Home / জাতীয় / নির্বাচনের নানান তামাশা

নির্বাচনের নানান তামাশা

রোববার সারাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগণনা শেষে এবার ফলাফলের অপেক্ষায় প্রার্থীরা। ভাঙচুর, সংঘর্ষ, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোট দিতে বাধার মধ্যেও বিকাল চারটায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

সারাদিন ভোটগ্রহণের সময় দেশজুড়ে নানা অনিয়ম ও অকল্পনীয় ঘটনাও ঘটেছে।

ফাঁকা মাঠে রোদ পোহালেন দায়িত্বে নিয়োজিতরা!
ভোট মানেই উৎসব। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সে উৎসব দেখা যায়নি। অনেক ভোটকেন্দ্রেই ভোটারদের তেমন একটা দেখা যায়নি। দুই একজন আসলেও তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিতদের। ফলে কাজ না থাকায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রোদ পোহাতে দেখা গেছে ফেনীর দাগনভূঞার কামাল আতাতুর্ক মডেল স্কাই স্কুল কেন্দ্রে। আবার সাতক্ষীরা পুলিশ লাইনস স্কুলে দেখা গেছে, দায়িত্বে নিয়োজিতরা মাঠের একপাশে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে রোদ পোহাচ্ছেন।

বাঁশবাগানে ব্যালট পেপার!

কুষ্টিয়ায় বাঁশবাগানে পাওয়া গেছে ব্যালট পেপার। কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের তারাগুনিয়া সরকারি বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের পাশের বাঁশবাগানে বেশ কিছু ব্যালট পেপার পাওয়া যায়।

জানা গেছে, কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের তারাগুনিয়া সরকারি বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে দুই হাজার ৫০০ ব্যালট ছিনতাই হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিকেল চারটার দিকে ভোটকেন্দ্রের পাশের বাঁশবাগান থেকে এসব ব্যালট পেপার উদ্ধার করেন।

ভোটার নেই, দাঁড়ি কামিয়ে সময়ের সদ্ব্যবহার

ভোটকেন্দ্রের বাইরে কোনো ভোটার দাঁড়িয়ে নেই। ভেতরেও ফাঁকা। তাই প্রিজাইডিং কর্মকর্তার হাতেও কাজ নেই। তো কী করা? ফাঁকা সময় তো কাজে লাগানো দরকার। তাই প্রিজাইডিং কর্মকর্তা রেদওয়ান রহমান ভাবলেন, দাঁড়ি কামিয়ে সময়টুকু সদ্ব্যবহার করবেন।

এরপর আর সময় নষ্ট না করে কাজে নেমে পড়লেন। দাঁড়ি কামানোর পর আবার হাজির হলেন দায়িত্ব পালনে।

রোববার বেলা ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুরান ঢাকার লালবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই কেন্দ্রে মোট ৩২২১ ভোটের মধ্যে দুপুর ২টা পর্যন্ত পড়ে প্রায় ৬০০ ভোট।

গণমাধ্যমে চিত্রধারণ, ভোটারের লাইনে আওয়ামী লীগ

ভোটারদের উপস্থিতি বেশি দেখানোর জন্য সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোটার না হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাজধানী ঢাকা-৫ আসনের দনিয়ার একে উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫১, ৫২ নং কেন্দ্রের দৃশ্য এটি।

এখানে যে ক’জন ভোটার রয়েছেন তাদের সারি করে দাঁড় করাচ্ছেন এজেন্টরা। ভোটারের উপস্থিতি বেশি দেখাতে ভোটারদের সঙ্গে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরাও দাঁড়িয়ে গেছেন। এরপর একটি টেলিভিশন চ্যানেলের চিত্রগ্রাহক এর চিত্র ধারণ করছেন।

এসময় ভোটগ্রহণ কিছুক্ষণ স্থগিত রাখা হয়। চিত্রধারণ শেষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাইন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর পুনরায় ভোটগ্রহণ চলে।

ভাগ্যে জুটল না একটি ভোটও!

যাদের জন্য ভোটের আয়োজন, তাদেরই খবর নেই। সারাদিনে একজন ভোটারের দেখাও মেলে নাই। ফলে বিকেল চারটার পর খালি ব্যালট বাক্স নিয়ে ফিরে যেতে হয় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। মহেশপুর উপজেলার এসবিকে ইউনিয়নের বজরাপুর ও পুরোন্দপুর ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি এটি।

বজরাপুর ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মহেশপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুস সালাম জানান, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল দুই হাজার ৫৪২। অথচ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বজরাপুর কেন্দ্রে কোনো ভোটার ভোট দিতে আসেননি।

মহেশপুর উপজেলার পুরোন্দপুর ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ৫২৮ ছিল। কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত একজন ভোটারও ভোট দিতে আসেননি বলে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মহেশপুর সরকারী কলেজের প্রভাষক হোসেন মোহাম্মদ শামিম জানান।

এছাড়া খালিশপুর দাখিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে মাত্র একজন ভোটার ভোট দেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগই ভোট দিতে আসেনি!

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১৬ আসনে মিরপুরের একটি ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা। রোববার বিকেল তিনটার দিকে শহীদ আবু তালেব উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট কত শতাংশ সংগ্রহ হয়েছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি একথা বলেন।

ছয় সেকেন্ডে একটি ভোট!

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের নির্বাচনে রোববার করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে বেলা ১টা পর্যন্ত শতকরা আট থেকে ১০ ভাগ ভোট পড়েছে। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর নিজ বাড়ির কেন্দ্রে বেলা ১টার মধ্যে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে।

বেলা ১টার দিকে জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামে মুজিবুল হক চুন্নুর বাড়িতে ঢোকার বাঁ পাশে রয়েছে কাজলা আলিম মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্র আর ডানপাশে রয়েছে কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র। বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে এ দুটি ভোটকেন্দ্র। কাজলা আলিম মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে ভোট রয়েছে দুই হাজার ১১৯। বেলা ১টার মধ্যে ভোট পড়েছে এক হাজার ৮০০টি। অপরদিকে কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোট আছে তিন হাজার ৫৫৯।বেলা ১টা ১০ মিনিটে দুই হাজার ৩০০ ভোটার তাঁদের ভোট দিয়ে দিয়েছেন।এ ঘটনা সারা এলাকায় চাঞ্চল্য ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোট শুরু হয়েছে সকাল আটটায়। মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক ভোট পড়ার ঘটনাটি মানতে পারছেন না এলাকার সচেতন ভোটাররা। কারণ, কাজলা আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে দেখা গেছে প্রতি ছয় সেকেন্ডে একটি করে ভোট পড়েছে। কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি আট সেকেন্ডে একটি করে ভোট পড়েছে।

সিল মারায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালাবদ্ধ!

নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে ভোটকেন্দ্র বাড়ুইগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আলম ভুঁইয়াকে এক ঘণ্টা আটকে রাখেন ভোটাররা। তাদের অভিযোগ, সাংসদ প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের ওই নেতা কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সিল মারছিলেন।

রোববার আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ভোটারদের অভিযোগ, সাংসদ ও আওয়ামী লীগের ওই নেতা ভোটকেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সিল মারছিলেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে। সেখান থেকে সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নেয়া হয়। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ছেলে একাই দিলেন ৪৭৫ ভোট

পাবনা-১ আসনে (বেড়া-সাঁথিয়া) দুটি স্থানে চারটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ছেলে ও ব্যক্তিগত সহকারীর নেতৃত্বে ভোট ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে।

পাবনার বেড়া উপজেলায় পাইকহাটি শহীদনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে স্বরাষ্ট্র প্রতিমিন্ত্রী অ্যাভোকেট শামসুল হক টুকুর ছেলে রঞ্জনের লোকজন জোর করে ব্যালটে সিল মেরেছেন। এসময় প্রতিবাদ করতে গেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু সাইদের তালা প্রতীকের এজেন্ট নূর ইসলামকে মারধর করে তারা। রোববার সকালে এ ঘটনা ঘটে।

ওই কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার শামসুর রহমান জানান, ১৫-২০ লোক ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে ৯৯টি ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে চলে যায়। ব্যালট নাম্বারগুলো হলো- ২৩৩২০১-৯৯টি।

ওই কেন্দ্রে দায়িত্বপালনরত এসআই নজরুল ইসলাম বলেন, ভোটার সেজে কয়েকজন এসে সিল মেরে গেছে। আমরা বুঝতে পারিনি।

প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্ট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ষাটিয়াকোলা ইবতেদায়ি মাদ্রাসার দুটি কেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ৪৭৫টি ভোট কেটে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দিয়েছে নৌকা মার্কার সমর্থকেরা। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, বিষয়টি তিনি ইউএনওকে অবহিত করেছেন।

কান ধরে ক্ষমা চাইলেন সাংসদ প্রার্থী

চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে মহাজোট সমর্থিত তরিকত ফেড়ারেশনের প্রার্থী মাওলানা নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী তার ব্যবহারের জন্য কান ধরে ক্ষমা চেয়ে ভোটারদের ক্ষোভ থেকে রেহাই পান। উপজেলার দক্ষিণ নিশ্চন্তাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল ১১টা পর্যন্ত এ কেন্দ্রে একটি ভোটও কাস্ট হয়নি। নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কোনো প্রার্থীই ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যাননি। এর প্রতিবাদে এলাকার সব ভোটার সম্মিলিতভাবে কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। যারা কেন্দ্রের আশেপাশে অবস্থান করছিলেন তারাও ভোট দান থেকে বিরত থাকেন।

এ খবর পেয়ে ছুটে যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। তিনি সেখানে পৌঁছে কেন্দ্রের বাইরে লোকজনদের ওপর ভোট কাস্ট না হওয়ার কারণে ক্ষেপে যান। জানতে চান এ ঘটনার কারণ কী। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তিনি ভোটারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকার লোকজন তার দিকে তেড়ে যান। এসময় হতবিহ্বল হয়ে নজিবুল বশর কান ধরে এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।

এ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১২৭৮ জন। পরে অবশ্য ভোটারেরা ভোট দিয়েছেন কিনা তা জানা সম্ভব হয়নি।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ