Home / ফিচার / ‘এক-এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়’

‘এক-এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়’

ফরহাদ মজহার

শেখ হাসিনা দারুণ! তাঁর দলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহায়তায় যখন লাঠি হাতে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও কিম্বা সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে পুলিশের প্রশ্রয়ে গেট ভেঙে ঢুকে আইনজীবীদের নির্দয় ভাবে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, আর পেটাচ্ছে নারী আইনজীবীদেরÑ শেখ হাসিনা তখন বলছেন, ‘এক-এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষক্ষমতায় আনতে চান’। তখন তাঁকে বেশ গুরুগম্ভীর বুদ্ধিজীবীর মতোই মনে হচ্ছিল।

দারুণ যে খালেদা জিয়াকে কোনো কর্মসূচিই পালন করতে হয় নি। তিনি ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র’ রার জন্য অভিযাত্রার ডাক দিয়ে যে রাজনৈতিক ফল পাবার আশা করেছিলেন, তার চেয়ে দশ গুণ বেশি ফল পেয়ে গিয়েছেন ক্ষমতাসীনদের কারণে। তিনি আন্দোলনের ধরন বদলাতে চেয়েছেন, কারণ ধর্মঘট ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে যে অনিবার্য সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার, সেই অবস্থা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। খালেদা জিয়া যেখানে হরতাল বা অবরোধ-ধরনের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, সেখানে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের চেয়েও আরো কড়া অবরোধ আরোপ করলেন। খালেদা জিয়ার কর্মসূচিতে কিছু কিছু গণপরিবহন নামত, রিকশা টেম্পো চলত, মানুষ হাঁটত। এবার হাঁটতেও বাধা দিয়েছে পুলিশ। দুর্দান্ত অবরোধ কর্মসূচি পালন করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়া তাঁর গণতন্ত্রের অভিযাত্রা চালিয়ে যাবেন, শেখ হাসিনার অবরোধও চলবে। শেখ হাসিনার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা খুবই সফল। এতটাই সফল যে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বাসা থেকে বেরোতেই পারেন নি। তাঁকে পুলিশ গেটের বাইরে এক কদমও অগ্রসর হতে দেয় নি। শেখ হাসিনা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তুলনায় বাকশালী শেখ মুজিবুর রহমান শুকনা আমসত্ত্বের মতো প্রাচীন হয়ে গিয়েছেন।

ফলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিরোধী দলের কর্মসূচি ‘ব্যর্থ’ বললেও তাতে বিশেষ কিছুই আসে-যায় না। ব্যাপারটা কর্মসূচির সফলতা-ব্যর্থতার মামলা নয়। কর্মসূচি দেওয়া সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফল লাভের জন্য। সেই দিক থেকে খালেদা জিয়ার জয়ই হয়েছে। যদি খালেদা জিয়ার জয় হয়েছে সেই কূটতর্কে যেতে না চাই তাহলে এটা অনায়াসেই মেনে নেওয়া যায় যে, ২৯ তারিখের গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় ক্ষমতাসীনদের নির্লজ্জ পরাজয় হয়েছে। আজ একই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। থাকুক। এই ফাঁকে আমরা এক-এগারোর কুশীলবদের কথা বলি।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এক-এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনতে চান’। কারেক্ট। কিন্তু তারা শুধু এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে তা নয়, তারা বরাবরই সক্রিয় ছিল। আমাদের মনে আছে এক-এগারোর সময় ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সক্রিয়তার পাশাপাশি এখনকার কুশীলবরাই সক্রিয় ছিলেন। শেখ হাসিনাও এক-এগারোর সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না। এক-এগারোর কুশীলবরা দাবি করেছিলেন তাঁদের কারণেই সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এই সফলতায় তাঁরা গর্ব প্রকাশ করেছিলেন। সন্দেহ নাই সেই কুশীলবরা বাংলাদেশে বহাল তবিয়তেই আছেন। তাঁরা তাঁদের সক্রিয়তা মোটেও কমান নি। এটাও শেখ হাসিনাকে ভুলে গেলে চলবে না যে এক-এগারোর কুশীলবদের সক্রিয়তার সাড়ে ষোল আনা সুফল ভোগ করেছেন তিনি নিজে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর জয় এক-এগারোর কুশীলবদের ভূমিকা ছাড়া কখনই সম্ভব হতো না।

এক-এগারো সম্পর্কে সাধারণ অনুমান হচ্ছে, এটা একটা ষড়যন্ত্র। রাজনীতিতে সবসময় ষড়যন্ত্র থাকে, এই অর্থে যে কাউকে-না-কাউকে কিছু ঘটনা ঘটাতে হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র দিয়ে রাজনীতি বোঝা অসম্ভব। আসলে যখন রাজনীতির গতিপ্রক্রিয়া কেউ আর ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন সেই রহস্যময় জায়গাটাকেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে বুঝ দেবার শর্টকাট পথ গ্রহণ করা হয়। এক-এগারোকে বুঝতে হলে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে নয়, বুঝতে হবে বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ দিয়েই।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটা সংস্কার দরকার- এর পক্ষে একটা জনমত আছে। সেই সংস্কার শুধু রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়, জনগণের দিক থেকে তাগিদটা খোদ রাষ্ট্রের সংস্কার, এমনকি সম্ভব হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এক-এগারোর কুশীলবদের বুঝতে হলে বুঝতে হবে তারা আসলে ঠিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপান্তরে আগ্রহী নয়, এমনকি সংস্কারেও নয়। সংস্কার করতে হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিদেনপক্ষে এমন এক গণক্ষমতা তৈয়ার করা দরকার, যা সংস্কার করতে সম। এটাও কম কঠিন বা র্যাডিক্যাল নয়। কিন্তু সে গণক্ষমতা তৈরিতে তারা রাজি নয়। ফলাফলে দাঁড়ায় আসলে তারা কোনো রূপান্তর দূরে থাকুক সংস্কারেই আগ্রহী নয়।

বরং তাদের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা এবং তাদের দুর্নীতি ও কুকীর্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা দরকারি কাজ। ফলে যারা এ কাজ করেন তারা জনগণের পইে কাজ করেন। এক-এগারোর কুশীলবরাও এ কাজ করেন। কিন্তু একই কাজ করার পরেও এক-এগারোর কুশীলবদের আমরা চিনতে পারি যখন সুযোগ পেলেই তারা খোদ রাজনীতিরই নিরাকরণ ঘটাতে চায়। একে সাধারণত বিরাজনীতিকরণ বলা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কুকীর্তিতে বীতশ্রদ্ধ জনগণ রাজনৈতিক দল বাদ দিয়ে বা রাজনীতি বাদ দিয়ে যদি শান্তিতে থাকতে পারে, সে আশায় বিরাজনীতিকরণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এক-এগারোর কুশীলবদের রাজনীতিতে ভূমিকা পালনের শর্ত এভাবেই তৈরি হয়। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোই প্রধানত দায়ী।

এই দিক থেকে এক-এগারোর কুশীলবরা বাংলাদেশের একটি বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধি বটে। যারা এই চিন্তা ধারণ করেন তারা দলীয় রাজনীতিতে বিতৃষ্ণ, প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য তারা প্রায়ই দিবাস্বপ্ন দেখেন। এই দিবাস্বপ্নের নাম তৃতীয় শক্তি। তাদের মনের গোপন বাসনা এই যে তাঁরাই হবেন সেই তৃতীয় শক্তি। কিন্তু বিদ্যমান দলগুলোর বাইরে তাদের নিজেদের কিছু করবার ক্ষমতা নাই। ক্ষমতার লড়াই কখনই খুব আরামের কাজ নয়, বাংলাদেশের মতো দেশে সেটা সহিংস রূপ নেয় বাস্তবতার কারণেই। কিন্তু যারা রাজনৈতিক সংস্কার চান তারা চান সেটা শান্তিপূর্ণ ও অহিংস হোক। দুই দলের ক্ষমতার বাইরে জনগণের ক্ষমতা বিকাশের পথ কঠিন ও বন্ধুর। এক-এগারোর কুশীলবরা কণ্টকাকীর্ণ ও কঠিন পথে যেতে নারাজ। ফলে তারা ঢোঁক গিলে বাস্তবিক কারণেই মেনে নেন যে তৃতীয় শক্তি আসলে ‘সেনাবাহিনী’।

কারণ সশস্ত্র ও সহিংস রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে সশস্ত্র ক্ষক্ষমতা হিসেবে একমাত্র সেনাবাহিনীকেই তারা বাস্তবে দেখতে পায়। আর আসলে এটাই বাস্তব পরিস্থিতি। তৃতীয় শক্তি হিসেবে এক-এগারোর কুশীলবরা ক্ষমতাধর হয়ে সমাজে হাজির হবার একমাত্র সম্ভাবনা সেনাসমর্থন; এ ছাড়া তাদের বাসনা চরিতার্থ করা কঠিন। কিন্তু সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে যুক্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই এর ফলে সমাজের বিশেষ একটি শ্রেণি, সেনাবাহিনী ও পরাশক্তির একটা ত্রিভুজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আগেই বলেছি ওর পেছনে থাকে বিদ্যমান রাজনীতির সংস্কারের আকাঙ্খা। এতটুকুই মাত্র এর ইতিবাচক দিক। সেই আকাক্সার আর্থ-সামাজিক কারণ হিসেবে হাজির থাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির গতিশীল বিকাশের সম্ভাবনা। বিদ্যমান রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর কুকীর্তির কারণে যে সম্ভাবনা নষ্ট হবার বিপদ তৈরি হয়। যেমন, বলা হয়, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবার সম্ভাবনায় টইটম্বুর। কিন্তু সে সম্ভাবনা বানচাল হতে বসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর কুশাসনের জন্য। কথাটা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। সে কারণেই কুশাসনের জায়গায় আমরা প্রায়ই সুশাসনের কথা শুনি।

এই বিপদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘দুর্নীতি’। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে এক-এগারোর কুশীলবদের রাজনৈতিক প্রপাগান্ডায় সবচেয়ে প্রধান অস্ত্র ছিল দুর্নীতি। একে আমি উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়েছি। এ কারণে যে অর্থশাস্ত্র দুর্নীতি মাত্রই মন্দ- এই নীতিবাদী বাচালতার কারবার করে না। দুর্নীতি ছাড়া পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের বিকাশ ও বিস্তার চিন্তাই করা যায় না। পুঁজিতন্ত্র চাই, কিন্তু দুর্নীতি চাই না, এটা তো হতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে দুর্নীতির দ্বারা উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যাচ্ছে, নাকি পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। নাকি সেই দুর্নীতি নির্লজ্জভাবে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার যেমন।

বাংলাদেশের দুর্নীতিকে বুঝতে হলে এখানে পুঁজি গঠন এবং পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিশেষ ধরন বিচার করা দরকার। সেটা করতে হলে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলোর ভূমিকা, কাঠামোগত সংস্কার, অবাধ বিনিয়োগ ও অবাধ বাজারব্যবস্থা, রফতানিমুখী উন্নয়ননীতিসহ আরো নানান দিক পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্তভাবে নীতিবাদী কায়দায় ‘দুর্নীতি’র মূল্যায়ন বালখিল্যতা ছাড়া কিছুই নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের হাড় মাংস মজ্জা পানি করা যে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে ও বিস্তার ঘটছে, সেই অসহনীয় ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট চরিত্র বোঝার দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করাই এ ক্ষেত্রে আসল কাজ। অর্থাৎ দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সংস্কার করতে হবে আসল জায়গায়। এর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে গণক্ষমতা তৈরির কাজ। সেটা না করে এক-এগারোর কুশীলবরা দুর্নীতির চরিত্র বিচার করে শুধু জনগণের ‘উপলব্ধি’র মাত্রা দিয়ে। পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণের উপলব্ধি দিয়ে দুর্নীতি পরিমাপ করা হয়। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হয়ে পড়ায় সেটা মুখ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সেটা ভালো। এক-এগারোর কুশীলবদের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে তারা রাজনীতি বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারে কিম্বা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনাতে মোটেও আগ্রহী নয়। তারা বরং বিদ্যমান ব্যবস্থায় জনগণের ক্ষোভে আশ্রয় করে তাকে ততটুকুই প্রশমন করতে রাজি যতটুকু বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সহনীয় করে তুলতে কাজে লাগে।

রাজনীতিতে এক-এগারোর কুশীলবরা রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে বাংলাদেশে ‘সুশাসন’ কায়েম করতে চায়। এই অর্থে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের চেয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজি এবং বহুজাতিক করপোরেশানের জন্য একটি স্থিতিশীল ও ঝামেলামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এ কারণেই ‘বিরাজনীতিকরণ’ (depoliticisation) কথাটা চালু হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের বিরোধের জায়গাটা হচ্ছে স্থিতিশীলতা বহাল রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা।

সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথাটা এই স্থিতিশীলতা রার প্রয়োজনেই ওঠে। সেটা জনগণের স্বার্থ পাহারা দেবার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বহুজাতিক কম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও মুনাফা নিশ্চিত করবার জন্যই। অতএব বিরাজনীতিকরণ কথাটা বুঝতে হবে আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থে।

বিরাজনীতিকরণেরও রাজনীতি আছে। বুঝতে হবে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তি অর্জনের বিপরীতে বিদ্যমান ব্যবস্থার টিকিয়ে রাখবার রাজনীতি হিসেবে।

এ কারণে ‘সুশাসন’ বলাবাহুল্য গণতন্ত্র নয়, করপোরেট শাসন। গুড গভর্নেন্স। প্রথমেই এটা পরিষ্কার বুঝতে হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি পলাশীর যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে এ দেশের ‘শাসনভার’ তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেয়। সেটা ছিল ঔপনিবেশিক শাসন। সেটাও ছিল ইংরেজদের দিক থেকে সুশাসন। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন আজ আর নাই, বা নৈতিকভাবে বহাল রাখা অসম্ভব। সেই জায়গায় বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে সুশাসন কায়েম জরুরি হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ঔপনিবেশিকতা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবার উঠতি সময়। এখন দুনিয়াজোড়া বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। আমরা সেই ব্যবস্থার প্রান্তে আছি, কেন্দ্রে নয়; আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাগের যে অবস্থানে রয়েছি সেখানে আমাদের বেঁচে থাকবার একমাত্র পথ হচ্ছে সস্তা শ্রম বেচা- দেশের ভেতরে বা বাইরে। এমন এক শ্রম যার জীবসত্তার কোনো মূল্য নাই। একে পুড়িয়ে মারা যায়, বিল্ডিং ভেঙে চাপা দিয়ে জ্যান্ত কবর দেওয়া যায়, মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে সূর্যের দহনে দগ্ধ করা যায়, কিম্বা মালয়েশিয়ার রাবার বাগানে সাপের কামড়ে মরতে পাঠানো যায়, ইত্যাদি।

নিরন্তর পুঁজির পুঞ্জীভবন ও আত্মস্ফীতি ঘটছে, সেটা একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে অবাধ রাখতে বাজারব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের কোনো প্রকার হস্তপে বরদাশত করা হয় না। রাষ্ট্রকে এ কাজ করতে না দেওয়াও ‘সুশাসন’-এর অন্তর্গত। বিনিয়োগ ও উন্নয়নের একমাত্র এজেন্ট বা চালিকাশক্তি হচ্ছে বহুজাতিক করপোরেশান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে পুঁজির দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক ধরন, যাকে আমরা সাধারণত বহুজাতিক করপোরেশান বলি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরন্তর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক অসাম্য, দারিদ্র্য ও সামাজিক অসন্তোষ সামাল দেওয়া। বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত সরকার কায়েম করাই এক-এগারোর কুশীলবদের প্রধান কাজ ছিল না। তাদের কাজ ছিল পুঁজির অবাধ বিনিয়োগ ও মুনাফা কামাবার জন্য প্রয়োজনীয় ‘রাজনৈতিক’ স্থিতিশীলতা ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হলে, বলা বাহুল্য, সবসময়ই স্থিতিশীলতার জন্য সুশীলসমাজ, সেনাবাহিনী ও পরাশাক্তির আঁতাত অনিবার্য ভাবেই গড়ে ওঠে। এখানে কোনো ষড়যন্ত্রের দরকার পড়ে না।

বাংলাদেশে আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এবার এই অবস্থা তৈরিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন শেখ হাসিনা। এটা পরিষ্কার। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, এক-এগারোর কুশীলবরা সংবিধানের মধ্যে থেকে কিভাবে শেখ হাসিনাকে মোকাবিলা করা যায় তার ফর্মুলা বের করবার জন্য প্রাণান্ত হয়ে যাচ্ছেন। সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে এক-এগারোর পরিস্থিতি তৈরি হলে অবাক হবার কিছু নাই। শেখ হাসিনার নাসিকা প্রখর। তিনি ধরে ফেলেছেন কিছু একটা পরিকল্পনা চলছে।

এবার এক-এগারোর ঘটনা ঘটলে জনগণের দিক থেকে হয়তো এই মুহূর্তে কোনো ইতরবিশেষ বা ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। দেখা যাক কী হয়!!

ফরহাদ মজহার: কবি, কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ই-মেইল : farhadmazhar@hotmail.com

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ