Home / শিল্প-সাহিত্য / অস্বস্তিকর জাতীয় পরিবেশ কি অসহ্য হয়ে উঠেছিল কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর কাছে

অস্বস্তিকর জাতীয় পরিবেশ কি অসহ্য হয়ে উঠেছিল কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর কাছে

1388592476.
মোহাম্মদ আবদুল গফুর : প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের মৃত্যুতে প্রবীণ শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ দুঃখ করে বলেছিলেন, আমার চাইতে বয়সে ছোট হয়েও আমার আগে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। আর আমি তার চাইতে বয়সে বড় হয়েও বেঁচে রইলাম- একথা ভাবতেও আমার লজ্জা লাগছে। অনুজ-প্রতীম সাহিত্যিক-সাংবাদিক কবি মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতেও একইভাবে আজ আমার লজ্জা লাগছে ডবল কারণে। মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে বাড়তি লজ্জার কারণ তার কঠিন অসুখের খবর শুনে তাকে একবার দেখতে যাব স্থির করেছিলাম। আমার এই সিদ্ধান্তের কথা কিভাবে যেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ জেনে ফেলেছিলেন এবং কারো কারো কাছে তা প্রকাশও করেছিলেন।
অথচ আজ-যাই, কাল-যাই করে যাওয়া না হতেই গত সোমবার হঠাৎ করে পত্রিকায় তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ দেখার দুর্ভাগ্য হলো। অন্য কোনো পত্রিকায় আমার চোখে পড়েনি। তবে শুনেছি আরো একটি পত্রিকায়ও খবরটি বের হয়েছে। আমি অবশ্য দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত ছোট্ট একটি সংবাদে জানতে পারলাম সাহিত্যিক সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ আর নেই। সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবের এই স্থায়ী সদস্যের মৃত্যুতে ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতিতে শোকও প্রকাশ করা হয়েছে।
১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত নাওঘাটা গ্রামে জন্ম নেয়া মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর কিশোর বয়স থেকেই সাহিত্য চর্চার দিকে ঝোঁক ছিল। পরবর্তীকালে তার জীবনের সিংহভাগ সাংবাদিকতার। তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই ওই পত্রিকায় সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় সাংবাদিকতায় কাটে বলে বলা যায় পেশাগত নিরিখে তিনি সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু পেশায় সাংবাদিক হলেও তিনি নেশায় ছিলেন মূলত একজন সাহিত্যিক।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে কতিপয় লেখক একই সাথে কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন, তাদের মধ্যে প্রথমসারিতে তাঁর অবস্থান। তার অগ্রন্থিত রচণাবলী বাদ দিয়ে শুধু প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর দিকে তাকালেও এ সত্যের প্রমাণ মেলে। আধুনিক পাঠক সমাজের সঙ্গে এই প্রবীণ সাহিত্যিকের সাহিত্য-কীর্তির পরিচয় করিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে নিচে তার প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর নাম প্রকাশিত হলো-
কাব্য গ্রন্থ
১. জুলেখার মন, ২. অন্ধকারে একা, ৩. রক্তিম হৃদয়, ৪. আপন ভুবনে, ৫. বৈরিতার হাতে বন্দী, ৬. সময়ের বিমর্ষ দর্পণে, ৭. মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর কাব্য সম্ভার, ৮. মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর কবিতা সংগ্রহ।
কিশোর সাহিত্য
৯. দিক দিগম্বরে।
প্রবন্ধ গ্রন্থ
১০. সমকালীন সাহিত্যের ধারা, ১১. যাদের হারিয়ে খুঁজি, ১২. নজরুল কাব্যের শিল্পরূপ, ১৩. ইতিহাস ও স্মৃতির আলোকে মহানগরীর সাহিত্য-সংস্কৃতি ও পত্রপত্রিকা, ১৪. বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি নজরুল, ১৫. নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা, ১৬. প্রাতিষ্ঠানিক নজরুল চর্চার ইতিবৃত্ত, ১৭. মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ, ১৮. সাহিত্যের রূপকার, ১৯. সাহিত্য ও সাহিত্যিক, ২০. কবিতা ও প্রসঙ্গ কথা, ২১. বাংলা কাব্যে ফররুখ আহমদ : তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য, ২২. বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলন, ২৩. বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্য, ২৪. বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা প্রীতি, ২৫. ভাষা আন্দোলনে আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ২৬. মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতা ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ২৭. গোলাম মোস্তফা (জীবনী), ২৮. সুফী মোতাহার হোসেন (জীবনী), ২৯. কৈশোর কালের কথা ও সাহিত্য জীবনের সূচনা পর্ব, ৩০. পূবালী’র দিনগুলি ও সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি।
মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তিনি কেমন একনিষ্ঠ সাহিত্য সাধক ছিলেন। যতদিন তিনি সুস্থ ছিলেন তিনি কখনও লেখালেখি থেকে বিরত থাকেননি। তখন এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি যখন কোনো সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীর মৃত্যু হয়েছে- আর তার ওপর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর মূল্যায়নধর্মী লেখা বের হয়নি। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল উদার। কোনো ছোটখাট মতপার্থক্যের কারণে কোনো কবি-সাহিত্যিক তার যথার্থ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এমনটা কল্পনা করাও সম্ভবপর নয়।
মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর গদ্য রচনাবলীর একটা বড় বৈশিষ্ট্য, এসব রচনা অনেকগুলিই ছিল স্মৃতিচারণধর্মী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ সব রচনায় তদানীন্তন ইতিহাস ও সমাজের প্রতিচ্ছবি উঠে আসত চমৎকারভাবে। এসব ব্যাপারে সত্য প্রকাশে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা বা কার্পণ্য দেখা যায়নি।
এ প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা যায়, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা তমদ্দুন মজলিসের এককালের উনিশ নম্বর আজিমপুর রোড, ঢাকাস্থ সদর দফতরে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র গড়ে ওঠার কথা। সেখানে প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য সভা বা আলোচনা সভা বসত। সে সব বৈঠকে অংশ নিতেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ প্রমুখ প্রবীণ সাহিত্যিকের সঙ্গে ফররুখ আহমদ, আবদুল হাই মাশরেকী, রওশন ইজদানী, মনমোহন বর্মন, প্রফেসর ফেরদৗস খান, শাহেদ আলী, হাসর জামান, আসকার ইবনে শাইখ, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, নূরুন নাহার, অধ্যাপক আবুল কাসেম, প্রজেশ কুমার রায়, জাহানারা আরজু, আতোয়ার রহমান প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের পাশাপাশি মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ, চৌধুরী লুৎফর রহমান প্রমুখ প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কবি-সাহিত্যিকরা।
পরবর্তীকালে এই তরুণদের অনেকেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে খ্যাতিলাভ করে বর্তমানে প্রবীণ বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছেন। খ্যাতির শীর্ষে উঠে এখন তাদের কেউ কেউ তরুণ বয়সের অখ্যাত দিনগুলোর কথা ভুলে যেতে চান এবং তাদের মেধা ও মনন চর্চার ক্ষেত্র উনিশ নম্বর আজিমপুর রোডের অবদান অস্বীকার করতে পারলে স্বস্তি বোধ করেন। সদ্য মরহুম মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ এই হীনমন্যতা বোধ থেকে মুক্ত ছিলেন। তার বিভিন্ন রচনায় বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের তথা উনিশ নম্বর আজিমপুর রোডের অবদানকে উল্লেখ করতে তিনি কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ প্রধানত কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও তার প্রধান অবদান আমরা লক্ষ্য করি সাহিত্য-সমালোচনা, মননশীল গদ্য এবং সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে। সেই নিরিখেই তাঁকে নজরুল গবেষক বলে আখ্যায়িত করা হয়। শুধু নজরুল ইসলাম সম্পর্কেই তার চারখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় তার এ আখ্যার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়াও মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা ও সুফী মোতাহার হোসেন সম্পর্কে তার গ্রন্থে তার সাহিত্য সমালোচক আখ্যার যথার্থতা প্রমাণিত হয়।
কবি হিসেবেই মাহফুজ উল্লাহ সমধিক পরিচিত হলেও বিশেষ করে সাহিত্য সমালোচনা ক্ষেত্রে মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর অবদানের মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যাবে একমাত্র সৈয়দ আলী আহসানের পরই এক্ষেত্রে তার স্থান। আমাদের সাহিত্য ক্ষেত্রের অন্যতম খ্যাতিমান সাহিত্য সমালোচক মরহুম শাহাবুদ্দীন আহমদ মূলত গদ্য রচনায়ই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে কবিতা ও সমালোচনা সাহিত্যের এই দুই শাখাতেই যার এত অবদান, বিশেষ করে সুস্থ থাকাবস্থায় যে লোকটি যে কোনো সাহিত্যিকের মৃত্যুতে তাদের সবসময় অকৃপণভাবে মূল্যায়ন করে গেছেন, তার মৃত্যুতে তাঁর সামান্যতম মূল্যায়নটিও হলো না- এর চাইতে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে?
এই দুঃখজনক ব্যাপারের কারণ খুঁজতে গেলে হয়ত দেখা যাবে- যে পরিবেশে দেশ আজ আপতিত, সেই পরিবেশই তার এই অবমূল্যায়নের তথা মূল্যায়ন না হওয়ার জন্য দায়ী। আরবিতে একটা কথা আছে – আন্নাছো আলা দ্বীনে মুলুকিহিম। অর্থাৎ দেশের রাজনীতিকরা যে দিকে দেশকে চালায়, দেশ সে পথেই পরিচালিত হয়।
সারা দেশজুড়ে যে রেষারেষির পাল্লা শুরু হয়েছে তা মূলত রাজনৈতিক হলেও তার কুপ্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি সুপ্রিমকোর্টের মতো পবিত্র অঙ্গন বা প্রেসক্লাবের মতো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের প্রতীক সংস্থাও। এই অস্বস্তিকর জাতীয় পরিবেশ মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর মতো উদার আত্মার মানুষের জন্য অসহ্য হয়ে উঠেছিল বলেই হয়ত তিনি অভিমান ভরে ২৯ ডিসেম্বরের কালো দিনটিতেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বিদায় নিতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন।

আজকের নিউজ আপনাদের জন্য নতুন রুপে ফিরে এসেছে। সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। - আজকের নিউজ