Home / রাজধানী / আতঙ্কের নগরী ঢাকা

আতঙ্কের নগরী ঢাকা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ এবং ক্ষমতাসীন দলের ডাকা পাল্টা পতাকা নিয়ে প্রতিরোধ মিছিলকে কেন্দ্র করে গতকালের রাজধানী ছিল রীতিমতো আতঙ্কের নগরী। আগের দিনের মতো গতকাল ভোর থেকেই নগরীর রাজপথ ছিল অনেকটাই যানবাহনশূন্য। তাই দুর্ভোগের শেষ ছিল না রাজধানীবাসীর। যানবাহনের অভাবে পথেই অসুস্থ বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পতাকা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা রাজপথ দখলে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকলে এই আতঙ্ক ও উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে তীব্র শীত এবং ঘন কুয়াশার কারণে অনেকটা ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করেছিল নগরজুড়ে।
বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, কোনো ধরনের বাহন না পাওয়ায় অফিসগামী মানুষের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে হেঁটে কর্মস্থলের দিকে রওনা হয়েছিলেন। তবে কিছু পথ পরপরই ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশি তল্লাশি নগরবাসীর আতঙ্কের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তল্লাশি থেকে বাদ পড়েনি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও। একই সঙ্গে জামায়াত-শিবির সন্দেহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পথচারীদের গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। জরুরি প্রয়োজনে অনেকে ঘর থেকে বের হলেও কাজ শেষে দ্রুত বাসায় ফিরে গেছেন। তাদেরই একজন বাংলামোটর এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হোসেন নভেল। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাইরে! আমার অফিস উত্তরায়। সকাল ৮টার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হয়। এ কারণে ভোর ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাস কিংবা অটোরিকশা পাইনি। পরে বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে আসি।’ দারুসসালাম এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বাবলু। বেলা ২টার দিকে কল্যাণপুর বাজার থেকে সদাই কিনে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন। তার চোখমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট। কথা বলতে চাইলেই তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, বাজারে আসতেই দুই দফা চেকিং করেছে পুলিশ। আমার প্রতিবেশী দুজনকে বিনা কারণে গ্রেফতার করেও নিয়ে গেছে। এখন শুনছি ছাড়াইতে অনেক টাকা চাচ্ছে পুলিশ। কই যাব ভাই বলতে পারেন? দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে? বলেই দ্রুত হাঁটতে শুরু করেন তিনি। অন্যদিকে, রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তল্লাশির নামে বাড়াবাড়ির কারণে অনেকেই রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারেননি। টঙ্গী কলেজ গেট এলাকার বাসিন্দা লিমন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিসে ফোন করে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘উত্তরা পাঁচ নম্বর সেক্টরে আমার কর্মস্থল। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের অফিসের আইডি কার্ড দেখানোর পরও তারা আমাকে রাজধানীতে ঢুকতে দেয়নি। পরে আমি বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে যাই। আমার মতো অন্তত শতাধিক লোককে আমি আবদুল্লাপুর এলাকায় দেখেছি। এটা কি গণতন্ত্র? আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?’ অন্যদিকে, বিকল্প যান হিসেবে বিভিন্ন পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও রোগীদের দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় রিকশা, সিএনজি, ট্যাঙ্কি্যাব, ভ্যানগাড়ি এমনকি পণ্য পরিবহনের পিকআপ ভ্যানে চড়ে যাতায়াত করতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় যানবাহনের অভাবে রোগীরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে পারেননি। পথেই মৃত্যুবরণ করেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা মাবিয়া বেগম। রবিবার দেশব্যাপী প্রকাশিত জিএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশীদের ফল আনতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর বাহন না পেয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটাপথেই পাড়ি জমান সাধারণ মানুষ। সরকারি স্টাফবাস ছাড়া বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস রাস্তায় একেবারেই দেখা যায়নি। তুরাগ, এলাইক নামের দু-একটি বাস চলতে দেখা গেলেও এসব বাসে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। একটি বাস আসা মাত্রই শ শ যাত্রীর তাতে হামলে পড়তে দেখা যায়। এমনকি সরকারি বিআরটিসি বাস কাউন্টারও গতকাল বন্ধ ছিল। যানবাহন সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হেঁটেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাড়িতে ফিরতে দেখা যায়। তবে গতকাল জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন ফলাফল প্রত্যাশী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। ভিকারুনি্নসা স্কুলের এক জেএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক মুক্তা বেগম বলেন, ‘মেয়েকে নিয়ে সকালে মিরপুর থেকে ফল নিতে ঘর থেকে আতঙ্ক নিয়ে বের হই। বের হয়েই কোনো বাস না পেয়ে তিনগুণ সিএনজি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাই। ফেরার পথে কোনো বাহন না পেয়ে রিকশা যোগে তিনবার ভেঙে ভেঙে বাসায় ফিরি। সারাটা পথেই মা-মেয়ে আতঙ্কিত ছিলাম।’ এদিকে গতকাল দুর্ঘটনার আশঙ্কায় নগরীর বিভিন্ন ওষুধের দোকান, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ থাকায় রোগী ও তাদের আত্দীয়স্বজনদের বিপাকে পড়তে হয়। যানবাহন না পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী ও পঙ্গু হাসপাতালে রোগীদের স্বজনদের তাদের রিকশা ও ভ্যানে করে নিয়ে আসতে দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘আজ (রবিবার) কী হবে? এ বিষয়টি নিয়ে গতকাল সকাল থেকেই নগরবাসীর অনেকেই দারুণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছিলেন। বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এবং এর কিছুক্ষণ পর সুপ্রিমকোর্টের অভ্যন্তরে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের নারকীয় হামলা, মালিবাগে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু, কমলাপুরে বোমা বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ