Home / শীর্ষ সংবাদ / অবৈধ ব্যবস্থায় অবৈধ নির্বাচন

অবৈধ ব্যবস্থায় অবৈধ নির্বাচন

ফরহাদ মজহার
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি, ২০১৪
প্রথম আলোয় প্রকাশিত ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের লেখা ‘প্লিজ এ নির্বাচন করবেন না’ আজ সকালে আমার জন্য ছিল সবচেয়ে বিব্রতকর ও লজ্জাজনক পাঠ। তিনি চান না ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হোক। নির্বাচন না হলে তার আশা, সংবিধানের মধ্যে একটা সমাধানের পথ বের করা যাবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতাও নাকি করা সম্ভব। যদিও সংবিধানের মধ্যে সমাধানের যে পরামর্শের ইঙ্গিত তিনি দিচ্ছেন, তা একদমই অনিশ্চিত এবং তার দাবি নির্বাচন স্থগিত রেখে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার ‘আইনগত ভিত্তি’ নাকি ‘খুঁজে পাওয়া যেতে পারে’। আদৌ কোনো আইনগত ভিত্তি আছে কিনা সে সম্পর্কে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন। দ্বিতীয়ত, তিনি সংবিধান বা আইনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক সম্বন্ধেও সজ্ঞান নন। যেমন- রাজনৈতিক সমঝোতা আগে নাকি সংবিধানের মধ্যে সমাধান চিহ্নিত বা নির্ণয় করা আগে? সাংবিধানিক সমস্যা সমাধান করেই কি তারপর রাজনৈতিক ‘সমঝোতা’র চেষ্টা চালাতে হবে? কোনটা? তাছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করা হলে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে তার গ্যারান্টি কী? যদি রাজনৈতিক ‘সমঝোতা’ হয়েই যায়, তাহলে সংবিধান তো কোনো সমস্যাই নয়। প্রশ্নটা আসলে রাজনৈতিক, কিন্তু মাহফুজ আনাম এবং সুশীল সমাজ এখনও খামাখা সাংবিধানিক কূটচাল দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যাকে ধোঁয়াশা করছেন। এতদিন তারা খেয়ে না খেয়ে বিরোধীদলীয় জোটের আন্দোলন-সংগ্রামের বিরোধিতা করেছেন নির্বিচারে। বিরোধী দলগুলোর ‘সহিংসতা ও তাণ্ডব’কেই বর্তমান সন্ত্রাস সংকুল রাজনীতির একমাত্র কারণ গণ্য করে আন্তর্জাতিক প্রচারণায় ব্যস্ত থেকেছেন, একই মাত্রায় দূরে থাকুক এমনকি একবারও ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াননি। বরং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করাই তারা কর্তব্য গণ্য করেছেন। আইন-শৃংখলা বাহিনী সরাসরি বিক্ষোভকারীদের বুক লক্ষ্য করে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা তার অপছন্দের রাজনীতি করে বলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালেও নীরব থেকেছেন। সমাজের বিশাল একটি অংশের রাজনীতি, মতাদর্শ এমনকি তাদের রাজনৈতিক কৌশলের তিনি নিন্দা করবেন এতে কোনো অসুবিধা নাই। উদার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য এখনও উপকারী। এ কথা আমি বারবারই বলি। কিন্তু সে রাজনীতি মাহফুজ আনাম ও সুশীল সমাজ করেননি। আমরা এখনও বহু আদর্শিক ও রাষ্ট্র গঠন সংক্রান্ত তর্ক কার্যকরভাবে সমাজে করতে পারিনি। যার ফলে আলাপ-আলোচনা, সমঝোতা বা গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ চর্চার উপযুক্ত পরিবেশও গড়ে তুলতে পারিনি। কিন্তু উদার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে না দাঁড়িয়ে মাহফুজ আনাম ও সুশীল সমাজ তথাকথিত সেকুলারিজমের নামে দাঁড়িয়েছেন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে। গণতন্ত্রের পক্ষে নয়। বিএনপির অপরাধ তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ছে না। হোক সে সমালোচনা, যদিও পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে জোট বাঁধা আদর্শগত কারণে নয়, কৌশলগত কারণে হতেই পারে। এক সময় শেখ হাসিনা করেছেন, এখন বিএনপি করছে। তাছাড়া যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, সেখানে নিশ্চয়ই সবাই আব্রাহাম লিংকন কিংবা কার্ল মার্কসের রাজনীতি করবেন না। বড় একটা অংশ ইসলামপন্থী রাজনীতিও করবে। কিন্তু সমাজের একটি বিশাল ও বৃহৎ অংশকে শুধু বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য ক্রমাগত পরিণত করা হয়েছে দানবে। হতে পারে তাদের বিশ্বাস ও রাজনীতি ভুল। তাদের রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করার অধিকার তার অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা করতে হবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার মেনে নিয়ে। তাদের সমাজ ও রাজনীতির অন্তর্গত গণ্য করে বাইরে রেখে নয়। উদার রাজনীতি ইনক্লুসিভ নীতি চর্চা করে, এক্সক্লুশান বা বাদ দেয়ার রাজনীতি নয়। এই বাদ দেয়া বা নির্মূলের রাজনীতি ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপদ তৈরি করেছে। এ দেশের প্রতিটি মানুষেরই, সে যতই অপছন্দের হোক, তাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার আছে। সমাজের বিশাল একটি অংশের মানবিক ও নাগরিক অধিকার যারা স্বীকার করে না, পরাশক্তি ও কর্পোরেট স্বার্থের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এবং সন্ত্রাসের সঙ্গে অনন্ত যুদ্ধের স্থানীয় বরকন্দাজ হয়ে তাদের যারা ‘নির্মূল’ করতে চায়- বিনিয়োগ ও মুনাফার স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার জন্য- আর যাই হোক তারা গণতন্ত্রের মিত্র নয়, গণতন্ত্রের দুশমন। এরা পাশ্চাত্যপন্থী হলেও পাশ্চাত্যের উদার রাজনীতির আদর্শও ধারণ করে না। জ্ঞানে বা অজ্ঞানে মাহফুজ আনাম এবং তার পত্রিকা এই অনুদার, অসহনশীল ও গণবিরোধী রাজনীতিই করেছেন। কারও বিশ্বাসের ধরন বা রাজনীতি মন্দ হতে পারে, কিন্তু তাদের যখন নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য ক্রমাগত ‘বর্বর ও দানব’ হিসেবে হাজির করা হয় আর রাষ্ট্র তাদের নির্বিচারে গুলি করে মারে, তখন সমাজে ও রাজনীতিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা সেই পর্যায়ে এসে পড়েছি। অনেকে বলছেন, গৃহযুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু গৃহযুদ্ধের বাকি কী আছে?
শেখ হাসিনার প্রোপাগান্ডায় গলা ফুলিয়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক সংকটের জন্য একতরফা বিরোধী দল ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে দায়ী করা ভুল রাজনীতি। কেউই ধোয়া তুলসী পাতা নয়, অবশ্যই সমালোচনা হবে এবং সে সমালোচনা কঠোর ও তীব্র হতেও কোনোই বাধা নেই। কিন্তু তর্কের জায়গা হচ্ছে- এ কাজ করতে গিয়ে একনায়কতন্ত্র ও চরম ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে যেন আমরা না দাঁড়াই। ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বষের অসুখে যেন না ভুগি, যা আসলে বর্ণবাদ ছাড়া কিছুই নয়। বাংলাদেশে সুশীল রাজনীতি কিন্তু এই কুকর্মই করে। এখন যখন বোঝা যাচ্ছে শেখ হাসিনা ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করবেন এবং সেটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই রয়েছে, তখন সুশীল সমাজের ঘুম ভেঙেছে। শেখ হাসিনার কথার থাপ্পড় খেয়ে সুশীল সমাজ টের পাচ্ছে নির্বাচন হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ সুশীলদের জন্যও অন্ধকার- তখন মাহফুজ আনাম নির্বাচন পেছানোর কথা বলছেন। খুব কি দেরি হয়ে যায়নি? আমরা কি ভয়াবহ রক্তপাত ও দক্ষিণ এশিয়ায় অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার বৃত্তে প্রবেশ করছি না? এখন শেখ হাসিনার হাতে-পায়ে ধরে কি কোনো কাজ হবে? তাছাড়া পা যদি ধরতে হয় তো ধরা উচিত দিল্লির। মনমোহন সিং কি? না। দিল্লির পররাষ্ট্রনীতি স্থির করে সাউথ ব্লক, তাদের পররাষ্ট্র বিভাগ। হয়তো সুজাতা সিং কিছু কাজে আসতে পারেন।
এটা অনুমান করা যায়, মাহফুজ আনামের প্রস্তাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলেরই প্রস্তাব। এ প্রস্তাবে সংবিধানের মধ্যে সমাধানের অন্বেষণ বেহুদা বা ফালতু তর্ক। কিংবা পঞ্চদশ সংশোধনী সংবলিত বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যে সমাধান অন্বেষণে বৃথা সময়ক্ষেপণ ছাড়া কিছু না।
আসলে ফালতু বলার আইনগত কারণও আছে। সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল, সেটা আদালতের রায় অনুসারে ছিল বৈধ ক্ষমতার বাইরে বা আইনের ভাষায় ‘এখতিয়ারবহির্ভূত’ (ultra virus) সংশোধন। এ ধরনের সংশোধনী আনার কোনো এখতিয়ার জাতীয় সংসদের নেই। অতএব সংবিধানের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু তারপরও পূর্ণ রায় দেয়ার আগে সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার সময় যে যুক্তিতে আদালত দশম ও একাদশ সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলেছিল, সেই রায় মাহফুজ আনাম ও সুশীল সমাজের আবার পাঠ করা দরকার। সেই যুক্তির আইনি ও রাজনৈতিক মর্মার্থ দুটোই আমাদের ভালোভাবে বোঝা দরকার। জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের কর্তৃত্ব পাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক বা স্বতঃপ্রমাণিত বিধান হিসেবে আইনশাস্ত্র যেসব বিধি অলংঘনীয় গণ্য করে, সেই বিধানের কয়েকটি ল্যাটিন কথনে ইংরেজি অনুবাদসহ বিচারকরা পেশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ‘যা অন্য কোনোভাবে আইনসঙ্গত নয় কিন্তু প্রয়োজনে সেটাই আইনি বা বৈধ হয়ে যায়’ (Quod alias non est licitum Necessitas facit licitum)। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন জাতীয় সংসদের বৈধ কর্তৃত্ব অতিক্রম করেছে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অতএব সেই ‘প্রয়োজনীয়তা’ই একে বৈধ করেছে। নিদেনপক্ষে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য।
দ্বিতীয় কথা, তারা বলেছেন, ‘জনগণের নিরাপত্তাই (কিংবা জনগণের স্বাস্থ্য, কল্যাণ, মঙ্গল ইত্যাদি) সর্বোচ্চ আইন’ (ংধষঁং ঢ়ড়ঢ়ঁষর ংঁঢ়ৎবসধ ষবী)। অর্থাৎ কোনো বিধান বাতিল বা বহাল রাখার ক্ষেত্রে অলংঘনীয় বিবেচনা হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা। তাদের তৃতীয় কথন রাষ্ট্র সংক্রান্ত। তারা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন’ (‘Safety of the state is the supreme law’)। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দিকটাও জাতীয় সংসদ কোনো আইন প্রণয়ন, বাতিল বা বহাল রাখার সময় ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবে মানতে হবে।
দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অধীনে হবে কিনা তার সিদ্ধান্ত আদালত দেননি, সে সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় সংসদ। আদালত তার নিজের আর জাতীয় সংসদের এখতিয়ারের মধ্যে পার্থক্য বহাল রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু সে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদ কিভাবে নেবে তার ‘আইনি’ দিকও বাতলে দিয়েছেন আদালত। তা এমন এক আইন বা বিধান, যা লংঘন করার এখতিয়ার জাতীয় সংসদেরও নাই। কারণ বিধিবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হওয়ার আগে থেকেই জনগণ যে অধিকার ভোগ করে আসছে তা কোনো লিখিত সংবিধানে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নাই। অন্যদিকে জাতীয় সংসদেরও সেই সব প্রাকৃতিক বিধি বা আইন লংঘন করার কোনো এখতিয়ার নাই। যেমন (১) রাজনৈতিক বাস্তবতা বা রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনার করে নেয়া বিধান জাতীয় সংসদ বাতিল করতে পারে না; এই বিবেচনাতেই ত্রয়োদশ সংশোধনী গৃহীত হয়েছিল, সেই বাস্তবতা পুরাপুরি না থাকলেও নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বজায় রয়েছে বলে আদালত মনে করেছেন; (২) জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে জাতীয় সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। এবং একইভাবে (৩) রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ আইনের মর্যাদা দিতে হবে। এগুলো ‘সর্বোচ্চ আইন’ কেন? বিধিবদ্ধ রাষ্ট্র গঠিত (juridical state) হওয়ার আগে থেকেই এ ধরনের অধিকার আইনি বিধান হিসেবে সমাজে হাজির থাকে। তারা বিধিবদ্ধ আইনি রূপ নিয়ে হাজির না থাকলেও স্বতঃসিদ্ধ অলংঘনীয় ‘আইন’ হিসেবেই বহাল থাকে। দার্শনিক ও আইনশাস্ত্রবিদরা একেই সাধারণত প্রাকৃতিকতা বা বাস্তবতার স্বাভাবিক নিয়ম (state of nature) কিংবা অনির্বন্ধিত বিধিবিধান (non juridical state) বলে নানান দিক থেকে নানান বিচার করেছেন (যেমন, দেখুন ইম্মেনুয়েল কান্টের উড়পঃৎরহব ড়ভ জরমযঃ বা এ ধরনের যে কোনো আলোচনা)।
আমরা আইনশাস্ত্রের তত্ত্ব নিয়ে দৈনিক পত্রিকার পাতা ভারি করব না। আমাদের যুক্তি হচ্ছে, ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে বাতিল হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিষ্কার প্রমাণ করছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। সর্বোপরি জনগণ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অবিলম্বে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘সর্বোচ্চ’ আইনের মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ সে কাজ না করে আসলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় অনুসারে ‘অবৈধ’ কাজই করেছে। ডক্টর কামাল হোসেন কথাটা তুলেছিলেন, আমরা আশা করেছিলাম তিনি আদালতে যাবেন এবং তিনি কেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করাকে ‘অবৈধ’ দাবি করেছেন সেটা নাগরিকদের কাছে পরিচ্ছন্ন করবেন। কিন্তু তিনি সেটা করলেন না।
সুশীল সমাজ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রেখে নির্বাচন চায় কিন্তু গণতন্ত্র চায় না। নাগরিক ও মানবিক অধিকারেরও তারা বিরোধী। যদি গণতন্ত্র চাইতেন এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকার তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতো, তাহলে তারা সরাসরি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে সংবিধানের সংস্কার বা রূপান্তরের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত গড়ে তোলার দিকেই মনোযোগ দিতেন। সর্বোপরি তারা বিভাজন আর বিভক্তির রাজনীতি করতেন না। একটি একক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশের জনগণকে গঠন করার সমস্যা ও সংকট চিহ্নিত করা এবং তা মোচনের দিকেই মনোযোগ দিতেন।
কিন্তু এরপরও আমরা সুশীল সমাজের উৎকণ্ঠা ও বিদ্যমান সংকট সমাধানের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই। যদিও আমরা দীর্ঘদিন থেকেই বলছি, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির সমস্যা সমাধান অসম্ভব। আশা করি সমাজের বৃহত্তর ছবি ধারণ করার চেষ্টা তারা করবেন, নিজেদের বদ্ধ ও সংকীর্ণ চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা ছাড়া যা সম্ভব নয়।
সর্বোপরি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী সবাইকে একটি প্রশ্নে একমত হতে হবে। আদালতের রায় যেভাবে আমরা বুঝেছি তাতে পরিষ্কার, অবৈধ ব্যবস্থা বহাল রেখেই এ সরকার নির্বাচন করছে। অবৈধ নির্বাচনের অধীনে নির্বাচিত সরকার ‘অবৈধ’ সরকারই হবে, বৈধ সরকার নয়। সরকার যেভাবে নির্বাচন করছে তাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যাবে না। আগামী নির্বাচন যখনই হোক, দশম সংসদেরই হবে।
এই দূরদৃষ্টিটুকু এখন দরকার।
৩ ডিসেম্বর ২০১৪, ২০ পৌষ ১৪২০, রিদয়পুর

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ