণ মুদি দোকানে হিসাবটি থাকে পুরো টাকার। কেবল সুপারশপেই মেশিনের হিসাবে খুচরা পয়সা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ৯৯.২০ টাকার বাজার করে ক্রেতা ১০০টাকা দিচ্ছেন।

‘সামান্য ৮০ পয়সা’র জন্য ক্রেতা কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু তা থেকে বছর শেষে কোটি টাকা বানিয়ে নিচ্ছেন সুপারশপ মালিকরা।

দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত জেমকন গ্রুপের সুপারশপ মিনাবাজার ও রহিম আফরোজের আগোরাসহ রিটেইল চেইন স্বপ্ন, আলমাস, নন্দন মেগাশপ, মোস্তফা মার্ট, মেহেদী মার্টসহ বিভিন্ন সুপারশপের আউটলেটগুলোতে ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

এক্ষেত্রে বিক্রেতারা একটাই অজুহাত দেখাচ্ছেন। আর তা খুচরা পয়সা না থাকার অজুহাত।

সুপারশপগুলোর বিক্রেতাদের দাবি, যদি পণ্যমূল্য টাকার অংক ছাড়িয়ে পয়সায় গড়ায় এবং তা ৫০ পয়সার নিচে হয় তাহলে ক্রেতার কাছ থেকে কম নেওয়া হয়। আর যদি ৫০ পয়সার ওপরে চলে যায় তাহলে বিক্রেতা পুরো টাকাটি নিয়ে নেবে।

একথা বাংলানিউজকে বলেছেন আগোরার মার্কেটিং ম্যানেজার আশরাফুল হাসান। অন্য সুপারশপগুলোর কর্তৃপক্ষেরও একই দাবি।

কিন্তু সরেজমিন গিয়ে তাদের কথার সাথে মিল পাওয়া যায় নি বাস্তবের। মিনাবাজারের ক্রেতা শাহনাজ নূর বাংলানিউজকে জানান, তিনি মিনাবাজার থেকে ৮০ টাকার পণ্য কিনে ভ্যাটসহ ৮৩ টাকা ২০ পয়সার বিল হাতে পান। এবং তার কাছ থেকে আদায় করা হয় ৮৪ টাকা। (মেমো নং.আইএনভি/৮৪২৫৬৭/পিওএস৩২০৯১২)

নাসরিন বেগম নামে অপর এক ক্রেতা একই অভিযোগ করেন। তিনি জানান, প্রতিবার ১০ বা ২০ পয়সার জন্য তার কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হয়েছে।

নাসরিন বলেন, দুই-একবার ক্যাশিয়ারকে বলার চেষ্টা করেছি। তারা কোনো উত্তর দেন না। এজন্য তো আর ঝগড়া করা যায় না।

মিনাবাজারের মগবাজার আউটলেট থেকে একজন ক্রেতার মোট বিল ৫০৪.৪০ টাকার বিপরীতে ৫০৫ টাকা আদায় করতে দেখা যায়। (মেমো নং.আইএনভি/৮৩৫৪৮৮/পিওএস৩২০৯১১)।

রেজাউন নাহার নামে এক ক্রেতা জানান, তিনি আগোরার ধানমণ্ডি আউটলেট থেকে ৬৯ দশমিক ৬৮ পয়সা দিয়ে একটি কিশান চকলেট বিস্কুটের প্যাকেট কেনেন। তবে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩২ পয়সাসহ ৭০ টাকা রাখা হয়েছে। (ট্রানসেক-১০৪০৪৭)

প্রতিবারই সুপারশপগুলো এরকম করে খুচরা পয়সা আদায় করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কম নিতে দেখা যায় না কখনোই। বেশিই আদায় করে নেয়। এটা শপগুলোর ‘ফাও কামাই’, বলেন এই ক্রেতা।

এদিকে, ক্রেতা থেকে খুচরা পয়সা আদায়ের এই চর্চাকে ব্যবসানীতিরই অংশ বলেই দাবি করেছে সুপারশপ মালিক পক্ষ।

আগোরার মার্কেটিং ম্যানেজার আশরাফুল হাসান বলেন, সুপারশপের মালিকরা একমত হয়ে বাজারের বিলে ৫০ পয়সা কিংবা তার বেশি হলে ১ টাকা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ৫০ পয়সার নিচে বিল হলে তা গ্রাহকের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়।

তার মতে, ‘এতে প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ টাকা এদিক সেদিক হয়।’

মিনাবাজারের প্রধান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা শাহিন খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৫ আর ৫০ পয়সা সরবরাহ না থাকায় সুপারশপগুলোতে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহীন খান এমন ঘটনাকে অপারেটরের ‘নিছক ভুল’ বলে দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন।

একই ধরণের ‘ভুল’ নিয়মিত করে ইন্টারন্যাশনাল চেইন মোস্তফা মার্ট। সরেজমিন মোস্তফা মার্টে গিয়ে দেখা গেছে, ৮৫ টাকা মূল্যের একটি ক্লোজআপ পিপারমেন্ট টুথপেস্টের দাম ৩.৪৬ টাকা ‘ভ্যট’সহ ৯০ টাকা নেয়া হচ্ছে। ৫৪ পয়সা সমন্বয় করে ১ টাকা খুচরা দেওয়া যাবে না বলে পুরো ১ টাকা ৫৪ পয়সা বেশি নিচ্ছে তারা। (বিল-সিএ১৩-১৭৬২২১)

অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে কথা বলার মতো কেউ অফিসে নেই বলে জানান মোস্তফা মার্টের বিক্রেতারা।

সুপারশপগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে রিটেইল চেইন মিনাবাজার, আগোরা, আলমাস, নন্দন, স্বপ্ন, মেহেদী ও মোস্তফা মার্টের সব মিলিয়ে ছোট বড় মিলে দুই শতাধিক আউটলেট রয়েছে।

এসব আউটলেটে প্রতিদিন ক্রেতার সংখ্যা চারশ’ থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত ওঠানামা করে। গড়ে দিনে একটি আউটলেটে ৭০০ ক্রেতা হলে এক লাখ ৪০ হাজার ক্রেতা কেনাকাটা করেন। যাদের কাছ থেকে প্রতিটি লেনদেনে কমপক্ষে ৪০ পয়সা করে নিলেও দিনের আয় দাঁড়ায় ৫৬ হাজার টাকা। আর বছরে তা ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

অবৈধ এই টাকা আয় হিসেবে না থাকায় আয়করও দিতে হয় না।

শুধু খুচরা পয়সার বাণিজ্য নয়! এর সাথে বাধ্যতামূলক লজেন্স-ক্যান্ডি বিক্রি থেকেও ফায়দা লুটছে সুপারশপগুলো। খুচরা পয়সাতো দুরের কথা গ্রাহকের বিলের সাথে দুই বা তিন টাকা পাওনা থাকলে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অ্যালপেনলিবে, কফিকো, মিস্টার ম্যাঙ্গো, লিচিজ এর লজেন্স কিংবা ক্যান্ডি।

একজন ক্ষুব্ধ ক্রেতা বলেন, লাভের উপর দ্বিগুণ লাভ। লেনদেনে খুচরা পয়সাতো নিয়েই নিচ্ছে, তার উপর ২-৩ টাকা না দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লজেন্স। তা ক্রেতা চান কি না চান।

অধিকাংশ সুপারশপই দিনে দেড় থেকে দু’হাজার লজেন্স দিয়ে দিচ্ছে খুচরা টাকার পরিবর্তে।

এতেও চলছে লাখ লাখ টাকার বিক্রয় ও মুনাফা।

ক্রেতা শাহনাজ নূর বলেন, “বিষয়টি অতিরিক্ত পয়সা আদায়ের নয়। বরং বিষয়টি বিবেক দিয়ে ভাবার। দিনে শত শত সুপারশপের আউটলেটে আমার মত হাজার-হাজার ক্রেতা থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছে, তবুও গ্রাহকের জন্য এক পয়সা ছাড় দিতে রাজি নয় তারা।”

তিনি বলেন, যাদের ইউরোপ আমেরিকায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা জানেন, যেকোনো দোকানে খুচরা পেনি, স্টার্লিং পাওয়া যায়। আর সেগুলো গ্রাহকের কাজেও লাগে। গাড়ি পার্কিং, লন্ড্রিসহ বিভিন্ন কাজেও লাগে এই খুচরা কয়েন।

শাহনাজ বলেন, এছাড়া খুচর‍া পয়সা এক ধরনের সঞ্চয়ও।

তার ভাষায়, বাজার থেকে ফেরা খুচরা পয়সা জমিয়ে রাখা অনেকেরই অভ্যাস। এবং সেই জমানো পয়সা এক সময় হাজার টাকায়ও দাঁড়ায়। বিশেষ করে নারীদের এগুলো জমানোর অভ্যাস চিরাচরিত।

কিন্তু সুপারশপগুলো সেই সুযোগ কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক ক্যান্ডি খাওয়াছে, বলেন ক্ষুব্ধ শাহনাজ নূর।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ