Home / শীর্ষ সংবাদ / এবার কিছুটা শান্তি পাবে তাঁদের আত্মা

এবার কিছুটা শান্তি পাবে তাঁদের আত্মা

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এবার যোগ হলো এক ভিন্নমাত্রা। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর মানবতাবিরোধী ঘৃণ্য অপরাধীদের একজনের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি হয়েছে। শুরু হয়েছে জাতির কলঙ্কমোচন। এবার এমনই এক প্রেক্ষাপটে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এলো, যখন সব যুদ্ধাপরাধী ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত বর্বর খুনিদের বিরুদ্ধে বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার স্বপ্ন আলোর মুখ দেখেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। শহীদ পরিবারের সন্তানরা বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে এবারের বুদ্ধিজীবী দিবস এবং বিজয় দিবস পালনে যোগ হয়েছে ঐতিহাসিক আবহ। আর এতে শহীদদের আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট সুরকার আলতাফ মাহমুদের সহধর্মিণী সারা আরা মাহমুদ ও মেয়ে শাওন মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আমরা আশা করব, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী সবার রায়ই দ্রুত কার্যকর করা হবে।’
আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধন পৃথিবীর ইতিহাসে এক নৃশংসতম দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের কঠিন যুদ্ধ চালিয়ে জাতি যখন বিজয়ের খুব কাছে, সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা এ সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হন।
স্বাধীনতার ৪২ বছর পর সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা হয়েছে। এরই মধ্যে বুদ্ধিজীবী নিধনের পরিকল্পনা ও সহযোগিতা করার দায়ে আলবদর বাহিনীর নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বদানকারী অন্য দুই আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
জানা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের হোতা পলাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীন বর্তমানে যুক্তরাজ্য এবং আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। স্বাধীনতার ঠিক আগে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এঙ্িিকউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান। মঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। এই দুই অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সন্তানরা। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর রাতের কথা খুব মনে পড়ছে, খুব। বাবার মুখটি ভেসে উঠছে বারবার। মায়ের কথা মনে পড়ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে রায় শুনে যেতে পারেননি মা। বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন তিনি।’ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীর রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান শাহীন রেজা নূর। একই দাবি জানান শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের আরেক ছেলে সাংবাদিক ও লেখক জাহীদ রেজা নূর।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের সৃজনশীল, উদার ও গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা জাতির অগ্রগতির সহায়ক। জাতির বিবেক হিসেবে খ্যাত আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, বিজয়ের প্রাক্কালে হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এ দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বহু গুণীজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এক কলঙ্কময় দিন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নামে। তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। আমি শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’ প্রধানমন্ত্রী দলমত নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিককে একাত্তরের ঘাতক, মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত চক্রের সব ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেন, ‘১৪ ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন। বাংলাদেশকে মেধা-মননে পঙ্গু করার হীন উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে এ দিনে হানাদার বাহিনীর দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘অমর বুদ্ধিজীবীগণ দেশের বরেণ্য শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁরা একটি সমৃদ্ধ এবং মাথা উঁচু করা জাতি দেখতে চেয়েছিলেন।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ নানা পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। দিনব্যাপী বিভিন্ন সংগঠন শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে ঢাকায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় এবং ক্রমে তা সমগ্র দেশে বিশেষত জেলা ও মহকুমা শহরে সমপ্রসারিত হয়। হত্যাকারীরা বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে কোনো বিশেষ ক্যাম্পে বা বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের এদেশীয় দোসর আলবদরের সাহায্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার বরেণ্য ব্যক্তিদের অপহরণ করা হয়। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হয় তাঁদের। ঢাকায় আলবদর বাহিনী অনেক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে স্থাপিত ঘাঁটিতে নির্যাতনের পর রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর কবরস্থানে নিয়ে হত্যা করে।
ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গাকে বধ্যভূমি হিসেবে বেছে নেয় আলবদররা। এর মধ্যে দুটি বধ্যভূমির মধ্যে একটি ছিল মোহাম্মদপুরের কাছে রায়েরবাজারের জলাভূমি, অন্যটি ছিল মিরপুরে। এ দুটি বধ্যভূমিতেই হত্যা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, ড. জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান, ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মো. সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য প্রমুখকে। হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ; সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীন প্রমুখকে। জঘন্যতম ওই হত্যাকাণ্ডের আরো শিকার হয়েছিলেন সুরকার আলতাফ মাহমুদ, কবি মেহেরুন্নেসা, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাসহ বাংলাদেশের আরো অনেক শ্রেষ্ঠ সন্তান।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ