Home / জাতীয় / আ.লীগের সাংগঠনিক দুরবস্থা : নেতা-সাংসদেরা মাঠে নেই, কর্মীরা অসহায়

আ.লীগের সাংগঠনিক দুরবস্থা : নেতা-সাংসদেরা মাঠে নেই, কর্মীরা অসহায়

পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকেও মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিভিন্ন এলাকায় অনেকটা ঘরে ঢুকে পড়েছে দলটি। মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা রাজধানী ও জেলা শহরে এসে অবস্থান করছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে ‘ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া’ দলীয় প্রার্থীরাও এখন ঢাকায়। আর, তাঁদের অনুপস্থিতি ও সাংগঠনিক দুরবস্থার কারণে পাড়াগাঁয়ের দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা জামায়াত-শিবিরের মার খাচ্ছেন।
বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিরোধী দলের আন্দোলন ও হানাহানি শুরুর আগ পর্যন্ত মন্ত্রী-সাংসদদের বেশির ভাগেরই মোটামুটি এলাকায় যাতায়াত ছিল। নিজ এলাকায় সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ থেকে শুরু করে প্রায় সব কর্মকাণ্ডে তাঁদের ছিল একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এখন খারাপ সময়ে কেউ আর ঝুঁকি নিয়ে এলাকায় থাকতে রাজি নন। আবার, গত পাঁচ বছরে মন্ত্রী-সাংসদনির্ভর এক শ্রেণীর নেতা অর্থবিত্তে ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। ক্ষমতার শেষ সময়ে তাঁরা পরিবার নিয়ে কেউ জেলা-বিভাগীয় শহর অথবা রাজধানীতে চলে গেছেন। কেউ কেউ বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছেন। চাওয়া-পাওয়া নিয়ে দলের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়নি। যেসব নেতা-কর্মী ‘ভাগাভাগির’ রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারেননি, তাঁরা আবার অভিমান করে নিষ্ক্রিয় আছেন। কেউ কেউ বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করে এলাকায় আছেন।
বিএনপির নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোট এবং জামায়াত-শিবিরের টানা অবরোধ ও হরতাল এবং সহিংসতার কারণে ১৫-২০টি জেলায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেতে পারছে না। এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রীতিমতো আতঙ্কের মধ্যে আছেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত ২০ দিনে বিভিন্ন জেলায় সহিংসতায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। কেবল সাতক্ষীরাতেই আওয়ামী লীগের ১০ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সাতক্ষীরা-৩ (দেবহাটা, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলার একাংশ) আসনে। এই আসনের সাংসদ আ ফ ম রুহুল হক গত পাঁচ বছর মন্ত্রিত্ব করেছেন। এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় বসে আছেন।
সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান যোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনিও ঢাকায়। কর্মীদের বিপদের মধ্যেও এলাকায় যাননি বলে দলের সাতক্ষীরার নেতারা জানিয়েছেন। বক্তব্য জানার জন্য চেষ্টা করেও এই দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রী-সাংসদেরা এলাকায় থাকলে নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত থাকতেন।
সাতক্ষীরার বাইরে আর যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় জামায়াত-শিবির সহিংসতা করেছে, তাঁদের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফজলে রাব্বী মিয়া অন্যতম।
কয়েক মাস ধরেই বগুড়ায় সহিংসতা হচ্ছে। বিএনপি-অধ্যুষিত এই এলাকায় গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুটি আসন পেয়েছিল। সেখানে আওয়ামী লীগের একজন সাংসদের বাড়িতেও জামায়াত-শিবির আগুন দিয়েছে। এর আগে গত পাঁচ বছরে ক্ষমতার দাপটের সময় ‘ভাগাভাগি’ নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এ জেলায় দলের সাতজন কর্মী নিহত হন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে দলীয় কোনো অবস্থান নেই। অবশ্য বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘আমরা এখানে আগুনের মধ্যে আওয়ামী লীগ করি। এ জেলায় জিয়াউর রহমানের বাড়ি। চোরাগোপ্তা হামলা হচ্ছে। এটা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়।’
সদ্য সাবেক মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের জেলা সিরাজগঞ্জে সহিংসতা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। এই জেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কে এম হোসেন আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের লোকজন মাঠে থাকে না। দলীয় সাংসদেরাও এলাকায় নেই। দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে সমস্যাসহ দল ক্ষমতায় থাকলে যা হয়, তাই হয়েছে।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সক্রিয় থাকলে জামায়াত-শিবির কিছু করতে পারত না।
লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে তিনি এলাকায় খুব বেশি যাননি। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সম্প্রতি জামায়াতের হামলায় আওয়ামী লীগের এক কর্মী নিহত হন। অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান দাবি করেন, ওই আসনের কেবল একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ দুর্বল। সার্বিকভাবে আওয়ামী লীগ এখানে শক্তিশালী।
দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক এই দুরবস্থার বিষয়টি দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারাও বুঝতে পেরেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রে উদ্ধৃত হতে না চাইলেও দলের সভাপতিমণ্ডলীর অন্তত তিনজন সদস্য সাংগঠনিক এই দুর্বলতার কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, সাধারণ কাউন্সিল এবং নির্বাচনের সময় দলের নেতা-কর্মীরা মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে নেতা-কর্মীরা মাঠে নেই।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভায় দলীয় কর্মীদের এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে এলাকাভিত্তিক দলকে সক্রিয় রাখতে দলের সব জেলা ও উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে কেন্দ্র থেকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে চিঠি পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ