Home / ফিচার / একঘরে এবং বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ কারা চায়

একঘরে এবং বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ কারা চায়

জামালউদ্দিন বারী : সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, কঙ্গো’র মতো গৃহযুদ্ধকবলিত দেশগুলোর প্রতিদিনকার ঘটনাপ্রবাহ একসময় বিশ্বমিডিয়ায় প্রতদিনই শিরোনাম হতে আমরা দেখেছি। ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সামরিক জান্তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক শক্তি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এ কারণে পশ্চিমা কূটনীতিকরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সম্পর্কে যে ভূমিকাই গ্রহণ করে থাকুক, পশ্চিমা মিডিয়ায় বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের উপর পাকিস্তানী বাহিনীর দমন অভিযানের খবর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে ইউরোপ-আমেরিকার ইন্টিলিজেনশিয়া ও নাগরিক সমাজের সহমর্মিতা ছিল যথেষ্ট। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এখনকার রাজনৈতিক সংঘাতে হতাহতের খবর, সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের খবর একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ের মতোই গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংঘাত, অনিশ্চয়তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ভূ-লুণ্ঠিত হওয়ার নানা দিক বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি আলোচ্য হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে কি গত চারদশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে না? গত শুক্রবার ইনকিলাবের প্রথম পৃষ্ঠার উপরে এক সারিতে অন্তত ৫টি সংবাদ স্থান পেয়েছিল, যার সবকটিই ছিল বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ব সম্প্রদায়, বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ, বিদেশী মিডিয়া ও বিশ্বসংস্থার প্রতিক্রিয়া। এর মধ্যে একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল- ‘৫ জানুয়ারি নির্বাচনে হারবে বাংলাদেশ’। ইনকিলাবের নিয়মিত পাঠকদের হয়তো মনে পড়বে, দুই সপ্তাহ আগে (১১ ডিসেম্বর) বুধবারের উপ-সম্পাদকীয়’র শিরোনাম ছিল- ‘রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে হেরে যাবে বাংলাদেশ’। আর শুক্রবারের (২০ ডিসেম্বর) সংবাদটি বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের শিরোনাম থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছিল। ইকোনমিস্টের ২১ ডিসেম্বর সংখ্যাটি অনলাইনে দু’দিন আগেই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাল-হকিকত তুলে যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে তার শিরোনাম ছিল- ‘দ্য কেম্পেইন ট্রেইল : দ্য রুলিং পার্টি উইল উইন বাংলাদেশ ইলেকশন, কান্ট্রি উইল লস’। অর্থাৎ দুই ভিন্ন মহাদেশে অবস্থানের পরও বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিরপেক্ষ বিশ্লেষণগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হুবহু মিলে যাচ্ছে। আরেকটি সংবাদে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, এর পাশেই আরেকটি সংবাদের শিরোনাম- ‘বাংলাদেশ জ্বলছে দায় ভারতেরও’, ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’-এ প্রকাশিত সংবাদ অবলম্বনে প্রকাশিত এই রিপোর্টটি, সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সম্পর্কে প্রকাশিত রির্পোটের শিরোনাম- ‘নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা বাতিলই সহিংসতার কারণ’ এবং ‘ওয়ার ক্রাইমস ট্রইব্যুনালের বিচার আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’ বলে সিনেট কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ, সংস্থা এবং মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব রিপোর্টে খ- খ- আকারে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রই যেন বেরিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষ থেকে অনেক ইতিবাচক মন্তব্য উচ্চারিত হতে দেখা গেছে। ভারত ও চীনের মাঝখানে বঙ্গোপসাগরের সম্পদরাজি ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থানের পাশাপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবেও ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়ে থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ একটি মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের সুবিধাভোগীদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশে নানা উছিলায় উগ্র সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজতে গিয়ে নিজেরাই দেশে সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেয়ার চেষ্টা করলেও সেসব কারসাজি কখনো সফল হয়নি। বাংলাদেশের ধর্মপরায়ণ মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় ঐতিহ্যগত ভাবেই শান্তিপ্রিয় এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত। পশ্চিমাবিশ্বে পলিটিক্যাল ইসলামকে ভয়ের চোখে দেখা ও নিরুৎসাহিত করা হলেও আমাদের জনসমাজের চোখে সে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যে মধ্যপন্থাকেই বেছে নিতে পছন্দ করেন, গত ৪২ বছরের রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়েই তা প্রমাণিত হয়। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া, সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে এখানে সামরিক সরকারগুলোও জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক একই প্রেক্ষাপটে ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ধারকরাও ভোটের সময় তসবিহ হাতে মুনাজাতরত ছবি ছাপিয়ে প্রচার চালাতে দেখা যায়। বাংলাদেশের জনমানস তথা সামাজিক রাজনীতির এই বাস্তবতা কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না।
দুই.
স্বাধীনতার চারদশক পর বাংলাদেশ এখন ১৯৭১-এর বিপ্রতীপ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সরকারের পৃষ্ঠপোষক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সারাবিশ্বের গণতন্ত্রকামী ও মানবতাবাদী নাগরিক সমাজ বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষ নিয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক উত্তাপে জ্বলছে, ক্ষমতাসীনদের হঠকারিতায় দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, বিরোধীদলের ধারাবাহিক অবরোধে সারাদেশ থেকে রাজধানী ঢাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে, পুরো বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিই যেন এখন সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতাহীনভাবে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছানুসারে ইতিমধ্যে ঘোষিত তফসিল মোতাবেক আগামী ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অংশগ্রহণ করছে না। একইভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়ও যে এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, এটা এখন অনেকটা নিশ্চিত। ইতিমধ্যে ইউরোপাীয় ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথ’র পক্ষ থেকে এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় একাধিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাও এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা যায়। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারই কেবল জনপ্রতিনিধিত্বমূলক বা গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে স্বীকৃত। এরই মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোট ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হওয়ায় ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দেশি-বিদেশি স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এই নির্বাচনের যে গ্রহণযোগ্যতা নেই সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও সম্ভবত অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছেন। তারা ইতিমধ্যে ১০ম সংসদ ভেঙে দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার কথা বলতে শুরু করেছেন। সারকথা হচ্ছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সকলের জন্য সমান সুযোগ ও সকলের অংশগ্রহণমূলক করতে যদি সরকারি দল প্রয়োজনীয় ছাড় ও সমঝোতা করতে সদিচ্ছা পোষণ করেন, তবে তা ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেন নয়? দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী আওয়ামী লীগ কেন একটা একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের কলঙ্কিত ইতিহাসের সাথে নিজেদেরকে জড়াচ্ছে, দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বর্তমান সংবিধান অনুসারে এই সরকারের মেয়াদ ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত, মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে দিয়ে ৩ মাসের মধ্যে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ হয়তো এখনো রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক কলঙ্ক থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারে, সেই সাথে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিকভাবে পরিত্যাজ্য ও একঘরে অবস্থায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে তারা রক্ষা করতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাতে ইতিমধ্যেই শতশত মানুষ নিহত হয়েছেন, পুলিশের গুলিতে হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ রাজনৈতিক মামলায় হুলিয়া ও ধরপাকড়ের সম্মুখীন হয়ে পুরো দেশটাই এখন এক প্রকার কারাগারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে বিশিষ্ট পশ্চিমা সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জন পিলজারের পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জন পিলজার তার কলম ও ক্যামেরায় গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টস তুলে এনেছেন। সেই পিলজার গত সপ্তাহে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় বাংলাদেশকে একটি ‘কারাগার’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘দ্য প্রিজন দ্যাট ইজ বাংলাদেশ’ শিরোনামে লেখা নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে পিলজার ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর একজন সাংবাদিক হিসেবে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের সময় তরুণ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সাথে তার পরিচয়ের সূত্র এবং বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে মওদুদ আহমদের ভূমিকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মওদুদ আহমদের সাথে সাক্ষাৎ এবং যুদ্ধের বিভীষিকাময় অবস্থার চিত্র অবলম্বনে সে সময় ডেইলী মিরর পত্রিকায় পিলজারের লেখা সংবাদ নিবন্ধের শিরোনাম ছিল- ‘বার্থ অব অ্যা নেশান’, সেখানে মওদুদ আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে সাব-হেডিং-এ লেখা হয়েছিল, ‘উই আর এ লাইভ, বাট উই আর নট ফ্রি ইয়েট’। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর ৭৪ বছর বয়স্ক পিলজারকে বাংলাদেশকে একটি কারাগার আখ্যা দিয়ে সংবাদ শিরোনাম দিতে হচ্ছে। যেখানে একটি সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীই শুধু নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা সংগ্রামী মওদুদ আহমদসহ বিরোধীদলের বয়োবৃদ্ধ শীর্ষ নেতারাও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় আটক রয়েছেন।
তিন.
গত চার দশকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক বিশ্বমন্দার মধ্যেও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আরএমজি খাতের রফতানি ও কর্মসংস্থানের উপর ভর করে গত অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নেয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা গ্রাস করেছে। অথচ জাতীয় অর্থনীতি, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা, জটিলতা ও সহিংসতা নিরসন ক্ষমতাসীনদের জন্য কোন কঠিন কাজ নয়। যেখানে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ-নির্দেশনা মেনে আরো দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, অথবা সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতা ত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য কোন সংসদ সদস্যকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে এই সঙ্কট নিরসন করা সহজেই সম্ভব, সেখানে দেশকে হরতাল-অবরোধে ঠেলে দিয়ে, পুলিশ-বিজিবি দিয়ে শতশত মানুষ হতাহত করে, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার-নির্যাতন করে এবং অগ্রহণযোগ্য ভোটারহীন নির্বাচনে দেশের শত শত কোটি টাকা খরচ করার কোন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। ভোটারহীন, জনগণের সমর্থন ও বিরোধীদলের অংশগ্রহণহীন নির্বাচনে সেনাবাহিনী নামিয়ে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক সেনাবাহিনীকেও বিতর্কিত ও জনগণের বিপরীতে দাঁড় করানোর যে অভিযোগ ইতিমধ্যে উঠেছে, সে সম্পর্কেও সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই নতুন করে ভেবে-চিন্তে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের তফসিল অনুসারে যে নির্বাচনী তৎপরতা এখন চলছে, কার্যত তা ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়ে গেছে। বর্তমানে সরকারের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘কোন নির্বাচনই না’ বলে মন্তব্য করেছেন। দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিল সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায়ও তাদেরকেই নিতে হবে। শুধু নিয়ম রক্ষা তথা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষায় নির্বাচন করার যে অজুহাত দেখানো হচ্ছে ১০ম জাতীয় সংসদকে সামনে রেখেই তা থেকে উত্তরণের পথ সরকারকেই খুঁজতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার একটি সেটেল্ড ইস্যু, সময়ের ব্যবধানে সকল দলের সমর্থনপুষ্ট এই ইস্যুটিকে আনসেটেল্ড করে দেশকে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের মুখে ঠেলে দেয়ার খেসারত ক্ষমতাসীনরা দিতে শুরু করেছেন। বিরোধীদলের টানা অবরোধে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর দায় চাপছে মূলত সরকারের উপর। রাজপথের আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশকে সরাসরি গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে, দেশব্যাপী যৌথ বাহিনী নামিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের ধরপাকড় করা হচ্ছে, এমনকি বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। এতকিছুর পরও অবরোধ-আন্দোলন দমানো যাচ্ছে না। সরকারের মন্ত্রী-সমর্থকরা বিরোধীদলের আন্দোলনকে গণআন্দোলন বলতে নারাজ, তারা একে সন্ত্রাসী কর্মকা- বলছেন। কিন্তু পার্টি অফিসকে অবরুদ্ধ করে রেখে, নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করে, স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পথ রুদ্ধ করার মাধ্যমে সরকারই কি পরোক্ষভাবে তাদেরকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বা সন্ত্রাসী তৎপরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? জনগণের ইচ্ছার কথা বিবেচনা না করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল বলে বিবেচিত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এখনো আওয়ামী লীগ দেশের শীর্ষ জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল।
ভারতীয় পত্রিকা ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এ বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ জ্বলছে দায় ভারতেরও’। আমাদের আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিকটতম বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নানা কারণে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা এবং তা বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক শক্তি সম্পর্কে ভুল রিডিং এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের অবস্থানকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী ব্যবহার করে যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করার প্রতি ভারতের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এ ধরনের অবস্থান দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে যেমন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তেমনি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরো বেড়ে যাবে। ভারত-বাংলাদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটকে একটি সাংবিধানিক-রাজনৈতিক সঙ্কটের বদলে একটি আদর্শগত সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পছন্দ করছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সামরিক জান্তাও বাংলাদেশের জনগণ সম্পর্কে অনেকটা এই ধরনের ভুল করেছিল। গণতন্ত্রের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধর্মীয় মৌলবাদ বা যুদ্ধাপরাধের বিচারের ধূম্রজালে বন্দি করার এই প্রয়াস এবারো ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে চলেছে। পুলিশ ও সশস্ত্রবাহিনী ব্যবহার করে জনগণের ইচ্ছাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ভুলকে প্রলম্বিত করে ক্ষয়-ক্ষতি বাড়িয়ে তোলার চেয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে যথাশিগগির একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর কোন বিকল্প এখনো নেই। শুরুতেই বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন এবং চলমান রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার হুমকির মুখে রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রাষ্ট্রশক্তির হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেসব দেশ ও সংস্থার উপর নির্ভরশীল, তাদের কাছ থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করা হবে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মূল্যে জনগণ কোন সরকার, দল বা জোটের বিজয় প্রত্যাশা করেন না। ধ্বংসাত্মক-সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকা- থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম ও মূল ভূমিকা সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ