Home / জাতীয় / অবরুদ্ধ ঢাকায় সীমাহীন দুর্ভোগ

অবরুদ্ধ ঢাকায় সীমাহীন দুর্ভোগ

শনিবার রাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজধানীর দারুস সালাম থানাধীন কাউন্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মাবিয়া বেগম। যানবাহন না পাওয়ায় সে রাতটুকু কোনোমতে বাড়িতেই কাটাতে হয় স্বজনদের। রোববার ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই একটি রিকশাভ্যানে মাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা দেন ছেলে মোহাম্মদ আলী। কাউন্দিয়া গ্রাম থেকে গাবতলী বাস টার্মিনাল—চলে পুলিশের কয়েক দফা তল্লাশি। সময় যায়। বাড়তে থাকে অসুস্থতা। এরপর মাজার রোড ও কল্যাণপুরে আরও কয়েক দফা তল্লাশি চালায় লাঠিসোটা হাতে সরকারদলীয় সংগঠনের কর্মীরা। এক সময় কল্যাণপুরে রিকশাভ্যান থেকে নামিয়েও দেওয়া হয় তাদের। অসুস্থ মাকে নিয়ে তবুও অসহায় ছেলে ছোটেন হাসপাতালের পথে। শেষতক হাসপাতালে পৌঁছলেন। কিন্তু ততক্ষণে মা আর নেই। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানিয়ে দিলেন—মৃত।
হাসপাতালের বারান্দায় ছেলে যখন অঝোরে কাঁদছিলেন মায়ের জন্য, তখন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল অঙ্গনে সরকারের পক্ষে মিছিল করছিলেন চিকিত্সকরা। সামনের রাস্তায় সতর্ক প্রহরা সরকারদলীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের। আর ছেলে মোহাম্মদ আলী বলছিলেন, আমরা কী অপরাধ করছিলাম? কেন আমার মাকে হারাতে হল? এই রাজনীতি কি আমার মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?
গতকাল ছিল ১৮ দলীয় জোটের ঢাকা অভিযাত্রা ও সমাবেশ—জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় রাজধানীতে বিরোধী দলকে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। কিছু রিকশাভ্যান বা রিকশা চলাচল করলেও কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি আরোহীদের। পথে পথে পড়তে হয়েছে বিপাকে। প্রাণ দিয়ে সে রাজনীতির খেসারত দিতে হল অসহায় মা মাবিয়া বেগমকে।
গতকাল কার্যত অবরুদ্ধ ছিল ঢাকা। দূরপাল্লার মতো গতকাল রাজধানী শহরের ভেতরে কোনো বাস চলেনি। বাসের অভাবে দিনভর কর্মব্যস্ত ঢাকাবাসী হেঁটে, রিকশায়, রিকশাভ্যানে চলেছেন। কাউকে কাউকে মালবাহী পিকআপ ভ্যানে চড়ে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। কল্যাণপুর, ফার্মগেট, মিরপুর, সায়েদাবাদসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকার-সমর্থকরা লাঠির মধ্যে জাতীয় পতাকা বেঁধে মিছিল করেছে। পাহারা বসিয়েছে বিভিন্ন স্টপেজে। সকাল থেকেই গাবতলী টার্মিনালের প্রবেশমুখ দখল করে সতর্ক প্রহরা বসায় সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠনগুলো। সব ধরনের যানবাহনে চালানো হয় তল্লাশি। রিকশা বা ভ্যানও নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে। মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে কোনো বাস বের হতে দেননি সরকার-সমর্থক পরিবহন নেতারা। লাঠি হাতে পাহারা দিয়েছেন সারাদিন। রাজধানীতে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার রাতেই পুলিশ ও সরকার-সমর্থক পরিবহন নেতারা তাদের বলে দিয়েছেন, শনিবার থেকে কোনো বাস রাস্তায় না নামাতে। নামালে গাড়ি রিকুইজিশনেরও হুমকি দেন তারা। ঢাকায় কোনো ট্রেনও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। গন্তব্য থেকে ছেড়ে আসা কিছু ট্রেন, পথে পথে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বলেও রেল কর্মকর্তারা জানান।
ঢাকার অফিস আদালতে উপস্থিতি ছিল কম। অঘোষিত কারফিউ বিরাজ করেছে নগর জুড়ে। বিভিন্ন জায়গায় দফায় দফায় সংঘর্ষ—বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ। নিতান্তই জরুরি কাজে যারা বের হয়েছেন, পদে পদে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাদের। ঘরে না ফেরা পর্যন্ত চরম উত্কণ্ঠায় সময় কেটেছে স্বজনদের। দুর্ভোগের কথা বললেন বগুড়া থেকে রাজধানীতে এসে আটকে পড়া আজগর আলী। সকাল ৭টায় মহাখালী থেকে রওনা দেন মতিঝিলের উদ্দেশে। কিছু পথ হেঁটে, কিছুটা রিকশাভ্যানে করে সকাল ১০টায় পৌঁছে দেখেন অফিস বন্ধ। তারপর আবারও ঠিক একইভাবে অনেক কষ্টে দুপুর দেড়টায় পৌঁছান মহাখালীতে। প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে আজগর আলী বললেন, শুক্রবার রাতে ঢাকায় এসেছি। শনিবার ও রোববারের মধ্য কাজ সেরে বাড়িতে যাব। কিন্তু কিছুই হল না।
গুলশান-২ গোল চত্বরের ফুটপাতে শীতের কাপড়ের পসরা সাজিয়ে দোকান খোলার অপেক্ষায় ছিলেন মুনসুর হোসেন। কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না। কাছে যেতেই বললেন, শীতে একটু ভালো বিক্রি হয়। কিন্তু শনিবারও বসতে দেয়নি। যে কয়টা জমানো টাকা ছিল, তাও শেষ। এখন চাল কিনব কী দিয়ে?

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ