Home / মুক্তমত / গোস্সা করবেন না হানিফ সাহেব

গোস্সা করবেন না হানিফ সাহেব

৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় একতরফা নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে তাঁদের সম্পত্তির যে হিসাব দিয়েছেন, তাকে কেউই আসল হিসাব বলে মনে করেন না। সবাই না হলেও অধিকাংশ প্রার্থীই তাঁদের আয় ও সম্পত্তির হিসাব কম দেখিয়েছেন। কত কম দেখিয়েছেন তা পরিমাপের যন্ত্র আমাদের হাতে নেই। তবে বর্তমান আমলে কে কত টাকা বিদেশে পাচার করছেন, তার হিসাব হয়তো পরবর্তী কোনো সরকারের আমলে জানা যাবে।
সম্পদের আসল হিসাব পাওয়া যাবে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও (এনবিআর)। এনবিআরে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী সবাইকে আয়কর গুনতে হয়। সেখানেও মস্ত বড় ফাঁকি আছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রার্থীদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের যে হিসাব প্রকাশিত হয়েছে, তা নিজস্ব অনুসন্ধান বা বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া নয়। নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীরা হলফনামার নির্দিষ্ট ফরমে যে হিসাব দিয়েছেন, সেটাই তারা তুলে ধরেছে।
নির্বাচিত এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে যখন তাঁদের সম্পত্তির হিসাব দিয়েছেন, তখন নিশ্চয়ই তাঁরা তাদের কাছ থেকে করাল করে নেননি যে এ হিসাব জনগণকে জানানো যাবে না। করলেও সেটি আইনে টিকত না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশেই প্রার্থীরা তাঁদের হলফনামায় সম্পদের হিসাবসহ আটটি তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর এ তথ্য কমিশন বাক্সবন্দী করে রাখতে পারবে না। জনগণ যাঁকে নির্বাচিত করবে, তাঁর সম্পর্কে জানার অধিকার তাদের আছে।
চারদলীয় জোট আমলে যখন সুপ্রিম কোর্ট প্রার্থীদের আটটি নির্দিষ্ট তথ্য জনগণকে জানানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতারা বাহবা দিয়েছিলেন। এ আটটি তথ্যের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতাও ছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেশবাসীকে জানাতে তখন আওয়ামী লীগের নেতাদের উৎসাহের কমতি ছিল না। এখন নিজেদের সম্পদের হিসাব দেখে নিজেরাই লজ্জা পাচ্ছেন।
তবে সবাই নন। সেই জনপ্রতিনিধিরা ও ব্যক্তিরাই ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন, যাঁরা গত পাঁচ বছরে ম্যালথাসের জ্যামিতিক সূচকের চেয়েও বহুগুণ বেশি হারে সম্পদ বাড়িয়েছেন। তাঁদের সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা মনে হচ্ছে, হিসাব দেওয়ার সময় না হলেও জনসমক্ষে প্রকাশ হওয়ার পর সত্যিই তারা লজ্জা পেয়েছেন। অন্তত কারও পুত্র-কন্যা যদি জিজ্ঞেস করে ফেলেন, ‘বাবা এই পাঁচ বছরে তোমার এত সম্পদ হলো কীভাবে?’ গণমাধ্যমকে ধমক দেওয়া গেলেও আমরা নিশ্চিত যে পুত্র-কন্যাদের কাছে এ প্রশ্নের সঠিক জবাব তাঁরা দিতে পারবেন না।
মাহবুব উল আলম হানিফ মন্ত্রী বা সাংসদ ছিলেন না। ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। নির্বাচন কমিশনে তাঁর দেওয়া হিসাব প্রকাশিত হওয়ার পর মাহবুব উল আলম হানিফ এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর ক্ষমতা ব্যবহার করলে তিনি ছয় কোটি নয়, ৬০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হতে পারতেন।’
এর মাধ্যমে কিন্তু তিনি খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। তিনি যা বলেছেন তার সরল অর্থ হলো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর ক্ষমতা দেখিয়ে ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ বানানো যায়। আর বিশেষ সহকারী ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ বানালে উপদেষ্টাদের হতো নিশ্চয়ই আরও বেশি।
মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘একটি পত্রিকা রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র হরণের জন্য একের পর এক অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চাইছে তৃতীয় পক্ষকে ক্ষমতায় আনতে।’
এখানে অপপ্রচারের সুযোগ কোথায়? প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে তথ্য দিয়েছেন, সেই তথ্য কমিশন তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেই ওয়েবসাইট থেকেই প্রথম আলো প্রার্থীদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব জনগণকে জানিয়েছে।
আর হানিফ সাহেব যে তৃতীয় পক্ষকে ক্ষমতায় আনার কথা বলছেন সেই কাজটি বরাবর রাজনীতিকেরাই করে আসছেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের নেতারাই মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। বিরাশিতে এরশাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতাও দিয়েছিলেন রাজনীতিকেরা। এমনকি ২০০৮ সালে যে সেনাসমর্থিত সরকার এসেছিল, আওয়ামী লীগের নেতারা তা তাঁদের আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করেছিলেন।
এখন দেখা যাক সম্পদের হিসাব দেওয়া সম্পর্কে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ‘দিনবদলের সনদ’ নামের সেই ইশতেহারের পাঁচটি অগ্রাধিকারের ২ নম্বরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। এ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়: ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে।… ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশিশক্তির প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। (দিনবদলের সনদ, পৃষ্ঠা ৫)
ইশতেহারে ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা’ উপশিরোনামে লেখা ছিল: ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।’ (দিনবদলের সনদ, পৃষ্ঠা ৬)
মজার বিষয় হলো এবার প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ অনেক ব্যবসা ও সম্পদের হিসাব দিলেও দলের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের সবচেয়ে বড় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আয় এক পয়সাও বাড়েনি। তিনি ধারদেনা করে চলছেন বলে হলফনামায় জানিয়েছেন। এখন পাঠকই বলুন, প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবে কার লজ্জা পাওয়া উচিত।
কেবল হানিফ নন, গণমাধ্যমে সম্পদের হিসাব প্রকাশ পাওয়ায় সাবেক ও বর্তমান অনেক মন্ত্রী, সাংসদ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনেকে গণমাধ্যমকে একহাত নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদেরও সম্পদের হিসাব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। খুবই ন্যায্য দাবি। তাঁর এই দাবিকে আমরা স্বাগত জানাই। সাংবাদিক বা অন্য পেশার কোনো নাগরিক যদি সম্পদের হিসাব না দিয়ে থাকেন সরকার আইনের বলেই তা আদায় করতে পারে।
কিন্তু সাংবাদিকদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার দাবিটি মন্ত্রী মহোদয় তাঁদের সম্পদের হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশের পর পেশ করলেন কেন? এর মাধ্যমে কি তিনি এ কথা বোঝাতে চান যে সাংবাদিকেরা মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করলে সাংবাদিকদের সম্পদেরও হিসাব চাওয়া হতো না।
গত সংসদে ৩৪৫ জন সাংসদ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবাই যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, সেটিও সত্য নয়। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হিসাবে দেখা যায়, অনেক মন্ত্রী-সাংসদের আয় বাড়েনি। পৈতৃক ব্যবসার টাকাও রাজনীতিতে ঢালেন এমন উদাহরণও আছে। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সরকারি বাড়ি না নিয়ে দুই রুমের একটি পুরোনো বাড়িতে থাকেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অনেক আগেই সম্পদের হিসাব নিজস্ব ওয়েবসাইটে দিয়ে দিয়েছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর বা সাবের হোসেন চৌধুরীর আর্থিক সততা নিয়েও প্রশ্ন নেই। এ তালিকায় আরও কেউ কেউ থাকতে পারেন। তবে তাঁরা সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং নীরব।
গত পাঁচ বছরে যাঁদের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, তাঁরাই গণমাধ্যমের খবরে ক্ষুব্ধ ও সরব হয়েছেন। সাবেক পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের ২০০৮ সালে সম্পদ ছিল ১০ লাখ টাকার। এবার ১১ কোটি টাকার। হুইপ মির্জা আজমের ছিল এক কোটি ৯১ লাখ টাকা। এখন হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নূর-ই-আলম চৌধুরীর বার্ষিক আয় ছিল চার লাখ ৪৮ হাজার টাকা, এখন ১০ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার তাঁর ভাই নিক্সন চৌধুরীকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘তারা এত টাকা কোথায় পেল?’
আমাদেরও প্রশ্ন, মহাজোটের মন্ত্রী-সাংসদেরা এত টাকা কীভাবে অর্জন করলেন।
হলফনামা অনুযায়ী সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সম্পদ ছিল এক কোটি টাকার কম, এখন হয়েছে সোয়া ছয় কোটি টাকা। সাংসদ ফজলে নূর তাপসের বার্ষিক আয় ৬২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে দুই কোটি ১১ লাখ টাকা। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সস্ত্রীক আয় ছিল ১৯ লাখ টাকা, এখন স্ত্রীর আয়ই দুই কোটি টাকা। প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের আয় ছিল সাত লাখ টাকা, এখন হয়েছে ৫৫ লাখ টাকা। কক্সবাজারের মানুষ পেটানো সাংসদ আবদুর রহমান বদির আয় বেড়েছে ৩৫১ গুণ। ঢাকা-১৪ আসনের সাংসদ আসলামুল হকের ঘোষিত সম্পদ ৩৪ গুণ। ২০০৮ সালে তাঁর ও পরিবারের জমি ছিল চার একর ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন তাঁর জমি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫ দশমিক ৬৭ একর। ২০০৮ সালে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল অষ্টম শ্রেণী পাস, এবার দেখিয়েছেন বিবিএ পড়ছেন। কেবল সম্পদ নয়, বিদ্যাও বাড়িয়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জমি, প্রবাসীর জমি, দখল করা জমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও ঈদগাহ মাঠ দখলের অভিযোগ আছে।
প্রথম আলোর কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় আসলামুল হক বলেছেন, ‘আমি ফকিন্নির বাচ্চা নই, আমার বাবা ও নানা জমিদার। তাঁদের সম্পদ আছে। ধীরে ধীরে ব্যবসা করে এই অবস্থায় আসছি।’
আসলামুল হকের বাবা-নানারা জমিদার বলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জমি দখলে নিতে পারেন। আমাদের যোগ্য জনপ্রতিনিধিই বটে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ