Home / জাতীয় / দাবি না মানলে বছরজুড়ে অবরোধ হরতাল !

দাবি না মানলে বছরজুড়ে অবরোধ হরতাল !

পাঁচ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ ও নতুন করে সরকার গঠন করা হলে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩১৩ দিনই অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি দেবে বিরোধী জোট। শুধু সপ্তাহের শুক্রবার ছুটির দিনটি বাদ রাখা হবে। পাশাপাশি বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনেও প্রয়োজনে বিরতি দেওয়া হবে। তবে ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের ১৪৬টি আসনে অনুষ্ঠেয় একতরফা নির্বাচনের ভোট ঠেকাতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বাত্দক প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ব্যাপক গণসংযোগও শুরু করেছেন তারা। তারপরও নির্বাচন স্থগিত করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি মেনে না নিয়ে নতুন সরকার গঠন করলে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩১৩ দিনই লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দশম সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী (নতুন) সরকার বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত বছরের বিশেষ দিনগুলো আর সপ্তাহের শুক্রবারটি ছাড়া সব দিনই অবরোধ বা হরতাল কিংবা তারচেয়েও কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সব কিছু অচল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে। এমনকি পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে শুক্রবারও কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন বিরোধী জোটের নীতিনির্ধারকরা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, এ ধরনের নির্বাচনে ‘দেশপ্রেমিক’ সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করার কোনো প্রয়োজন নেই। যে নির্বাচনে জনগণ নেই, মানুষের ভোটের কোনো প্রয়োজন নেই, সে নির্বাচনের পাহারা দেওয়ার জন্য ‘দেশপ্রেমিক’ সেনাবাহিনীকে মোতায়েনের মাধ্যমে জনগণের মুখোমুখি করে তাদের বিতর্কিত না করার আহ্বান জানান তিনি।এদিকে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার দিনের চলমান রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন-চার দিন অবরোধ বা হরতালের মতো কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে বিরোধী দল। বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব বড় দিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বর বুধবার কোনো কর্মসূচি দেবে না ১৮ দলীয় জোট। তার একদিন পরই শুক্রবারও কোনো কর্মসূচিতে যাবে না তারা। ফলে মাঝখানে একদিন থাকছে শুধু বৃহস্পতিবার। এদিন আবার সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও সিদ্ধান্ত রয়েছে। ফলে একদিনের জন্য ওই দিনটিতেও আর বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি না রেখে তার আগে ও পরে দুই-তিনটি দিন পরিবেশ-পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বিএনপি ও জামায়াতসহ ১৮ দল। তারা যদি দেখে যে, আওয়ামী লীগের এই নির্বাচন পাহারা দিতে গিয়ে দেশের সর্বোচ্চ এই বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশ, র্যাব আর বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপরই দমননীতি শুরু করেছে, তবে পরদিন থেকেই আবারও যথারীতি অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচিতেই যাবে ১৮ দল।

এদিকে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা এও আশা করছেন যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় কোনো না কোনো উদ্যোগ বা সিদ্ধান্তে পেঁৗছবে। কারণ তাদের পরিষ্কার ধারণা, আগামী ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সারা দেশের জনগণ একদিকে, আর শুধু আওয়ামী লীগ একদিকে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বেও শুধু প্রতিবেশী একটি দেশের অবস্থান একদিকে, আর জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৪টি দেশসহ ইউরোপ-আমেরিকা ও এশিয়ার অন্য সব দেশই চায় বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে সহিংসতাবিহীন একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কাজেই তারা সবাই মিলে বিশ্ব রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এই ‘ভোটারবিহীন প্রহসনের’ একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। আর এই অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছেন এখন বিরোধী জোটের নীতিনির্ধারকরা। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ নির্বাচন ঠেকাতে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে বিরোধী জোট নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেবেন বলেও জানান সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘বিরোধী দল সমঝোতায় এলে আগামী নির্বাচনের পর দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও নির্বাচন’ সংক্রান্ত বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ প্রস্তাবকে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পুরো জাতির সঙ্গে একটি ‘তামাশা’ হিসেবেই মনে করেন। আর এ ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়ার পরিষ্কার অবস্থান হলো- ‘প্রহসনের এই নির্বাচনের মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ গঠন এবং নতুন সরকার গঠন করার কাজ শেষ হয়ে গেলে এ সরকারের পতনসহ মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শুধু জেল-জুলুমই নয়, প্রয়োজনে জীবন দিতে হলেও তিনি প্রস্তুত থাকবেন। তবুও ‘ইহজনমে’ আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবেন না তিনি।

এ প্রসঙ্গে বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার কোনো সমঝোতায় না এলে পরবর্তীতে একাদশ নির্বাচন নিয়ে এ সরকারের সঙ্গে আলোচনার কোনো অবকাশ নেই। এমনকি প্রধান বিরোধী দল তখন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় গেলে প্রয়োজনে রাজনীতি ছেড়ে দেব, তবুও আমি একাদশ নির্বাচন নিয়ে এ সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাব না। কাজেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপির তো সে আলোচনায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে মনে করি। এদিকে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতারা আশা করছেন, আগামী ২৪ থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটা না একটা সমাধান হতে পারে। এমনকি সরকারও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো সমঝোতায় পেঁৗছতে পারে। শেষ পর্যন্ত সুমতি হতে পারে ক্ষমতাসীনদের। এমনকি সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে নাটকীয় কোনো পরিবর্তনও চলে আসতে পারে এরমধ্যেই। আর যদি তা না হয়, তবে আর ব্যাপক আন্দোলন ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই তাদের সামনে। সেক্ষেত্রে হরতাল-অবরোধ ছাড়াও অসহযোগের মতো কর্মসূচিও ঘোষণা করা হতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য। তার মধ্যেই আবার রাজধানীর কোথাও সমাবেশ বা মহাসমাবেশ ডেকে বিরোধীদলীয় নেতা ও ১৮ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেও এসে হাজির হতে পারেন এতে। আর সেই সমাবেশে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে অংশ নেওয়ারও আহ্বান জানাতে পারেন। এ লক্ষ্যে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় নীরব জনসংযোগও চলছে কয়েক দিন ধরেই। পাশাপাশি আগামী ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠেয় হেফাজতে ইসলামী আহূত মহাসমাবেশকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিরোধী জোট। হেফাজতের মহাসমাবেশসহ সংগঠনটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি-জামায়াত। এমনকি হেফাজতে ইসলাম যদি এবার শাপলা চত্বরে বিগত ৫ মে’র সমাবেশের অর্ধেক মানুষও জমায়েত করতে পারে, আর সেক্ষেত্রে তাদের অবস্থান যদি সরকারের বিরুদ্ধে হয়, তবে এবার আর রাজধানী থেকে মার খেয়ে ফিরে যেতে দেবে না ১৮ দলীয় জোট। তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগ দেবে ১৮ দলের কয়েক লাখ নেতা-কর্মী ও সমর্থক। আর সেদিনই এ সরকারের শেষ দিন হবে বলে হিসাব কষছে বিরোধী জোট।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ