Home / জাতীয় / বাধার মুখে ঢাকা অভিযাত্রা, তাই সোমবারও চলবে

বাধার মুখে ঢাকা অভিযাত্রা, তাই সোমবারও চলবে

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক ঢাকা অভিমুখী পদযাত্রা কর্মসূচি আগামীকাল সোমবারও চলবে। বোরবার এই কর্মসূচি পালনে নানান বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত ১৮ দলের নেতা কর্মীরা মাঠে নামতেই পারেননি। সারাদেশে দু’জন নিহত হন। ১৮ দলের নেতা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিকেলে তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বাসার প্রধান ফটকের কাছে সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এখানে তিনি বলেন, সরকারের লজ্জা থাকলে নিজেরই পদত্যাগ করা উচিত। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, এই সরকার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সবকিছু করছে।

গণতন্ত্রের পক্ষে হ্যাঁ বলার জন্য গত বুধবার এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সরকার সৃষ্ট নানান শত বাধা পেরিয়ে এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে ১৮ দলের লক্ষাধিক নেতা কর্মী ঢাকায় পৌঁছেছে বলে বিএনপির নেতারা দাবি করেন। কিন্তু রোববার সারাদিন ঢাকার কোথাও বিএনপি বা জামায়াতের কোন বড় ধরনের মিছিল দেখা যায়নি। বিএনপির মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা শায়রুল কবীর রোববার সকালে প্রিয়.কম-কে জানিয়েছেন, যত বাধাই আসুক সময়মতো বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অবশ্যই নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমবেত জনতার পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন।

এদিকে বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ঢাকা অভিমুখী কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে। দলের নেতারাও কর্মসূচিতে ছিলেন না, কর্মীরাও আসেননি।

১৮ দলীয় জোটের ঢাকা অভিমুখী কর্মসূচি নিয়ে ধানমন্ডিতে দলের সভাপতির কার্যালয়ে রোববার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আরো বলেন, জানমালের ক্ষতি করে কোনো দাবি আদায় করতে কেউ পারে নাই। এবারো খালেদা জিয়া পারবেন না।

আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই পিছু হটবে না বলে আবার ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

প্রাণ গেলো দু’জনের

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মালিবাগের রেলগেট থেকে রামপুরা আবুল হোটেলের সামনে পর্যন্ত পুলিশের সাথে জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মনসুর নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। তিনি উত্তরা ইউনিভার্সিটির ছাত্র বলে জানা গেছে।

এদিকে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে হাতবোমা বিস্ফোরণে কাশেম নামে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। বেলা সোয়া তিনটার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে দু’টি শক্তিশালী হাতবোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মী কাশেম নিহত হন। এ ঘটনায় দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ।

জাতীয় প্রেসক্লাব ও সুপ্রিম কোর্টের ফটকে উত্তেজনা

জাতীয় প্রেসক্লাবে রোববার বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের একটি বিক্ষোভ সমাবেশে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ইট-পাটকেল ছুড়ে সমাবেশটি পণ্ড করে দেয়। পরে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকরা আরেকটি সমাবেশ করলে সেখানে হামলা করে বিএনপিপন্থীরা। এসময় ইটের আঘাত মাথা ফেটে যায় আওয়ামী সমর্থিত সাংবাদিক মফিজুল ইসলামের । তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের নেতা-কর্মীরা সকাল থেকে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তাঁদের ব্যানারে লিখা ছিল ‘বন্ধ গণমাধ্যমের খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ’।

দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা একটি মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় সমাবেশ থেকে সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে মিছিল থেকে সমাবেশে ইটপাটকেল ছুড়লে সাংবাদিক নেতারাও পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়ে। প্রায় ১৫-২০ মিনিট এই অবস্থা চলতে থাকে। একপর্যায়ে সাংবাদিক নেতারা প্রেসক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নেন। এ সময় পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

এরপর পৌনে একটার দিকে প্রেসক্লাবের ভেতরে ইকবাল সোবহান এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শাবান মাহমুদসহ আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকেরা একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। ঠিক তাদের পাশেই সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর ছিল বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের আরেক অংশ। এ সময় ইকবাল সোবহান চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানো মফিজুল ইসলামের মাথায় এসে একটি ইটের টুকরো পড়ে। এতে তাঁর মাথা ফেটে যায়।

সুপ্রিম কোর্ট

বেলা তিনটার দিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের ভেতর থেকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সরকার বিরোধী নানান শ্লোগান দেওয়ার সময় তাঁদের ওপর চড়াও হন আওয়ামী লীগের কর্মীরা। এসময় দুই আইনজীবী আহত হয়েছেন। এসময় লাঠির আঘাতে আহত রেহানা পারভীন নামের এক আইনজীবী দাবি করেন, সরকার দলের কর্মীরা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটক খুলে ভেতরে ঢুকে তাকে পিটিয়েছেন। বিকেল পৌনে চারটায় দিকে সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে দুপুরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হলে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসময় তাদের ওপর জলকামান থেকে রঙিন পানি ছোড়ে পুলিশ। এরপরও তারা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।jolkaman

রাজধানীজুড়ে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা

‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আজ রাজধানীজুড়ে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকার বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। সাদা পোশাকে সক্রিয় রয়েছেন গোয়েন্দারা। পুলিশের পাশাপাশি আছে র‌্যাব সদস্যরা। সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে। একইসঙ্গে রাজধানীতে তারা টহল দিচ্ছে। পুলিশের টহল গাড়ির সাইরেনে রাজধানীতে আতংকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তল্লাশি চৌকি

ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, সাভার, টঙ্গি, কাঁচপুর এলাকার সবগুলো প্রবেশ মুখে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। এসব জায়গায় রাজধানীমুখী মানুষ ও যানবাহনে ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তল্লাশি ছাড়া কাউকেই শহরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে যানবাহন। বুড়িগঙ্গা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেতুতে পুলিশ তিন স্তরবিশিষ্ট ব্যারিকেড দিয়েছে। গাবতলী এলাকায় কয়েক স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে পুলিশ। পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশও অবস্থান করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ওয়াচ টাওয়ার’ তৈরি করা হয়েছে। টঙ্গির স্টেশন রোড ও চেরাগআলী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে গাড়ি রেখে অবরোধ সৃষ্টি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

খালেদা জিয়ার বাসভবন

কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার থেকে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আরো বাড়নো হয়েছে। বিশেষ করে সেখানে মহিলা পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সেখানে দশ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।পরিস্থিতি বিবেচনান করে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে পুলিশ। সোমবারও একইভাবে বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাড়িটির সামনে অতিরিক্ত পুলিশ থাকবে বলে জানা গেছে।

নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়

বিএনপির নয়পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নয়াপল্টনে ঢোকার সব পথে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। এসব এলাকা দিয়ে কাউকেই চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাপক তল্লাশি চালনো হচ্ছে নয়াপল্টনের আশেপাশের এলাকায়। সকাল ১১টা পর্যন্ত কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। সেখানে বা তার আশে পাশেও ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের দেখা যায়নি। সেখানে কোনো মঞ্চও তৈরি করা হয়নি। নয়াপল্টনের কার্যালয়ে পৌছাতে হলে কয়েক স্তরের ব্যারিকেড পেরিয়ে যেতে হবে।

রাজপথে নেই গণপরিবহন

আজ সারাদিনই ঢাকার রাজপথে গণপরিবহন সংকট ছিলো। রাজপথে চলেছে সিএনজি চালিত অটো রিক্সা ও সাধারণ রিক্সা। ব্যক্তিগত কিছু গাড়িও চলাচল করছে। গণপরিবহনের সংকটে সকালে আফিস যাত্রীরা পড়েছেন দুর্ভোগে। হেঁটেই বেশিরভাগ মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।

মাঠে ১৮ দলের চেয়ে আওয়ামীলীগের কর্মী বেশি

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের কর্মসূচি ঠেকাতে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। ঢাকার সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগের কর্মীদের লাঠি নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

কেরানীগঞ্জে প্রায় শতাধিক খেয়াঘাটে পুলিশি পাহারা রয়েছে। কোনো খেয়া নৌকা যাতে পাড়ে ভিড়তে না পারে, সে জন্য এসব স্থানে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরাও রয়েছেন। ঢাকার রাজপথেও পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছেন। গাবতলীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেখানে অবস্থান নিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কর্মীরা। সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাঠি মিছিল করেছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। তবে এসব এলাকায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত ঢাকার রাজপথে ১৮ দলের নেতা কর্মীদের তেমন দেখা যায়নি।

ধরপাকড়

বিএনপির ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ আহবান করার পর থেকেই সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিএনপি ও ১৮ দলীয় নেতাকর্মীদেরকে ধরপাকড়ের খবর পাওয়া গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার সারাদিন দেশের জেলা, উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কি পরিমাণ আটক হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ