Home / মুক্তমত / নির্বাচন নিয়ে সমানেই ভুল করে চলেছে ঢাকা ও দিল্লি

নির্বাচন নিয়ে সমানেই ভুল করে চলেছে ঢাকা ও দিল্লি

সিরাজুর রহমান

শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের কোনো বৈধতা আছে বলে দেশে কি বিদেশে কোনো নিরপেক্ষ মানুষই বিশ্বাস করছেন না। এই অবৈধ সরকারে কে মন্ত্রী, কে সাবেক মন্ত্রী আর কে উপদেষ্টা তার কোনো সুস্পষ্ট সীমা-চৌহদ্দি চোখে পড়ছে না। এই তথাকথিত মন্ত্রী-উপদেষ্টারা দুর্বার স্রোতে পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন। তাতে বস্তার ভেতর ছুঁচোদের লম্ফন-কুর্দনের উপমা মনে আসতে বাধ্য। কেউ বলছেন সংলাপের সুযোগ এখনো আছে। অন্য কেউ বলছেন সুযোগ আর নেই। আরো এক মহলের মতে, এখন শুধু একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়েই সংলাপ হতে পারে, যে নির্বাচন হবে আরো পাঁচ বছর পরে। সবারই ভাবখানা এই যে, তারাই সরকারের প্রকৃত মুখপাত্র। আবার পরস্পরের আত্মগরিমা ফুটো করে দেয়ার চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ। যেমন আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদের বলেছেন, হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের কেউ নন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের হয়ে কথা বলার অধিকার তার নেই।

গত এক বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনর্গল যেসব উক্তি করেছেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করলেও তাদের অসংলগ্নতা এবং পরস্পরবিরোধিতা পরিষ্কার হয়ে যাবে। সর্বসাম্প্রতিক এক উক্তিতে শেখ হাসিনা বলেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনের পরে কোনো সমঝোতা হলে সে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন ৫ জানুয়ারির আগে হওয়ার কথা নয়; কিন্তু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই দশম সংসদে গরিষ্ঠতা দাবি করে বসে আছেন। যেসব দলের সত্যিকারের জনসমর্থন আছে তারা কেউ মনোনয়ন জমা দেয়নি, অজস্রবার পরিষ্কার করে তারা বলে দিয়েছেন, শেখ হাসিনার পাতানো নির্বাচনে তারা অংশ নিচ্ছেন না। হাসিনা ও তার আমেরিকা অধিবাসী ছেলে জয় বলছেন, তারা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন। আমি বরাবরই জানতাম ফাঁকা মাঠে যারা গোল দিতে যায় তারা সুবিধাবাদী কাপুরুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

একবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই, তারপর ষড়যন্ত্র করে বর্ণচোরা সামরিক স্বৈরতন্ত্র আমদানি, তারপর আবার তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি হত্যার জন্য একদলীয় সংসদে তড়িঘড়ি সংবিধান সংশোধন- আওয়ামী লীগের এসব কাণ্ডকারখানা খেলার ছলে বানরগুলোর গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফ দেয়ার কথাই মনে পড়িয়ে দিয়েছে। এখন আবার বাঁদরামির চূড়ান্ত দেখা গেছে বিনা নির্বাচনে বানরের পিঠা ভাগের গল্পের মতো সংসদের আসনগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার মধ্যে। প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে, যবনিকার অন্তরালের ষড়যন্ত্র দিয়েই যদি গদি আঁকড়ে থাকার পরিকল্পনা হয়, তাহলে আর হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নির্বাচন করার এবং সে নির্বাচন পাহারা দেয়ার জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে ৫০ হাজার সৈন্যকে ময়দানে নামানোর কী প্রয়োজন ছিল?

বিশেষ করে সারা বিশ্বের কাছে যখন এ নির্বাচনের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি, কমনওয়েলথের ২৭টি দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই অনাস্থা প্রকাশ করেছে এ নির্বাচনের ব্যাপারে। তারা বলে দিয়েছে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হলে তারা কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। কানাডা, জাপান ও চীনও জানিয়ে দিয়েছে সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তাঁবেদার নির্বাচন কমিশনের প্রধান সরকারের সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছেন, দেশীয় পর্যবেক্ষকেরাই যথেষ্ট হবেন; কিন্তু দেশেও পর্যবেক্ষণ করছে কে? ডেমোক্র্যাসি ওয়াচ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন প্রতিনিধিত্বমূলক নয়, কেননা শুধু ১৪ দলের জোটের শরিকেরা ছাড়া আর কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এবং দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। তাই বাংলাদেশী পর্যবেক্ষকেরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন না। অর্থাৎ হাসিনা একটা শঠতার নির্বাচন করছেন জবরদস্তি গদি দখল করে থাকার এবং পাশের দেশের পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থের সেবা করার প্রয়োজনে।

সঙ্কট বিশ্বাস এবং বিশ্বাসযোগ্যতার
শেখ হাসিনা অথবা তার সরকারকে বিশ্বাস করে এক পয়সাও ধার দিতে কে চাইবেন? তিনি এখন বলছেন, বিএনপি যদি তার আন্দোলন, অবরোধ ও অসহযোগিতা বন্ধ করে এবং যবনিকার অন্তরালের পিঠা ভাগাভাগি মেনে নেয় তাহলে তিনি দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন করবেন। দেখাই যাচ্ছে এই অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ সন্তান হিসেবে যে সংসদ হবে, তাতে সর্বত্রই দেখা যাবে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের (এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে দুর্নীতিবাজ ও মাস্তান-গডফাদাররাই বেশি) চেহারা। হাসিনা যদি আবারো সে সংসদে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচন নিষিদ্ধ করে দেন অথবা বাবার অনুকরণে বাকশালপদ্ধতি চালু করে নিজেকে আজীবন প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, তাহলে বিরোধী দল কী করবে? ঘরে বসে তারা আঙুল চুষবে? শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস সে জন্যই করা যায় না।

হাসিনা যদি বিশ্বাস করে থাকেন যে, বিএনপি তার প্রস্তাবে পাত্তা দেবে তাহলে তাকে অবশ্যই তরলমতি বলতে হবে। হাসিনার একটা খুঁত এই যে, তিনি নিজেকে অন্য সবার চেয়ে বুদ্ধিমতি মনে করেন। তার প্রস্তাব যে বিরোধী দলকে ফাঁদে ফেলার হাস্যকর প্রচেষ্টা, সেটা শিশুও বোঝে। তবে তিনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে কতগুলো বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা এখন শঙ্কিত, আতঙ্কিত। সত্যিকারের বাংলাদেশ তার হাতের বাইরে চলে গেছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও গুণ্ডাবাহিনী, দলীয়কৃত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি দিয়ে তিনি তার কর্তৃত্ব বজায় রেখে চলেছিলেন এ যাবৎ; কিন্তু এখন পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। রাজধানী ঢাকার বাইরের বাংলাদেশ তো বটেই, পুরো ঢাকা নগরীও এখন তার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।

পুলিশ এখন দেহরক্ষী ছাড়া গ্রামগঞ্জে যেতে রাজি নয়। পুলিশের কর্মকর্তারা সপরিবারে পালিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন, আত্মহত্যা করছেন কেউ কেউ। অন্যরা শেখ হাসিনার পতনের পরে নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশজোড়া সরকারের ক্ষমতার চাবিকাঠি জেলাগুলোর প্রশাসক ডিসিদের হাতে। নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে ঢাকা আসতে তারা এখন বিশেষ নিরাপত্তা চান। রাজধানীতে আবার বাস চলাচল শুরু হয়েছে বলে ফলাও করে প্রচার করছে সরকার। পুলিশ পাহারা নিয়ে বাস চালানোর চেষ্টা করছে সরকার। বাসের মালিকেরা তাতেও নিরাপদ বোধ করছেন না। পুলিশ পাহারাতেও দু’টি বাস অগ্নিদগ্ধ হয়েছে বগুড়ায়। দু-একটা বাস যেখানে চলেছে, যাত্রীরা সে বাসে উঠছেন না। আওয়ামী লীগের ক্যাডারবাহিনীও এখন সড়কে নেমে বিরোধী জোটের আন্দোলনের মোকাবেলা করতে খুব বেশি আগ্রহী নয় বলে শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেতে সাহস পাচ্ছেন না। দু-একজন পুলিশ পাহারায় হেলিকপ্টারে উড়ে গিয়ে শুধু চেহারা দেখিয়ে আসছেন।

লুণ্ঠনের ভয়াবহ খতিয়ান
নির্বাচনী আবেদনে প্রার্থীদের সম্পদের তালিকা থেকে সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতারা দেশের সম্পদ কী পরিমাণে লুণ্ঠন করেছেন তার নমুনা দেখে দেশের মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে। সরকার এখন সম্পদের তালিকা প্রকাশ না করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ দিচ্ছে। বিগত কয়েক দিনের পত্রিকাগুলো থেকে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পাঁচ বছরে লক্ষ কোটি টাকা অসাদুপায়ে অর্জন করেছেন এবং সে অর্থ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। তাদের এই অর্থ পাচার প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। নিজেদের গা বাঁচানোর জন্য পাচারকৃত অর্থে মালয়েশিয়া, দুবাই আর লন্ডনে সম্পত্তি কেনার হিড়িক পড়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাংলাদেশে নিরাপদ বোধ করছেন না- এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? জবাব অবশ্যই হতে হবে শেখ হাসিনার গদির লোভ।

কূটনীতিকেরা অজস্রবার বিরোধীদের সাথে সংলাপের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। কূটনৈতিক শালীনতার খাতিরে তারা বিরোধী জোটকে সহিংসতা বন্ধ করারও দাবি জানাচ্ছেন। তবে তাদের সমালোচনার সবটুকুই যে সরকারের বিরুদ্ধে সেটাও খুব পরিষ্কার। একচু হরিণীর মতো শেখ হাসিনা শুধু ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে আছেন। তিনি ভারতকে বিনামূল্যে সড়ক, রেল ও নদীপথে ট্রানজিট দিয়েছেন, সমুদ্রবন্দরগুলো ব্যবহারের অবাধ অধিকার দিয়েছেন। সাম্প্রতিক খবরে মনে হয়, যেকোনো কাজে যেকোনো সময় বাংলাদেশের সড়কগুলোতে ভারী যানবাহনসহ যেকোনো যানবাহন চলাচলের অধিকারও দেয়া হয়েছে ভারতকে। প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে : এর পরে আর আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কতটুকু অবশিষ্ট রইল? আমাদের ভৌগোলিক অঞ্চল, ভৌগোলিক সম্পদও ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়নি?

প্রতারণা : এ দেশে এবং ও দেশে
সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের জনসাধারণকে প্রতারণা করছে। সে প্রতারণায় ভারতও যথাসাধ্য তাদের সাহায্য করছে। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব ভারতের সাথে ছিটমহল বিনিময়ে চুক্তি করেন এবং অবিলম্বে সংবিধান সংশোধন করে চুক্তিটি কার্যকর করেন; কিন্তু ৩৯ বছর পেরিয়ে গেলেও ভারত করছি-করব করে চুক্তির বাস্তবায়ন এড়িয়ে গেছে। ভারত বরাবর বলে যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সায় পাওয়া না গেলে তারা চুক্তি অনুমোদন করতে পারে না; কিন্তু গত ১৮ ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টের শীতকালীন ছুটি শুরুর পূর্বমুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সরকার উচ্চপরিষদ রাজ্যসভায় চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করে। সংশ্লিষ্ট প্রধান রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই ঘোষণা করেন যে, এক ইঞ্চি জমিও তিনি বাংলাদেশকে দেবেন না। অর্থাৎ ভারতীয় পার্লামেন্টের বর্তমান মেয়াদে এ চুক্তি অনুমোদিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা এসেছিলেন। সে চুক্তি তখন স্বাক্ষরিত হয়নি। ভারতীয় পক্ষ তখন জানিয়েছিল যে, মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণেই তারা চুক্তিতে সই করতে পারছে না। মমতা ব্যানার্জি এখনো বলছেন তিস্তার এক ফোঁটা পানিও তিনি বাংলাদেশকে দেবেন না। ভারত সরকার এখন বলছে, তিস্তার পানিসম্পদের জরিপ করে তারা দেখবে বাংলাদেশকে দেয়ার মতো কী পরিমাণ বাড়তি পানি তিস্তায় প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ শেখ হাসিনার নির্বাচনে অন্যায় সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে ভারত সরকারও বাংলাদেশের ভোটারদের প্রতারিত করছে।

২০০৮ সালের সাজানো-পাতানো নির্বাচনে ভারত আওয়ামী লীগকে সাহায্য দিয়েছিল; কিন্তু একলা নয়। সে মাস্টারপ্ল্যানে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকেও দলে ভিড়িয়েছিল। তখনকার ভারতীয় হাইকমিশনার বিণা সিক্রি আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটিনেসকে হরিহর আত্মা মনে হতে পারত। ভারত-মার্কিন ষড়যন্ত্রের ফলেই যে হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন সে কথা সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (এবং খুব সম্ভবত পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট) হিলারি কিনটন শেখ হাসিনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন ২০১০ সালে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার গ্রামীণ ব্যাংককে হয়রানি না করার অনুরোধ জানিয়ে দীর্ঘ টেলিফোনে হিলারি হাসিনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ভারতীয় বন্ধুদের’ অনুগ্রহেই শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। হাসিনা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধে কর্ণপাত করেননি বলে হয়ত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর পরে দীর্ঘ টেলিফোন কথোপকথনটির অনুলিপি মিডিয়ায় প্রকাশ করে দিয়েছিল।

আমেরিকা এবার দিল্লির দলে নেই
এবার আর শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় ওয়াশিংটন ভারতের সাথে নেই। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই মনে করে ভারত তার স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জনসাধারণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাসিনাকে সমর্থন দিতে গিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সমাধি রচনা করছে। গণতন্ত্রের জন্য শূন্যতা সৃষ্টি হলে অন্য তন্ত্রগুলো সামনে এগিয়ে আসবে এবং উলফা ও অন্যান্য স্বাধীনতাকামী ভারতীয় গোষ্ঠীকে যথাসম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা দেবে বাংলাদেশের প্রতিবাদী মানুষই। ওয়াশিংটন সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখছে। খুব সম্ভবত ওয়াশিংটনের বড় সন্দেহ ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে। ভারত যে শেষত বাংলাদেশকে গ্রাস করে নিতে চায় ওয়াশিংটন সেটা বুঝে গেছে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ উদ্বেগের কারণ ঘটাবে। বঙ্গোপসাগরে একাধিপত্য ভারতের দীর্ঘকালের লক্ষ্য। দিল্লির পরিকল্পনায় এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি কাম্য নয়। অন্য দিকে এই এলাকায় একটা নৌ-উপস্থিতি ওয়াশিংটনের রণকৌশলের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা গায়ে পড়ে দিল্লি গিয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে যুক্তির পথ দেখাতে ভারতের সাহায্য সংগ্রহের আশায়। হতাশ হয়ে তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়ে বড় কর্তাদের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝিয়ে এসেছেন। দিল্লির হিসাব হচ্ছে, শেখ হাসিনা গদিতে থাকলে তারা যা চাইবে তিনি সব কিছুই দিতে রাজি হবেন; কিন্তু ঢাকায় একটা জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সে সরকার কিছুতেই ভারতের কাছে নতজানু হয়ে থাকতে রাজি হবে না। সে জন্য দিল্লি তদবির করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দরবারে। সে লক্ষ্যে ‘চাণক্যের নাতনী’ সুজাতা সিং কয়েক দিন ধরে ওয়াশিংটনে তদবির করেছেন। হয়তো সেসব তদবিরে কাজ হবে না বলে ভারতকে জানিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত হিসেবেই নিউ ইয়র্কে ভারতীয় ভাইস কন্সাল দেবযানীকে কিছু হয়রানি করা হয়েছে।

বাড়াবাড়ি প্রতিক্রিয়া এবং বিভ্রান্তির ধূলিঝড়
ভারতে তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে সাংঘাতিক রকম মাত্রাতিরিক্ত। মার্কিন কূটনীতিকদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা বেষ্টনীগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ভারত সরকার ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে উত্তেজিত জনতা যদি মার্কিন দূতাবাসে চড়াও হয় তাহলে তাদের কিছু করণীয় থাকবে না। ভারতীয়রা ভুলে যাচ্ছে, তারা এখনো বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি হতে পারেনি। এক নম্বর পরাশক্তি এখনো যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে পাকিস্তান পার্লামেন্টে কাদের মোল্লার ফাঁসির সমালোচনা করে গৃহীত একটি প্রস্তাবের প্রতিবাদে সরকার ও আওয়ামী লীগ কৃত্রিম ক্রোধের ধূলিঝড় সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অতীতের একটা ঘটনাভিত্তিক সে প্রস্তাবকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ। হাসিনা-তনয় জয় পাকিস্তানি পণ্য বর্জনের প্রস্তাব দিয়েছেন; কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারক নির্বাচনে ভারতের নির্লজ্জ ও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের নিন্দা জয় করবেন কখনো? বাংলাদেশের মানুষ যদি ভারতীয় পণ্য বর্জন এবং ভারতের সাথে সার্বিক অসহযোগিতার দাবি করে তাহলে সেটা কি অন্যায় হবে?

পিঠা ভাগের নির্বাচন মেনে নিলে কিছু দিনের মধ্যেই সংসদ ভেঙে দিয়ে একাদশ সংসদের নির্বাচন করার যে টোপ শেখ হাসিনা বিএনপিকে দিয়েছেন, সে টোপের পরামর্শও দিল্লি থেকেই এসেছে বলে মনে হয়। সামাজিক মিডিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে একটা খবর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। খবরটা এই যে, গত ১৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় আটজন প্রতিনিধি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের সাথে আরো ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা র-এর উপমহাপরিচালক এবং ভারতীয় হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা। র-এর ওই কর্মকর্তাও বিএনপি নেত্রীর জন্য একটি টোপ ফেলেছেন। বলেছেন, খালেদা জিয়া যদি ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন মেনে নেন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রাণদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দিতে রাজি হন এবং জামায়াতের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন তাহলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভারত খালেদা জিয়াকে সমর্থন দিতে রাজি হবে।

দিল্লির ফাঁদ ধরা পড়ে গেছে
তবে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ আরেকটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে সেই সাথে। বলা হয়েছে, ভারত বর্তমান সরকারের আমলে সম্পাদিত চুক্তিগুলো মেনে চলবে। এই শর্তের তাৎপর্য কি ভেবে দেখেছেন সবাই? তাৎপর্য হচ্ছে ভারত যদি হাসিনা সরকারের সম্পাদিত চুক্তিগুলো মেনে চলে, তাহলে খালেদা জিয়ার অধীনের সরকারকেও সেসব চুক্তি মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ ভারত সড়ক, রেল ও নদীপথে ট্রানজিট এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অবাধ অধিকার দিতে খালেদা জিয়ার সরকারকেও বাধ্য করবে।

এ দিকে শেখ হাসিনার সরকার কার্যত বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীর উক্তি অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিকে ‘দেখা মাত্র গুলি করার’ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দল বেঁধে এই বাহিনীগুলোর অতিরিক্ত রকম বাড়াবাড়ি বহু অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে। সাতক্ষীরায় তো প্রকৃতই জনসাধারণ বনাম সরকার খোলা যুদ্ধই চলছে। বিভিন্ন সূত্রে যেসব খবর পাচ্ছি, তাতে মনে হয় সাতক্ষীরা জেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনুকরণে ‘পোড়া মাটি’ রণকৌশল অবলম্বন করেছে যৌথবাহিনী। জেলার সর্বত্র মানুষের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে কিংবা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। গোটা জেলার মানুষ যৌথবাহিনী আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সরকারের এসব উন্মাদ অত্যাচার নির্যাতনের একটাই মাত্র কারণ হতে পারে। তারা এখন দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে এবং তারাও ভয়ানক আতঙ্কিত।

শেখ হাসিনা ও তার সরকার যে আতঙ্কিত তার বহু বহু কারণ আছে। বিশ্বসমাজে বাংলাদেশ এখন অস্পৃশ্য হয়ে পড়েছে। শুধু নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে অসম্মতিই নয়, একই সাথে শাস্তিমূলক কিছু ব্যবস্থাও বিশ্বসমাজ নিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে। রানা প্লাজার বিপর্যয়ের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রফতানিকে বিশেষ জিএসপি সুবিধা দিতে অস্বীকার করে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এখন বলে দিয়েছে, বাংলাদেশ রফতানিতে যে ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস) সুবিধা ভোগ করছে সেটা রহিত করা হতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীসমাজ যে হঠাৎ করে সাদা পতাকা মিছিল করছে তার কারণও ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর আতঙ্ক। বিগত পাঁচ বছর তারা শেখ হাসিনার সরকারকে সব রকম সহযোগিতা দিয়েছেন। এমনকি সরকারের ভুয়া জনপ্রিয়তা দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগের জনসভায় নিজেদের শ্রমিকদেরও পাঠিয়েছেন। বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে বহু বৈধ ও অবৈধ সুবিধা তারা আদায় করেছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তারা রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির ফল ভোগ করেছেন। সরকারের হাজার অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে তারা টুঁ শব্দটি করেননি। এখন পোশাক রফতানির (এবং অন্যান্য পণ্যেরও) বাজার তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এখন ত্রাহি ত্রাহি ডাক উঠেছে ব্যবসায়ী সমাজের দিক থেকে।

দিল্লির জন্য ভয়ের কারণ
দিল্লির মসনদও এখন আতঙ্কিত। এতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বিরাট একটা সাহসস্বরূপ ছিল। শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের আমলে বিনামূল্যে ট্রানজিটের ব্যবস্থা করে নিয়ে ভারত উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) মুক্তিযুদ্ধ দলনের জন্য এবং হিমালয়ের গায়ে বিশাল বিবদমান অঞ্চল নিয়ে চীনের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সৈন্য ও ভারী সমরাস্ত্র পাঠানোর পথ সুগম করে নিয়েছিল।

দিল্লির আশা ছিল হাসিনার পরবর্তী মেয়াদে তারা বাংলাদেশকে সিকিমের মতো ‘অ্যানেক্স’ (সংযুক্ত) করে নেয়ার ব্যবস্থাও করে নিতে পারবে। ওয়াশিংটন এখন বিরূপ। এর পরে যদি ভারত অস্ত্রবলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিলুপ্ত করতে চায় তাহলে সামরিক কিংবা নৈতিক কোনো প্রকার সাহায্যই সে পাবে না ওয়াশিংটনের কাছ থেকে। এর চেয়েও বড় কথা, ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থাকবে না বলে চীনও হয়তো ভারতের সামরিক উচ্চাভিলাষের ডানা ছেঁটে দিতে চাইতে পারে।

শেখ হাসিনা ও তার ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকেরা যে খালেদা জিয়াকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের টোপ দেখাচ্ছেন এই হচ্ছে তার কারণ; কিন্তু খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতৃত্ব এতই মূর্খ নন যে দিল্লি ও ঢাকার দ্বিমুখী ‘বদান্যতায়’ তারা ‘গা-গা’ হয়ে যাবেন। হাসিনা ও ভারত সরকার যদি উপমহাদেশে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চায় তাহলে তাদের উচিত হবে ৫ জানুয়ারি বাঁদরামির নির্বাচন ত্যাগ করে সংলাপের ভিত্তিতে সব দলের গ্রহণযোগ্য দশম সংসদ নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা করা।

(লন্ডন, ২৪.১২.১৩)

সিরাজুর রহমান: বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান
serajurrahman34@gmail.com

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ