Home / শীর্ষ সংবাদ / একতরফা নির্বাচন: বিব্রত আওয়ামী লীগ, বেকায়দায় বিএনপি

একতরফা নির্বাচন: বিব্রত আওয়ামী লীগ, বেকায়দায় বিএনপি

বড় ধরনের কোনো দৈব-দুর্বিপাক না হলে আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একতরফাই হতে যাচ্ছে। এ ধরনের একটি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগও বিব্রত অবস্থায় পড়েছে। বেকায়দায় আছে বিএনপিও। বিএনপিসহ ১৮ দল নির্বাচনে আসছে না, তাদের বাদ রেখেই নির্বাচনের রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিরোধী দলহীন এ নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ পুনরায় একটি সরকার গঠন করতে পারলেও তাদেরকে বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
১৯৮৮ সালে এরশাদের এবং ’৯৬ সালে খালেদা জিয়ার গায়ে এমন একতরফা নির্বাচনের কলঙ্ক যুক্ত থাকলেও সে দাগ এবার শেখ হাসিনার গায়েও লেপন হচ্ছে। আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের জন্য এটা সুখকর নয়। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বেকায়দায় আছে বিএনপিও। বিএনপির সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমে তাকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে হবে। চলমান আন্দোলন আরও বেগবান করে এই নির্বাচন প্রতিহত করতে না পারলে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা কঠিন হবে। যেনতেনভাবে আওয়ামী লীগসহ তার মিত্ররা সরকার গঠন করলে আবার বিএনপিকে নামতে হবে সরকার হটানোর আন্দোলনে। সেই আন্দোলনে তাদের সাফল্য নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। এছাড়া দীর্ঘ আন্দোলনে বিএনপি তাদের কর্মীদের মাঠে রাখতে পারবে কি না সেটিও একটি বড় বিষয়। সে বিষয়ে চিন্তা করে আন্দোলনের পাশাপাশি বিএনপি সংলাপেও বসছে। যদিও সংলাপ নিয়ে কোনো আশার আলো বিএনপি নেতারাও দেখছেন না।
একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিহীন ফাঁকা মাঠে এমপি সংখ্যার ভাগাভাগি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের সংলাপও চলছে। জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ-হরতাল, ভাঙচুর, পুলিশের গুলি, দগ্ধ মানুষের অর্তনাদ-আহাজারি, সাধারণ মানুষের জিম্মিদশা-এর মধ্যেই গতকাল দুই দলের নেতারা সংলাপে বসেছিলেন। আবার মহাজোট নেতারা বসে আসন ভাগাভাগির সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আসার কৌশলও করছেন।
গতকাল গণভবনে শরিকদের সঙ্গে সর্বশেষ আসন নিয়ে সমঝোতা করেছে আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত সাতটি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দলগুলোর মধ্যে পাঁচটি নির্বাচন করবে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে। বাকি দুটি তাদের নিজস্ব প্রতীকে।
গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশনে। চিঠিটি পৌঁছে দেন আওয়ামী লীগের রিয়াজুল কবির কাউসার। চিঠিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ২০(১) ধারা অনুসারে জোটবদ্ধ দলগুলোর জন্য নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ও তরিকত ফেডারেশনের ১০ প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দেওয়ার অনুরোধ করেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য দুই দল জাতীয় পার্টি ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপিকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। রিয়াজুল কবির কাউসার সাংবাদিকদের বলেন, চূড়ান্ত ভাগাভাগিতে আওয়ামী লীগের ২৪২, জাতীয় পার্টির ৪৬, ওয়ার্কার্স পার্টির ৪, জাসদের ৪, তরিকত ফেডারেশনের ২ সহ মোট ২৯৮ আসন ভাগাভাগি হয়েছে মহাজোটের শরিকদের মধ্যে। দুটি আসন উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হলেও একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই দুটি আসন রাখা হয়েছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপির জন্য। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও মহাজোটে আসবেন না। ওয়ার্কার্স পার্টির নৌকা প্রতীকের আসনগুলো হচ্ছে রাশেদ খান মেনন ঢাকা-৮, ফজলে হোসেন বাদশা রাজশাহী-২, শেখ হাফিজুর রহমান নড়াইল-২ ও লুত্ফুল হাই সাতক্ষীরা-১। জাসদের নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়বেন হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২, জায়েদুল কবীর নরসিংদী-২, শিরিন আখতার ফেনী-১ ও মইনুদ্দিন খান বাদল চট্টগ্রাম-১। তরিকত ফেডারেশনের নৌকা মার্কার দুই প্রার্থী হচ্ছেন নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী চট্টগ্রাম-২ এবং অপর প্রার্থী লায়ন এম আবদুল আউয়াল লক্ষ্মীপুর-১।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ নির্বাচনে না গেলেও সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একাংশ নির্বাচনে যাচ্ছে। রওশন এরশাদ ৬১ আসনের দাবি করলেও তাকে দেওয়া হয়েছে ৪৬ আসন। জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বেশ কিছু আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও এইচএম এরশাদ, তার ভাই জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি।
দেখা গেছে, রওশন এরশাদ গাইবান্ধা থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও ময়মনসিংহে তার আসন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। চট্টগ্রাম-৯ আসনে নির্বাচন করবেন জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন বাবলু। ওই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসি। পিরোজপুরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আসন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইসহাক আলী খান পান্না।
নির্বাচনে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আসার সুপ্ত কৌশল নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তাদের মনোনীত প্রার্থীদের বেশ কিছু আসনে ছিলেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রভাব খাটিয়ে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত মোট ৮৬ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ বাদেও জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছেন-যেনতেন একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি আমরা। বাস্তবে মহাজোটের শরিকরা টেবিলে বসে এমপির সংখ্যা ভাগাভাগি করছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা জানান। একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপিসহ বিরোধীদের নির্বাচন প্রতিহত করার কারণেই আওয়ামী লীগ নির্বাচন সংক্ষেপ করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে বিনা বাধার এমপি সংখ্যা বেড়েছে।
মহাজোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করা এবং বিএনপিসহ ১৮ দলকে বাইরে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একটি নির্বাচনের পুরো নকশা তৈরি করার পরও আওয়ামী লীগ নেতারা সঙ্কট সমাধানে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপিও সে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। গতকালও গুলশানে ইউএনডিপির কার্যালয়ে বৈঠকে বসেছিলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা। সেখানে ছিলেন জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকার। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ কার্যত ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আলোচনা চালিয়ে নিতে নিল ওয়াকারকে দায়িত্ব দিয়ে যান। আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এমন একজন নেতা জানান, তারানকোকে কথা দিয়েছি সে কারণে বৈঠক হচ্ছে। আমরা বসেছি ঠিকই কিন্তু আলোচনা সেই এক জায়গাতেই থমকে আছে। এতে কোনো ফলাফল আসবে এমনটা বিশ্বাস করেন না বিএনপির নেতারাও। তারপরও আলোচনা চলছে। আবার একতরফা এ নির্বাচন দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না জেনেও আয়োজন চলছে নির্বাচনী খেলার। এর শেষ কোথায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ